২০২৯ পর্যন্ত নজরদারিতে হঠাৎ আরও দুই ড্রোন ভাড়া ভারতের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কোম্পানি জেনারেল অ্যাটমিকস অ্যারোনটিক্যাল সিস্টেমস থেকে ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য আরো দুটো এমকিউ-৯বি ‘সি গার্ডিয়ান’ ড্রোন ভাড়া নিয়েছে ভারত সরকার।রয়টার্স জানিয়েছে, ভারত সরকারকে ৩০ মাসের জন্য ওই দুটো ড্রোনের ভাড়া বাবদ দিতে হবে ১৯.৪৩ বিলিয়ন রুপি, বা প্রায় ২০৩ কোটি ডলার।জেনারেল অ্যাটমিকসের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সোমবার এ চুক্তির ঘোষণা দেয়। দেশটির ভাষ্য, নতুন দুটি ড্রোন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নৌবাহিনীর সামুদ্রিক নজরদারি ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।কিন্তু একই ধরনের ৩১টি ড্রোন কেনার জন্য ভারত আগেই চুক্তি করে রেখেছে। তারা ভাড়ায় চালাচ্ছে আরো দুটো ‘সি গার্ডিয়ান’ ড্রোন। তাহলে নতুন করে দুটি ড্রোন ভাড়া নেওয়ার প্রয়োজন হল কেন?ইনডিয়া টুডে লিখেছে, ভারত যে ৩১টি এমকিউ-৯বি ড্রোন কিনছে, সেগুলোর সরবরাহ ২০২৯ সালের গোড়ার দিকে শুরু হওয়ার কথা। তার আগের সময়টায় নৌবাহিনীর নজরদারি সক্ষমতায় কোনো ঘাটতি যাতে তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতেই আপাতত আরও দুটি ড্রোন লিজ নেওয়া হচ্ছে।সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে লিজ বা ভাড়া নেওয়া তুলনামূলকভাবে অস্বাভাবিক মনে হলেও ভারতের ক্ষেত্রে এটি নতুন নয়। ২০২০ সালের নভেম্বরে ভারতীয় নৌবাহিনী জেনারেল অ্যাটমিকসের কাছ থেকে দুটি সি গার্ডিয়ান লিজ নেয়। ওই সময় ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনা তীব্র হয়ে উঠেছিল। লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষে ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর দুই দেশের সামরিক উত্তেজনা বেড়ে যায়। তখন চীনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ভারতীয় নৌবাহিনীর সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। সরঞ্জাম কেনার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বদলে লিজ নেওয়া ছিল দ্রুততম পথ।ভারত এরপর স্থায়ী সমাধানের পথও তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় ৩২ হাজার কোটি রুপির চুক্তিতে ৩১টি এমকিউ-৯বি ড্রোন কেনার সিদ্ধান্ত নেয় নয়াদিল্লি। এর মধ্যে ১৫টি সি গার্ডিয়ান নৌবাহিনীর জন্য এবং ১৬টি স্কাই গার্ডিয়ান ভারতীয় সেনা ও বিমানবাহিনীর জন্য কেনা হচ্ছে।কিন্তু এসব ড্রোন হাতে পেতে ২০২৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ভারতের জটিল প্রতিরক্ষা ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনুমোদন, মূল্যায়ন, দরপত্র ও আলোচনা—বিভিন্ন ধাপ পেরোতে হয়। সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে জরুরি সামরিক প্রয়োজন মেটানোর একটি উপায় হচ্ছে ভাড়া নেওয়া।লিজ নেওয়ার আরেকটি সুবিধা হল, রক্ষণাবেক্ষণ ও সহায়তার বড় একটি অংশ সরবরাহকারী কোম্পানির ওপর থাকে।ইন্ডিয়া টুডে লিখেছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের লিজ নেওয়া সি গার্ডিয়ানগুলোর একটিকে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে সমুদ্রে নামিয়ে দিতে হয়েছিল। পরে জেনারেল অ্যাটমিকস অতিরিক্ত কোনো খরচ ছাড়াই ভারতীয় নৌবাহিনীকে একটি বিকল্প ড্রোন সরবরাহ করে।ফলে লিজ ব্যবস্থায় জরুরি নজরদারি সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঝুঁকিও কিছুটা কমে।এমকিউ-৯বি সিরিজের ড্রোনগুলো দীর্ঘ সময় বেশি উচ্চতায় উড়তে পারে। স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলো নিজস্ব স্থলঘাঁটি থেকে অনেক দূরেও পরিচালনা করা সম্ভব।জেনারেল অ্যাটমিকসের তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কনফিগারেশনে ড্রোনগুলো ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় আকাশে থাকতে পারে।ড্রোনগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর, রাডার ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সরঞ্জাম যুক্ত করা যায়। ফলে বিশাল সমুদ্র এলাকায় জাহাজের চলাচল পর্যবেক্ষণ, নির্দিষ্ট কোনো জাহাজকে অনুসরণ কিংবা দূরবর্তী সমুদ্রপথে নজরদারি চালানোর মত কাজ দীর্ঘ সময় ধরে করা সম্ভব।এমকিউ-৯বি পরিবারের ‘সি গার্ডিয়ান’ মূলত সামুদ্রিক নজরদারির জন্য তৈরি সংস্করণ। এর সেন্সর ও সরঞ্জাম বড় সমুদ্র এলাকায় নজর রাখার উপযোগী। সাবমেরিন শনাক্ত ও অনুসরণের সক্ষমতাও এতে যুক্ত করার কাজ চলছে।ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের দীর্ঘপাল্লার মনুষ্যবিহীন নজরদারি ব্যবস্থা ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিস্তৃত; আফ্রিকার পূর্ব উপকূল থেকে মালাক্কা প্রণালি পর্যন্ত সমুদ্রপথে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত তৎপরতা চলে।নতুন দুটি ‘সি গার্ডিয়ান’ এর ৩০ মাসের লিজ শুরু হচ্ছে চলতি অগাস্ট মাসেই। এ চুক্তি ২০২৯ সালের গোড়ার দিকে শেষ হওয়ার কথা। আর তখনই যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা ৩১টি এমকিউ-৯বি স্কাই ও সি গার্ডিয়ানের সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।ফলে নতুন লিজ মূলত একটি ‘ব্রিজ’ হিসেবে কাজ করবে—পুরোনো লিজের সক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি নিজেদের কেনা ড্রোন আসার আগ পর্যন্ত ভারতীয় নৌবাহিনীকে অতিরিক্ত নজরদারি ক্ষমতা দেবে।ইন্ডিয়া টুডে লিখেছে, ভারত সরকারের এ সিদ্ধান্তের পেছনে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক অংকও রয়েছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা রয়েছে। একই সময়ে পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।এ কারণে ভারত মহাসাগরে জাহাজ চলাচলের পথ, গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ এবং বিস্তৃত জলসীমার ওপর অব্যাহত নজরদারি এখন ভারতের জন্য কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।নতুন দুটি সি গার্ডিয়ান সেই নজরদারির সক্ষমতা আরও বাড়াবে। আর ২০২৯ সালে নিজেদের কেনা ৩১টি ড্রোন আসা শুরু হলে অস্থায়ী লিজের এই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে স্থায়ী বহরে রূপ নেবে।