ব্যাঙছড়ি পাহাড়ে বিরল ধনেশ: জানালায় ঠোঁটের টোকায় অনন্য প্রেমের গল্প
পাহাড়ে ঘেরা সবুজ প্রকৃতি, ঝিরিঝিরির কলতান আর বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য—রাঙামাটির কাপ্তাই যেন প্রকৃতির এক অপরূপ কাব্য। এই রূপের মাঝেই এবার যোগ হয়েছে এক স্নিগ্ধ, আবেগঘন ও বিরল অধ্যায়। কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের ব্যাঙছড়ি মুসলিম পাড়া বিট অফিস এলাকায় সপরিবারে দেখা মিলেছে প্রকৃতি প্রেমীদের কাঙ্ক্ষিত বিরল ‘ধনেশ পাখি’র। দীর্ঘ বিরতির পর তাদের এই ফিরে আসা এবং নতুন অতিথির আগমন পাহাড়ি অরণ্যে বইয়ে দিয়েছে আনন্দের জোয়ার।ভালোবাসার প্রতীক ও ধনেশ পাখির প্রজনন রহস্য প্রকৃতিজগতে ধনেশ পাখি তাদের স্বভাবসুলভ রোমান্টিকতা ও জীবনসঙ্গীর প্রতি আজীবন একনিষ্ঠতার জন্য অনন্য এক উদাহরণ। সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে ধনেশ পাখি প্রজনন করে এবং ডিম পেড়ে বাচ্চা দেয়। এই সময়ে এরা বড় গাছের কোটরে বা খোঁড়লে নিরাপদ বাসা বাঁধে। ঠিক এ নিয়মেই কাপ্তাইয়ের ব্যাঙছড়ি এলাকার একটি চুন্দুল গাছের কোটরে তারা গড়ে তুলেছে তাদের ভালোবাসার সংসার।ব্যাঙছড়ি স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে এই এলাকায় এক জোড়া ধনেশ পাখি নিয়মিত দেখা গেলেও মাঝখানে তারা উধাও হয়ে গিয়েছিল। এবার তারা কেবল ফিরে আসেইনি, বরং সফলভাবে তিনটি ডিম পেড়ে ছানাও ফুটিয়েছে। বর্তমানে তাদের সাথে একটি ছানাকে উড়ে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে, যা স্থানীয়দের কৌতূহল ও আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।এই বিরল অতিথিদের নিয়ে কাপ্তাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান শেয়ার করেছেন এক দারুণ মজার ও আবেগঘন অভিজ্ঞতা। তিনি জানান, প্রতিদিন সকালের প্রথম আলো ফোটার সাথে সাথেই ধনেশ পাখিগুলো এসে হাজির হয় বিট অফিসের জানালার কাঁচে। ঠিক যেন ঘুম ভাঙানিয়া সকালে কেউ কড়া নাড়ছে দরজায়!"একদম ভোরে জানালার কাচে এসে ওরা কড়া নাড়ে। মনে হয় যেন কেউ সাতসকালে দরজায় কলিং বেল বাজাচ্ছে। কাচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে পাখিটি অন্য কেউ মনে করে রেগে যায় এবং টকটক শব্দে ঠোঁট দিয়ে কাচে আঘাত করতে থাকে। কাচের ওপাশে থাকা সেই অবয়বকে সে প্রতিপক্ষ মনে করে নিজের পরিবার ও সংসারকে রক্ষা করতে চায়—তাদের এই সরলতা ও আত্মরক্ষার তাগিদ সত্যিই মুগ্ধ করার মতো।"প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা এই ধনেশ পরিবার পাহাড়ি বনের জীববৈচিত্র্যের এক অমূল্য সম্পদ। ভোরে বিট অফিসের জানালে কড়া নাড়া এই ধনেশ পরিবারের মিতালী কাপ্তাইয়ের অরণ্যকে করে তুলেছে আরও বেশি জীবন্ত ও প্রাণোচ্ছ্বল। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা, বনের এই নির্বিঘ্ন পরিবেশ এবং কাপ্তাইয়ের অপরূপ সৌন্দর্য রক্ষায় এসব বিরল প্রাণীর নিরাপত্তা ও বিচরণক্ষেত্র আরও জোরদার করা হবে।