বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM
Topic Ads 1
মাদক মামলায় বিদেশিদের মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে সৌদি আরব

মাদক মামলায় বিদেশিদের মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে সৌদি আরব

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সম্প্রতি দেশটিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের নাগরিকদেরও মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে এ ধরনের সাজা কার্যকর, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।এ ছাড়া বন্দীদের নির্যাতনের অভিযোগ, আইনজীবী পাওয়ার সীমাবদ্ধতা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এসব কারণে সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ঘটনা। সৌদি আরবের কারাগারে থাকা চার মিসরীয় বন্দীকে জানানো হয়, তাঁদের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, তাঁদের মামলাগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে।কিন্তু সেই আশ্বাসের কিছুদিন পরই ঘটে ভিন্ন ঘটনা। কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই চার বন্দীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। বাংলাদেশের পাঠকের কাছে এ চিত্র এখন ভালোভাবেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড সম্প্রতি কার্যকর হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের (ইএসওএইচআর)’ হিসাবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এ দুজন সেই হিসাবের বাইরে। ওই ছয় মাসে কত বাংলাদেশির সাজা কার্যকর হয়েছে, তা জানা যায়নি। সৌদি আরব বহু বছর ধরেই বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা দেশগুলোর একটি। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো এবারও দেশটি বৈশ্বিক তালিকার শীর্ষে। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, কোন আইনে, কার বিবেচনায় আর কেমন আদালতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড ঠিক হয়? আর যুবরাজের বারবার দেওয়া সংস্কারের আশ্বাসই–বা গেল কোথায়? খোঁজা যাক সে উত্তর: ২০২৫ সালে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে রেকর্ড ৩৫৬টি। এক বছর আগে, ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫, যা তখন ছিল গত এক দশকের সর্বোচ্চ। ২০১৮ সালে, অর্থাৎ মোহাম্মদ বিন সালমান যুবরাজ হওয়ার পরের বছর, কার্যকর হয়েছিল ১৪৯টি; ২০২৪ সালের সংখ্যা তার দ্বিগুণের বেশি। ২০১৪ সালের ৯০টির তুলনায় এটি প্রায় গুণ। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ১৮০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। অ্যামনেস্টি তখনই সতর্ক করেছিল, ওই গতিতে চললে বছরের মোট সংখ্যা ২০২৪ সালের রেকর্ডের কাছাকাছি দাঁড়াতে পারে। বছর শেষে ৩৫৬ সংখ্যাটি সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে মোট ১ হাজার ৮১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাঁদের প্রায় প্রতি তিনজনের একজনের সাজা হয়েছে শুধু মাদকসংক্রান্ত অপরাধে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইএসওএইচআর অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড রেকর্ড করেছে। সংস্থাটির হিসাবে বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে মোট কার্যকর করা মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা ২ হাজারে পৌঁছেছে। পূর্ববর্তী যেকোনো শাসনামলের তুলনায় এটি রেকর্ড। সৌদি আরবে সব অপরাধ ও শাস্তি নির্ধারণ করে, এমন একটি পূর্ণাঙ্গ দণ্ডবিধি নেই। কোনটি অপরাধ, আর তার শাস্তি কী হবে, তা ঠিক করার ব্যাপক ক্ষমতা পান বিচারকেরা। তাঁরা এটি করেন ইসলামি আইন (শরিয়াহ) ও ফিকহের (শরিয়াহর বিধানগুলোর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ সম্পর্কে ইসলামি আইনবিদদের বোঝাপড়া) নিজস্ব ব্যাখ্যায়। দেশটির শাসনব্যবস্থা অনুযায়ী, যেকোনো আইনের চূড়ান্ত উৎস পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ। ইসলামি আইনে অপরাধ তিন ভাগে বিভক্ত: হদ, কিসাস ও তাজির। হদ ও কিসাস—এ দুই শ্রেণির অপরাধে শাস্তি নির্ধারিত; এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ডও আছে। হদ নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি; যেমন কিছু ক্ষেত্রে চুরি, ব্যভিচার ও মদ্যপান। কিসাস প্রযোজ্য হয় প্রধানত খুন বা শারীরিক আঘাতের ক্ষেত্রে, প্রতিশোধমূলক শাস্তি হিসেবে। নির্দিষ্ট শর্তে ভুক্তভোগী বা নিহত ব্যক্তির স্বজনেরা এ ক্ষেত্রে ক্ষমা করতে বা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে পারেন। তৃতীয় শ্রেণি তাজির এমন অপরাধ, যার শাস্তি হদ বা কিসাসে নির্ধারিত নেই। জনশৃঙ্খলা ও সমাজের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে, এমন সব কাজ এর আওতায় পড়ে। এখানে শাস্তি কী হবে, তা ঠিক করেন বিচারক নিজে। মৃত্যুদণ্ডের রায়ে শরিয়াহর নির্ধারিত বিধান আর তাজিরের বিবেচনামূলক সিদ্ধান্ত মিলেমিশে থাকে। সবচেয়ে কঠোর ও অপূরণীয় শাস্তি হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুদণ্ড এখানে বিচারকের বিবেচনার ওপরই ছাড়া। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, তাজিরের আওতায় মৃত্যুদণ্ড ‘কদাচিৎ প্রয়োগ হয়’। তবে মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান ভিন্ন ছবি দেখায়। কিছু লিখিত আইনেও নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং ২০০৫ সালের মাদকবিরোধী আইন প্রধান। মাদকবিরোধী আইনে কয়েকটি অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডকে মূল শাস্তি হিসেবেই রাখা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অস্পষ্ট ধারায় ‘জাতীয় ঐক্য বিপন্ন করা’র মতো অভিযোগেও লোকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যেসব অপরাধের শাস্তি কোনো আইনে নির্ধারিত নেই, সেখানে বিচারকেরা ফিরে যান শরিয়াহর ব্যাখ্যায়। মৃত্যুদণ্ডের তালিকাও দীর্ঘ। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, শুধু খুন নয়; অস্ত্রের মুখে ডাকাতি, অপহরণ বা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত খুনেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। এর বাইরে রাষ্ট্রদ্রোহ, ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকিনীবিদ্যা ও জাদুটোনা, ডাকাতি, নির্যাতন এবং খুনের চেষ্টার মতো অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়। মাদকের ক্ষেত্রে পাচার, দখলে রাখা, বিতরণ এমনকি সেবন পর্যন্ত এর আওতায়। তবে আন্তর্জাতিক আইনে মৃত্যুদণ্ড শুধু ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেমন ইচ্ছাকৃত হত্যা। সৌদি সরকার জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দলকে বলেছে, তারা শুধু ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধে’ই মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি কর্তৃপক্ষ ‘বিবেচনামূলক শাস্তির দণ্ডবিধি’ (পেনাল কোড ফর ডিসক্রিশনারি স্যাঙ্কশনস) নামে একটি নতুন আইনের খসড়ার ঘোষণা দেয়, যাতে তাজিরের অপরাধগুলো লিখিত রূপ পাবে। ফাঁস হওয়া খসড়া বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি বলছে, এতে মৃত্যুদণ্ড সীমিত হওয়ার বদলে আরও পাকাপোক্ত হচ্ছে। খসড়ায় খুন, ধর্ষণ, ‘ধর্মদ্রোহ’ ও ‘ধর্মত্যাগ’-এর অভিযোগে বিচারকেরা মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবেন। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো পাস বা কার্যকর করা হয়নি। দেশের সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’। এর সদস্য ১১ জন, প্রধান হন বিচারমন্ত্রী। বাদশাহ নবায়নযোগ্য চার বছরের মেয়াদে সদস্য নিয়োগ দেন। ২০০৭ সালের ‘বিচারব্যবস্থা-আইন’ অনুযায়ী এ পর্ষদ আদালত ও বিচারকদের কাজ তদারক করে। আর মৃত্যুদণ্ড, অঙ্গচ্ছেদ, পাথর ছুড়ে হত্যা কিংবা কিসাসের রায় পর্যালোচনার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের। আইনে বিচারকদের স্বাধীনতার কথা বলা আছে, কিন্তু অ্যামনেস্টির মূল্যায়নে বিচারকেরা কার্যত নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণেই থাকেন। বিচারক নিয়োগ হন রাজকীয় আদেশে। বিচারক পুরুষ হতে হবে—এমন কথা আইনে স্পষ্ট করে লেখা নেই; তবে দেশের সব বিচারকই পুরুষ। সরকারি কৌঁসুলি দপ্তর ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী—দুটিই সরাসরি বাদশাহ ও যুবরাজের কাছে জবাবদিহি করে। সৌদি গবেষক আবদুল্লাহ আলাউদের ভাষ্য, যুবরাজ বিচারব্যবস্থাকে নিজের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানিয়েছেন। এ জন্য প্রসিকিউশনের ক্ষমতা (রাষ্ট্রীয়ভাবে মামলা তদন্ত ও আসামিকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রশাসনিক ও আইনি ক্ষমতা) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়েছেন রাজদরবারে। এ ছাড়া বিচারাঙ্গনে প্রভাব খাটাতে পারে, এমন সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়েছেন, আদালতজুড়ে বসিয়েছেন অনুগতদের। অ্যামনেস্টির মতে, বিচারকদের ব্যাপক বিবেচনাক্ষমতা আর বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার অভাবের সুযোগে কর্তৃপক্ষ আদালতকে ব্যবহার করে সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতির সমালোচকদের শাস্তি দিতে পেরেছে। আসামিদের অধিকার অবশ্য কাগজে আছে। ২০১৩ সালের নভেম্বরে রাজকীয় ফরমানে জারি হওয়া ফৌজদারি কার্যবিধি আইনে তদন্ত ও বিচার—দুই পর্যায়েই আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার আছে। আসামিদের ওপর নির্যাতন ও তাঁদের সঙ্গে অন্যান্য দুর্ব্যবহার করা নিষিদ্ধ, বিচারপূর্ব আটকের সময়সীমা বাঁধা, দীর্ঘ আটকে বিচারিক পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক, আর মৃত্যুদণ্ডসহ সব রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে। বাস্তবে, অ্যামনেস্টির ভাষ্য, মৃত্যুদণ্ডের মামলাতেও আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে মানা হয়নি। যেসব মামলায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক অভিযোগ থাকে, সেগুলো যায় বিশেষায়িত ফৌজদারি আদালতে। এ আদালত সম্পর্কে জাতিসংঘের যথেচ্ছ আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের মত, একে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনাল বলা যায় না। ২০১৮ সাল থেকে সৌদি কর্তৃপক্ষ একাধিকবার মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অ্যামনেস্টির পর্যবেক্ষণ, প্রতিবারই তারা হয় পিছু হটেছে, নয়তো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন করেনি। ২০২২ সালের ৩ মার্চ ‘দ্য আটলান্টিক’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যুবরাজ বলেছিলেন, একটিমাত্র শ্রেণি বাদে মৃত্যুদণ্ডের বাকি সবকিছুই তাঁরা তুলে দিয়েছেন। ওই শ্রেণির কথা পবিত্র কোরআনে লেখা আছে; এ নিয়ে কিছু করার নেই। এ ছাড়া যুবরাজ বারবার প্রকাশ্যে আশ্বাস দিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড শুধু হত্যার ক্ষেত্রে থাকবে এবং শরিয়াহ যেসব অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বাধ্যতামূলক করেনি, যেমন মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধ—সেসব ক্ষেত্রে তা তুলে নেওয়া হবে। অর্থাৎ তাজিরের ভিত্তিতে আর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে না। অথচ সৌদি সরকারি সংবাদ সংস্থার ঘোষণাই বলছে, তাজিরের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে চলেছে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে সৌদি আরবের মানবাধিকার কমিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে অলিখিত এ স্থগিতাদেশ ২০২৩ সালে উঠে যায়; তারপর আগে থেমে থাকা মামলাগুলোতেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর শুরু হয়। অ্যামনেস্টি ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের আইনি ভিত্তি বিশ্লেষণ করেছে। দেখা গেছে, ৮৬২টি অর্থাৎ ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ মৃত্যুদণ্ডের ভিত্তি ছিল তাজির। এর মধ্যে ৫৯৭টি (৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ) শুধু মাদক অপরাধে আর ১৩৫টি (১৫ দশমিক ৭ শতাংশ) শুধু ‘সন্ত্রাস’-সংক্রান্ত অপরাধে। সময়ের হিসাবে ছবিটা এমন—২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোটামুটি অর্ধেক মৃত্যুদণ্ড হদ বা কিসাসে, বাকি অর্ধেক তাজিরে। ২০১৯ সালে তাজিরের অংশ লাফিয়ে প্রায় ৭১ শতাংশে ওঠে; ওই বছর সরকারি সংবাদ সংস্থা ১৩০ জনের তাজির-মৃত্যুদণ্ডের খবর দেয়, যাঁদের ৮৪ জন শুধু মাদক অপরাধে। ২০২০ থেকে ২০২৩ সালে তাজিরের হার কমে, যার আংশিক কারণ মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের স্থগিতাদেশ হতে পারে বলে অ্যামনেস্টি মনে করে। ২০২৪ সালে আবার ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় তাজিরের ভিত্তিতে; আরও ১১ দশমিক ৩ শতাংশের ভিত্তি অজানা। ওই বছর শুধু মাদক অপরাধে তাজির-মৃত্যুদণ্ড ছিল ১২২টি, যা ২০১৫ সালের প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুনেই তা হয় ১১৮টি। মাদকের পাশাপাশি দ্বিতীয় বড় ক্ষেত্র ‘সন্ত্রাস’। অ্যামনেস্টির মতে, সৌদি আরব ‘সন্ত্রাস’, ‘সন্ত্রাসী অপরাধ’ ও ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’-এর অত্যন্ত অস্পষ্ট সংজ্ঞা ব্যবহার করে এমন মামলায়ও মৃত্যুদণ্ড দেয়; যেখানে ইচ্ছাকৃত হত্যার ঘটনা নেই। উদ্দেশ্য, ভিন্নমত দমন। ২০১৭ সালের সন্ত্রাস দমন আইনের অস্পষ্ট ধারা ব্যবহার করে বিচারকেরা ‘জাতীয় ঐক্য বিপন্ন করা’ কিংবা ‘জনশৃঙ্খলা ও সমাজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা’র মতো অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। শান্তিপূর্ণ মতভিন্নতা প্রদর্শন, মানবাধিকার রক্ষা ও রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে প্রচারও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ বা ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে বলে অ্যামনেস্টির দাবি। ২০১১–২০১২ সালে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে বৈষম্যবিরোধী বিক্ষোভ তীব্র হলে কর্তৃপক্ষ এতে অংশগ্রহণ বা সমর্থন দেওয়ায় সন্দেহভাজনদের ওপর দমন-পীড়ন চালায়। গ্রেপ্তার হন অনেক বিক্ষোভকারী, তাঁদের মধ্যে ছিল অপ্রাপ্তবয়স্করাও। শাস্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয় মৃত্যুদণ্ড। এই ধারার অন্যতম আলোচিত নাম সৌদ আল-ফারাজ। এই ব্যবসায়ীকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আল-কাতিফের বিক্ষোভে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১১–২০১২ সালের ওই বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য ২০২২ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুনে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ এর আগে তাঁর আটককে বেআইনি ও অযৌক্তিক বলে গণ্য করেছিল। শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশ করার অভিযোগে দণ্ডিত আরও ৪৯ জন এখন মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে আছেন বলে জানিয়েছে ইএসওএইচআর। এঁদের মধ্যে আছেন শেখ সালমান আল-আওদা ও শেখ হাসান আল-মালিকি। ২০১৮ সাল থেকে সরকারি কৌঁসুলিরা তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে এলেও আজ পর্যন্ত তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া অমীমাংসিত রয়ে গেছে। চলতি ২০২৬ সালে ইএসওএইচআরের নথিবদ্ধ ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের ৮৪টি, অর্থাৎ ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, তাজিরের ভিত্তিতে কার্যকর হয়েছে। অপরাধের ধরন ধরলে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে ৭১টি (৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ), হত্যায় ২৫টি (২৩ শতাংশ), রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় ৯টি (প্রায় ৮ শতাংশ) এবং অন্যান্য মামলায় ৩টি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের ৮৩টি এমন অপরাধে, যার সঙ্গে হত্যার সম্পর্ক ছিল না। ইএসওএইচআর আরও জানিয়েছে, ১০৮টির ৯১টি (৮৪ দশমিক ২ শতাংশ) মামলা সম্পর্কে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তারা বা অন্য কোনো সংস্থা কোনো তথ্য জানতে বা নথিবদ্ধ করতে পারেনি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নথিবদ্ধ প্রতিটি মামলায় আসামিরা অভিযোগ করেছেন, স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁদের নির্যাতন বা দুর্ব্যবহার করা হয়েছে; আর সেই স্বীকারোক্তিই পরে আদালতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। সংস্থাগুলোর ভাষ্য, সৌদি আরবে বেশির ভাগ মৃত্যুদণ্ড ও দোষী সাব্যস্তের ভিত্তি শুধুই জবরদস্তিমূলক স্বীকারোক্তি। যাচাই বা পরীক্ষা করা মামলাগুলোতে দেখা গেছে, নির্যাতনের অভিযোগ কোনো অনুসন্ধান ছাড়াই খারিজ হয়ে গেছে। সৌদ আল-ফারাজের অভিযোগ আরও ভয়াবহ। মিথ্যা স্বীকারোক্তি লিখতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে বারবার নির্যাতন করা হয়েছে। তাঁকে এমনভাবে মারধর করা হয়েছে যে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়; তিনি যৌন সহিংসতার শিকার হন; তাঁর স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের হুমকিও দেওয়া হয়। শিশুসন্তানকে কেড়ে নেওয়ার ভয় দেখিয়ে স্ত্রীকেও স্বামীর বিরুদ্ধে বিবৃতিতে সই করানো হয়। বিচার চলাকালে তিনি নির্যাতনের বিস্তারিত অভিযোগ তোলেন এবং বিশেষায়িত ফৌজদারি আদালত, সরকারি কৌঁসুলি, সৌদি মানবাধিকার কমিশন ও সরাসরি যুবরাজের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। কোনো তদন্ত শুরু হয়নি; আদালতও তাঁর স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য কি না, তা যাচাই করেননি। জালাল আল-লাব্বাদকে অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকার সময় আল-কাতিফে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, মিথ্যা বিবৃতিতে সই করাতে তাঁকে বিদ্যুতের শক, শ্বাসরোধ ও মারধরের মতো নির্যাতন করা হয়েছে, রাখা হয়েছে দীর্ঘ সময় একা। শৈশবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পাঁচ তরুণসহ একাধিক মামলায় নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তিই বিচারে দণ্ডের একমাত্র প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। এমন জবরদস্তিমূলক স্বীকারোক্তির পথ সহজ করে একাকী ও বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা আটকের ঘটনা। সৌদ আল-ফারাজ ২০১৯ সালের ২ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০ মাসের বেশি একাকী আটক ছিলেন এবং পুরো সময় তাঁর বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। জালাল আল-লাব্বাদ দুই দফায় মোট ৯ মাস নির্জন কারাবাসে ছিলেন। আবদুল্লাহ আল-দেরাজি তিন মাস বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগহীন ছিলেন, পরিবার জানত না তিনি কোথায়। ইউসুফ আল-মানাসিফের পরিবার গ্রেপ্তারের পর পাঁচ মাস তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারেনি। জাওয়াদ কুরেইরিস তদন্তের সময় আইনজীবী ও পরিবার—দুইয়ের সঙ্গেই যোগাযোগের সুযোগ পাননি। হাসান জাকি আল-ফারাজ তিন মাস, ফারহাত আবু আল-সাউদ চার মাস একাকী ছিলেন। নির্জন কারাবাসের সময় মোহাম্মদ লাব্বাদকে একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তি ধাতব তার দিয়ে পিটিয়েছেন, যৌনাঙ্গসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে লাথি মেরেছেন, গলায় পা দিয়ে চেপে শ্বাস রোধ করেছেন; তাঁর ওপর ওয়াটারবোর্ডিং চালানো হয়েছে এবং দীর্ঘ সময় হাত-পায়ে কড়া পরিয়ে রাখা হয়েছে। জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার বারবার বলেছেন, শুধু স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়। ওয়ার্কিং গ্রুপের ভাষ্য, জবরদস্তিমূলক স্বীকারোক্তি গোটা বিচারপ্রক্রিয়াকেই কলুষিত করে এবং ন্যায্য বিচারের মৌলিক নীতিকে গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন করে। এ বিচারব্যবস্থার ভার সবার ওপর সমানভাবে পড়ছে না। সৌদি আরবের প্রায় ৩ কোটি ৫৩ লাখ মানুষের মধ্যে প্রবাসী/বিদেশি প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ, অর্থাৎ ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ ২০২৪ সালে শুধু মাদক অপরাধে কার্যকর ১২২টি মৃত্যুদণ্ডের ৯২টিই (৭৫ দশমিক ৪ শতাংশ) বিদেশির। ২০২৫ সালে মাদক অপরাধে কার্যকর করা ২৪০টি মৃত্যুদণ্ডের অন্তত ১৮৮টি বিদেশির। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ১০৮ জনের ৫৯ জন (প্রায় ৫৪ শতাংশ) বিদেশি; বাংলাদেশ, সৌদি আরবসহ ১৭টি দেশের নাগরিক রয়েছেন তাঁদের মধ্যে। জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটি ২০২৩ সালের পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হারে ‘উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি’ নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ জানিয়ে মৃত্যুদণ্ড স্থগিতাদেশের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের দুই বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ারও সৌদি সরকারকে যৌথ চিঠিতে জানান, বিদেশিদের বিরুদ্ধে মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বৈষম্যমূলক প্রয়োগের আশঙ্কা তাঁদের আছে। সৌদি আরবের কারাগার ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের অবস্থা বিশেষভাবে খারাপ। এর মধ্যে রয়েছে গাদাগাদি করে থাকা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, চিকিৎসাসহ প্রশাসনিক অবহেলার মতো বিষয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাবুক কারাগারের বন্দীদের রাখা হয়েছিল ঠাসাঠাসি, নোংরা ও বাতাস চলাচলহীন কক্ষে। ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন বন্দী অনশনও শুরু করেন। তাঁদের প্রতিবাদ ছিল পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে বিধিনিষেধ এবং চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরের সময় হাতকড়া পরিয়ে খালি পায়ে হাঁটানোর মতো অবমাননাকর আচরণের বিরুদ্ধে। সৌদি আইনে বন্দী বা তাঁর পরিবারকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগাম খবর দেওয়ার স্পষ্ট বিধান নেই; মরদেহ হস্তান্তরেরও নিশ্চয়তা নেই। বাস্তবে পরিবারগুলো বড়জোর ২৪ ঘণ্টা আগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় থাকা প্রিয়জনের কাছ থেকে এ বিষয়ে জানতে পারে। একই ধরনের অপরাধে দণ্ডিত বিদেশি বন্দীদের একসঙ্গে নির্জন ওয়ার্ডে সরিয়ে নেওয়াকে এই বন্দীরা আসন্ন মৃত্যুদণ্ডের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া তিনজনের ক্ষেত্রে অ্যামনেস্টি দেখেছে, তাঁদের মরদেহ পরিবারকে ফেরত দেওয়া হয়নি, কবর কোথায় তা–ও জানানো হয়নি। যাঁরা মনে করেন তাঁদের মামলা এখনো পর্যালোচনায় রয়েছে, তাঁদের মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর হয়েছে। জর্ডানের হুসেইন আবু আল-খায়েরকে সৌদি কারা কর্তৃপক্ষ পুনর্বিচারের প্রস্তুতি হিসেবে আইনজীবী নিয়োগ করতে বলেছিল। এর অল্প পরই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ২০২১ সালের জুনে আবু আল–খায়ের পরিবারকে জানিয়েছিলেন, তাঁকে বলা হয়েছে ‘সাজা স্থগিত হয়েছে, রাজকীয় নির্দেশে মাদক অপরাধে কিছু বন্দীকে ক্ষমার প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা পর্যালোচনা করছে’। তাঁর আশপাশের কয়েকজনের সাজা বদলালেও তিনি আটক থেকে যান। ২০২৩ সালের মার্চে, কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই, তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এ রকম আশ্বাস আর আকস্মিক মৃত্যুদণ্ডের পরিণতি যে শুধু বন্দীদের ওপরই পড়ে, তা নয়। লেখার শুরুতে উল্লেখ করা চার মিসরীয়ের ক্ষেত্রেও ঘটেছে এটাই; যুবরাজের স্থগিতাদেশের আশ্বাসের পর হঠাৎ মৃত্যুদণ্ড। এ মিথ্যা আশ্বাস বন্দী ও তাঁদের পরিবারের তীব্র মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইএসওএইচআরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা বন্দীরা জানিয়েছেন, তাঁরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুদণ্ডের আতঙ্কে বাস করছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাঁরা দেখেছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের কিছুদিনের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা রেখে এবং বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে হঠাৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে জাতিসংঘের এক সর্বজনীন পর্যালোচনায় সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে অন্তত ৩৫টি সুপারিশ করা হয়। কয়েকটি দেশ আনুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশের মাধ্যমে এ দণ্ড বিলোপের পথে এগোনোর আহ্বান জানায়। আর্জেন্টিনা ১৮ বছরের কম বয়সে করা অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেছে। অ্যামনেস্টি সৌদি আরবকে মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগে বৈষম্য নিয়ে অবিলম্বে স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে বলেছে। নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের অধীন সৌদি আরব নির্যাতন প্রতিরোধ এবং নির্যাতনে আদায় করা স্বীকারোক্তি আইনি প্রক্রিয়ায় গ্রহণ না করা নিশ্চিত করতে বাধ্য। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের চিত্রে আবারও স্পষ্ট, আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা বা প্রকাশ্যে ঘোষিত আইনি প্রতিশ্রুতির তোয়াক্কা না করেই সৌদি আরব দ্রুতগতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে চলেছে। এর মধ্যে নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন এবং শিশু অধিকার সনদের অধীনে থাকা প্রতিশ্রুতিও আছে। ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং অন্যায্য বিচার, নির্যাতন, বৈষম্য ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও দেশটি বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশগুলোর তালিকায় নিজের অবস্থান ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর বলে মনে হচ্ছে। হুসেইন আবু আল-খায়েরের বোন অ্যামনেস্টিকে বলেছিলেন, ভাইয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ‘৯ বছরের নির্যাতনের পর’। এই নির্যাতন সইতে হয়েছে তাঁকে (আবু আল–খায়ের), তাঁর স্ত্রী-সন্তানকে আর পুরো পরিবারকে। মরদেহ ফেরত না আসায় পরিবারের হাতে ছিল না শোক করার মতো কিছুই। আইন, আদালত আর ঘোষিত সংস্কারের এ দীর্ঘ হিসাব-নিকাশ শেষে যে প্রশ্ন থেকে যায়, তা আসলে এই—রেকর্ড মৃত্যুদণ্ডের এই দেশে একজন মানুষের শেষ খবরটুকুও কি সময়মতো পৌঁছায় তাঁর পরিবারের কাছে? তথ্যসূত্র: ১.  এমইএনএ (মিনা) রাইটস গ্রুপ, এএলকিউএসটি ফর হিউম্যান রাইটস এবং ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস (ইএসওএইচআর)—তিনটি মানবাধিকার সংস্থার যৌথভাবে তৈরি করা প্রতিবেদন—Death penalty in Saudi Arabia: joint submission to the Special Rapporteur on extrajudicial, summary or arbitrary executions, March 10, 2026; ২. অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন—Saudi Arabia: “If We Had Money and a Lawyer, Maybe My Brother Would Be Alive”: Saudi Arabia’s Execution Crisis, 7 July 2025 ৩. ইএসওএইচআর–এর প্রতিবেদন—108 Saudi Arabia: Executions in the First Half of 2026. ৪.ডব্লিউআইপিও–এর নিবন্ধ—Law of Criminal Procedure (promulgated by Royal Decree No. M/39 of 28 Rajab 1422 (16 October 2001)), Saudi Arabia;

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ২ বাংলাদেশিকে নিয়ে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে

সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশটির কর্তৃপক্ষ। তারা সিতি আখতার ও নজরুল ইসলাম আবদুল বশির বলে জানায় সৌদি কর্তৃপক্ষ। তবে সরকারি নথি অনুযায়ী ওই নারীর নাম সুইটি আক্তার এবং যুবকের নাম নজরুল ইসলাম। সাজাপ্রাপ্ত যুবকের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এবং নারীর বাড়ি টাঙ্গাইলে। সামাজিকমাধ্যমে তাদেরকে স্বামী-স্ত্রী এবং তারা উমরাহ করতে সে দেশে গেছেন বলে দাবি করা হলেও তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তারা সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী নন এবং কাজের উদ্দেশ্যে তারা আলাদাভাবে সৌদি আরবে যান। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাজাপ্রাপ্ত নজরুল ইসলাম ২০২২ সালের অক্টোবরে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র নেন সৌদি আরবে কাজের উদ্দেশ্যে। পরের বছর ৫ ফেব্রুয়ারিতে ক্লিয়ারেন্স নেন সুইটি আক্তার। প্রসঙ্গত, কাজের উদ্দেশ্যে যেকোনও দেশে যেতে হলে এই ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হয়। সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস ইতোমধ্যে এই দুইজনের বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করেছে। তাদের সঙ্গে বসবাস করা কর্মী এবং অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেছে। দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে কথা বলে জানা গেছে, সৌদি সরকারের কাছে তাদের দুইজনের মামলার রায়ের কপি এবং নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। সেগুলো পাওয়া গেলে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে জানা যাবে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে,  তাদেরকে ২০২৩ সালে আটক করা হয়েছিল। কারাগারে থাকা অবস্থায় দুইজনই পরিবারের সঙ্গে মাসে একদিন করে যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছেন। তবে মৃত্যুদণ্ডের সাজা এবং বাস্তবায়নের বিষয়ে তাদের পরিবারকে কিছুই জানায়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আটকের পর সৌদি আরবের ক্রিমিনাল কোর্টে তাদের প্রত্যেকের ২০ বছরের সাজা হয়। তবে সেই সাজায় সন্তুষ্ট না হওয়ায় তারা ওই রায়ের বিরুদ্ধে দেশটির উচ্চ আদালতে আপিল করেন। উচ্চ আদালত রায়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ওই তরুণ-তরুণীর সেই ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ ভিডিও ধারণ করেন অপর একজন। তবে তিনি কোন দেশের নাগরিক তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই তাকে পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবে দাবি করলেও তিনি ভারতীয় নাগরিক হতে পারেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে। ভিডিও করার অপরাধে তাকেও সাজা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সেই ভিডিও বিভিন্ন মাধ্যমে শেয়ার করার অপরাধে আরও অন্তত ২০ জনকে আটক করা হয় এবং সাইবার ক্রাইমের মামলায় তাদেরকে সাজা দেওয়া হয়। নজরুলের পরিবার জানায়, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর বড় ছেলে নজরুল ইসলামকে (২২)সৌদি আরবে পাঠান তার বাবা। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আট মাসের মাথায় গ্রেফতার হন নজরুল। ঋণের সাড়ে চার লাখ টাকা তখনও পরিশোধ করা বাকি। এরপর কেটে গেছে প্রায় তিন বছর। কারাগারে থাকা ছেলের সঙ্গে মাঝেমধ্যে ফোনে কথা বলতে পারতেন বাবা-মা। সর্বশেষ কথা হয়েছিল গত ১১ অক্টোবর। দুই থেকে আড়াই মিনিটের সেই কথোপকথনের পর ছেলের কণ্ঠ আর শোনা হয়নি তাদের। গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সৌদি আরব থেকে ফোন করে পরিবারকে জানানো হয়, নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।    ছেলেকে হারানোর শোকে গত কয়েক দিন ধরে কাঁদছেন মা রহিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘‘ছেলেই একমাস পরপর ফোন করতো। এক থেকে দুই মিনিট কথা বলতো। আমার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা মিথ্যা। আমি শেষবারের মতো ছেলের লাশ দেখতে চাই।’’ অপরদিকে সুইটির পরিবারের সূত্রে জানা যায়, দিনমজুর ফজল মিয়ার পাঁচ মেয়ে। তাদের মধ্যে সুয়েতি আক্তার সবার ছোট। তার  ডাক নাম সুইটি। গত ২০১৬ সালের দিকে সুইটির একই উপজেলার তরফপুর গ্রামের বাসিন্দা সেলিম মিয়ার সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। সেখানে পারিবারিক কলহের কারণে একবছর পর তাদের বিচ্ছেদ হয়। এর কিছুদিন পর ২০১৮ সালের দিকে মহেড়া গ্রামের শিপন মিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে হয়। ৬ মাস পর স্বামী শিপন মিয়া দ্বিতীয় বিয়ে করায় সেখান থেকেও ডিভোর্স হয় সুইটি আক্তারের। অভাবের সংসার ও মানসিকভাবে অস্বস্তিতে থাকার কারণে সুইটি সৌদি আরবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে ২০২৩ সালের দিকে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে দেড় লাখ টাকা ঋণ করে তাকে সৌদি আরবে পাঠায় তার পরিবার। সৌদির আল মাজাল আল-আরাবি গ্রুপ কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে সুইটির চাকরি হয়।  প্রতিমাসে তিনি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা করে বাড়িতে পাঠাতেন। সব মিলিয়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। সৌদি যাওয়ার ৬ মাস পর হঠাৎ করে কোম্পানিতে মারামারির ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ে সুইটি আক্তারকে দোষারোপ করা হয়। পরে সৌদি পুলিশ গ্রেফতার করে। এরপর থেকেই তিনি কারাবন্দি ছিলেন। তবে  কিছুদিন পরপর বাড়িতে ফোনে কথা বলতেন। সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর (মঙ্গলবার) তার ভাগনি জেদনী আক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে সুইটির। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার আর  কোনও খোঁজ নেই। সুইটি আক্তারের বাবা মো. ফজল মিয়া বলেন, ‘‘আমি দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাই। একদিন মাটি কাটি আবার আরেকদিন ভ্যান চালাই। এভাবেই আমার ৫ মেয়েকে বড় করেছি। অভাবের সংসারে ছোট মেয়ে সুয়েতি আক্তারকে (সুইটি আক্তার) দুই বার বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বিয়ে টিকেনি। এজন্য সংসারের হাল ধরতে সৌদিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। দেড় লাখ টাকা ঋণ করে তাকে সৌদিতে পাঠানো হয়। মক্কা নগরির একটি কোম্পানিতে কাজ করতো। সেখানে কোম্পানির লোকজনের সাথে ঝগড়া হয়। কিন্তু আমার মেয়ে ঝগড়ার মধ্যে ছিল না। তারপরও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। আড়াই বছর ধরে আমার মেয়ে জেলে রয়েছে। মাঝে মধ্যে ফোনে কথা বলতো। কয়েকদিন আগে সে বলেছিল, আগামী দুই মাস পর দেশে ফিরবে। কিন্তু গত মঙ্গলবারের (১৩ অক্টোবর) পর আর কথা হয়নি। এখন অনেকেই বলতেছে, আমার মেয়ে সুয়েতিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ব্যাপারে আমার মেয়ে কিছুই জানায়নি।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আমার মেয়ে মসজিদের ভেতরে কোনও অনৈতিক কাজ করেনি। তার কোনও বন্ধুও ছিল না। অনৈতিক কাজের বিষয়টি মিথ্যা। মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি এখনও প্রশাসনের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারিনি। আমার মেয়েকে ফেরত চাই। মেয়েকে ফেরত দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’’ 

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ২ বাংলাদেশিকে নিয়ে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড, ছেলের মরদেহ শুধু একবার দেখতে চান বাবা–মা

দীর্ঘদিন সৌদি আরবে থেকেও পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে পারেননি আবদুল বাছির। ২০২০ সালে দেশে ফিরে শুরু করেন কৃষিকাজ। সচ্ছলতার আশায় ছয় লাখ টাকা ঋণ করে ২০২২ সালের শেষ দিকে বড় ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠান। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আট মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হন ছেলে। তখনো ঋণের সাড়ে চার লাখ টাকা পরিশোধ বাকি। ছেলে সৌদি আরবে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার প্রায় তিন বছর পর গত বুধবার (১৪ অক্টেবর) ভয়ংকর একটি খবর পান বাবা। জানতে পারেন ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। খবরটি শোনার পর থেকে তাঁর মনে হচ্ছে, বেঁচে থেকেও যেন তিনি বেঁচে নেই। এখন শুধু একটাই চাওয়া, সৌদি আরব থেকে ছেলের মরদেহ দেশে এনে তাঁকে যেন একটিবার দেখানো হয়। সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড সম্প্রতি কার্যকর করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)। যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তারা হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বিষয়টি জানতে পেরেছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা প্রশাসন কাজ করবে। নজরুল ইসলামের (২৫) বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সদর উপজেলায়। এই উপজেলার একটি গ্রামের আবদুল বাছির ও রহিমা বেগমের বড় ছেলে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে নজরুল বড়। নজরুল ২০২০ সালে একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেন। পরে সদর উপজেলার একটি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। নজরুলের বাবা দীর্ঘ ২৪ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। ২০২০ সালে দেশে চলে আসেন। দীর্ঘ দিন প্রবাসে থাকলেও পরিবারে সচ্ছলতা আনতে পারেননি। দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন। নজরুলের ছোট ভাই (১৪) স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসায় পড়ে। এক বোন (৯) পড়ে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে। ছোট বোনের বয়স চার বছর। খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু পরিবারের সদস্যরা জানান, নজরুল ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে যান। পবিত্র মক্কা নগরীর হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন তিনি। সৌদি আরবে যাওয়ার আট মাসের মাথায় সেখানকার পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এর পর থেকেই তিনি দেশটির কারাগারে ছিলেন। গ্রেপ্তারের এক মাস পর বিষয়টি জানতে পারে পরিবার। মাঝেমধ্যে বাবা–মায়ের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেন নজরুল। তাঁদের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয় ১১ অক্টোবর। সেদিন দুই থেকে আড়াই মিনিট কথা হয়। এরপর গত বুধবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সৌদি আরব থেকে একজন ফোন করে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি পরিবারকে জানান। পরিবারের সদস্যরা জানান, নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর শুনে তাঁর ফুফু আবেদা বেগম (৬৫) মূর্ছা যান। সেদিন (গত বুধবার) রাত দুইটার দিকে মারা যান তিনি। ষড়যন্ত্র দেখছে স্বজন–বন্ধুরা নজরুলকে বিনয়ী ও ভদ্র বলেই জানেন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা। সৌদি আরবে নজরুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যায় না বলেও দাবি তাঁদের। এ অভিযোগের পেছনে ষড়যন্ত্র ছিল বলে মনে করেন তাঁরা। নজরুলের দূরসম্পর্কের দুই চাচাতো ভাই মোস্তাকিম ভূঁইয়া ও ইমাম হাসান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, সৌদি আরবে পরিচ্ছন্নতার কাজ করার সময় নজরুলের সঙ্গে একজনের বিরোধ তৈরি হয়। বিষয়টি ফোনে চাচা–চাচিকেও (নজরুলের বাবা–মা) বলেছিলেন। ওই ব্যক্তি পাকিস্তানের নাগরিক, এমন কথা নজরুল জানিয়েছিলেন তাঁদের। ওই লোকের ষড়যন্ত্রের কারণেই নজরুলের এমন পরিণতি হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন। নজরুলের বন্ধু রাহাত ভূঁইয়া বলেন, সৌদি আরবে নজরুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্টের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সে এ ধরনের কাজ করেছে বলে বিশ্বাস হচ্ছে না। স্থানীয় যে দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছিলেন নজরুল, সেই মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা নাঈমুর রহমান বলেন, নজরুলের আচার-আচরণ ও চলাফেরা খুবই ভালো ছিল। কেউ তাঁর বিষয়ে এমন বলতে পারবে না যে ছেলেটা বাজে ছিল বা খারাপ ছিল। তাঁর সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে, দেশে থাকতে তাঁর চলাফেরায় কখনো এমন কিছু দেখিনি। ছেলের মরদেহ দেখতে চান বাবা–মা আজ সোমবার সকালে নজরুলদের বাড়িতে যান এই প্রতিবেদক। তাঁর বাবা আবদুল বাছিরের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন বারবার কাঁদছিলেন তিনি। আবদুল বাছির প্রথম আলোকে বলেন, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠান তিনি। প্রথম সাত–আট মাসে ছেলে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। এরপর তিন বছর ধরে ছেলে সে দেশের জেলে। ছেলের এমন মৃত্যুর শুনে বোনও হঠাৎ হৃদ্‌রোগে মারা গেল। এখন শুধু ছেলের মরদেহ দেখার অপেক্ষায় আছেন তিনি। ছেলে হারানোর শোকে গত কয়েক দিন টানা কাঁদছেন মা রহিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘ছেলেই এক মাস পরপর ফোন করত। এক থেকে দুই মিনিট কথা বলত। আমার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযাগ আনা হইছে তা মিথ্যা। আমি শেষবারের মতো ছেলের লাশ দেখতে চাই।’

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড, ছেলের মরদেহ শুধু একবার দেখতে চান বাবা–মা

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের একজন অভিবাসী শ্রমিক, অন্যজন ওমরাহ যাত্রী

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির একজন অভিবাসী শ্রমিক, অন্যজন ওমরাহ যাত্রী ছিলেন বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।  সোমবার (১৯ অ‌ক্টোবর) বিমানবন্দরে প্রবাসী কর্মীদের লাগেজ বহনের সুবিধার্থে ২০০টি ট্রলি হস্তান্তর উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী বলেন, তাদের একজনের বাড়ি বগুড়ায়। অন্যজন কুমিল্লার বাসিন্দা। আকাশপথের যোগাযোগ ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। এর আগে সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সৌদিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আজেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বসির ও সিথি আক্তার। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তারের পর তদন্ত শেষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে। পরে মামলাটি আদালতে পাঠানো হলে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি জানতে পারে বাংলাদেশ। এরপর ঘটনার বিস্তারিত জানতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দার কনস্যুলেট সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার পাঠানো ওই চিঠিতে দুই বাংলাদেশির পরিচয়, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। কনস্যুলেটের এক কর্মকর্তা জানান, দুই বাংলাদেশির গ্রেপ্তার, বিচার কিংবা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে থেকে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেনি। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থায় খবর প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি মিশনের নজরে আসে। সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্যে দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হলেও তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার মতো বিস্তারিত তথ্য ছিল না। তাদের পাসপোর্ট, আকামা ও নাগরিকত্বসংক্রান্ত তথ্যও পাওয়া যায়নি। এ কারণে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বাংলাদেশ কনস্যুলেট। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শরিয়াহ আইনের ‘তাআজির’ বিধানের আওতায় বিচারকের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে উচ্চতর বিচারিক কর্তৃপক্ষও ওই রায় বহাল রাখে। তবে তাদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছিল কি না, আপিলের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না কিংবা কনস্যুলার সহায়তা চেয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশে কোনো নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তার অনুরোধে আটককারী দেশকে সংশ্লিষ্ট দেশের কনস্যুলেটকে অবিলম্বে অবহিত করতে হয় এবং কনস্যুলার সহায়তার সুযোগ দিতে হয়। তবে ওই দুই বাংলাদেশি কনস্যুলেটকে অবহিত করার অনুরোধ করেছিলেন কি না, তা জানা যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দুই বাংলাদেশির বিষয়ে আগে থেকে বাংলাদেশ মিশনকে কিছু না জানানোর কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সৌদি কর্তৃপক্ষের জবাব পাওয়া গেলে তাদের পরিচয় ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে।

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের একজন অভিবাসী শ্রমিক, অন্যজন ওমরাহ যাত্রী

ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগেই স্থগিত মৃত্যুদণ্ড

এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার মাত্র এক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে তা স্থগিত করা হয়েছে। টেনেসির একমাত্র নারী ক্রিস্টা গেইল পাইক ছিলেন , যার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে যাচ্ছিল। গত দুই শতাব্দীতে ওই অঙ্গরাজ্যে কোনো নারীর সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর হয়নি।দেশের সুপ্রিম কোর্ট তার আপিল খারিজ করে দেওয়া এবং গভর্নর ক্ষমা করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিষাক্ত ইনজেকশনের মাধ্যমে দণ্ড কার্যকর করার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ষষ্ঠ সার্কিট আপিল আদালত দণ্ডটি স্থগিত করে। বিচারপতিরা বলেছেন, মামলাটি আরও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। স্থগিতাদেশ কতদিন বহাল থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।টেনেসিতে সাধারণত বিষাক্ত ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে এই পদ্ধতি দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে ক্রিস্টা চেয়েছিলেন সম্পূর্ণ নারীদের নিয়ে গঠিত ফায়ারিং স্কোয়াডের গুলিতে তার দণ্ড কার্যকর হোক।১৮ বছর বয়সে এক সহপাঠীকে হত্যার অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর থেকে ৩২ বছর ধরে তিনি কারাগারে আছেন।সূত্র: আলজাজিরা

ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগেই স্থগিত মৃত্যুদণ্ড

স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় স্বামীর মৃত্যুদণ্ড

ঢাকার কেরানীগঞ্জে যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার দায়ে স্বামী দুলাল হোসেন ওরফে দুলু ওরফে জুয়েলকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আজ রোববার ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান এই রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আসামির স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থদণ্ডের টাকা আদায় করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে দেওয়ার জন্য ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা কালেক্টরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ মামলায় চার আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন হারুন, মোরশেদা, সুমাইয়া ও রাজুকে খালাস প্রদান করেন ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এরশাদ হোসেন জর্জ রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি দুলাল হোসেনকে রায় শেষে সাজা পরোয়ানাসহ কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০০১ সালে আসামি দুলালের সঙ্গে বিয়ে হয় ভুক্তভোগী শারমিনের। তাঁদের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। দুলাল বিয়ের পর থেকে দুই লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে শারমিনকে মারধর করতেন। ২০১৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকেও তাঁকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তাঁর শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। শারমিনের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন তাঁকে উদ্ধার করেন। প্রথমে তাঁকে মিটফোর্ড হাসপাতালে, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালের ভর্তি করা হয়। তাঁর শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ঘটনায় কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় মামলাটি করেন শারমিনের মা মোসা. মোমেলা। কেরানীগঞ্জ মডেল থানার উপপরিদর্শক এ কে এম সাইদুজ্জামান ২০১৭ সালের ৩১ জানুয়ারি মামলার তদন্ত শেষে  পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন আদালতে। মামলার বিচার চলাকালে ৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে এ দণ্ড দেন আদালত।

স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় স্বামীর মৃত্যুদণ্ড
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream