সুনামগঞ্জ জেলার ৪৪৪ পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি, নিরাপত্তার মাঠে পুলিশ
মো. আফজাল হোসেন, সুনামগঞ্জ:সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে সুনামগঞ্জে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া এ উৎসবকে কেন্দ্র করে জেলার ১২টি উপজেলায় ৪৪৪টি পূজামণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও তৈরি হচ্ছে প্রতিমা, কোথাও চলছে মণ্ডপের সাজসজ্জা ও আলোকায়ন, আবার কোথাও জোর দেওয়া হচ্ছে নিরাপত্তাব্যবস্থায়। সব মিলিয়ে সীমান্তবর্তী এ জেলায় দুর্গোৎসবকে ঘিরে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার পূজামণ্ডপগুলোতে প্রতিমা তৈরির কারিগরদের ব্যস্ততা বেড়েছে। কোথাও প্রতিমার কাঠামো নির্মাণ, কোথাও মাটির প্রলেপ দেওয়া, আবার কোনো কোনো মণ্ডপে চলছে রং ও সাজসজ্জার কাজ। শিল্পীদের নিপুণ হাতে ধীরে ধীরে পূর্ণতা পাচ্ছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর প্রতিমা। পূজাকে সামনে রেখে মণ্ডপগুলো সাজানো হচ্ছে বাঁশ, কাঠ, কাপড়, রঙিন কাগজ ও বৈদ্যুতিক বাতিসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে। কোনো কোনো মণ্ডপে থাকছে বিশেষ থিমের আয়োজন। আয়োজকদের পাশাপাশি স্থানীয় তরুণ-তরুণীরাও স্বেচ্ছাশ্রমে প্রস্তুতির কাজে অংশ নিচ্ছেন। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের মণ্ডপগুলোতেও চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যবর্ধন ও অবকাঠামো সংস্কারের কাজ।জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ৫২টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। এসব মণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ তৎপরতা শুরু করেছে পুলিশ। পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেনের নেতৃত্বে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রতন সেখ পিপিএম পূজামণ্ডপগুলো পরিদর্শন ও সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করছেন।উৎসবকে শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন রাখতে সদর থানার আওতাধীন ৫২টি পূজামণ্ডপে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মণ্ডপে দর্শনার্থীদের নিরাপদ চলাচল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ওসি রতন সেখ বলেন, পূজামণ্ডপে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে পুলিশ সুপারের। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন নিশ্চিত করতে পুলিশ সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে। সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ৪৪৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদযাপন নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় জেলা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নজরদারি, নিয়মিত টহল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন পিপিএম বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু ভাই-বোনেরা যাতে নির্বিঘ্নে ও উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জেলার ১২টি উপজেলায় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। প্রতিটি থানার পুলিশ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের নিয়মিত টহল ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, জেলার ৪৪৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ প্রশাসন, র্যাব ও আনসার বাহিনীকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পূজামণ্ডপসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি জোরদার করতে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে জেলা প্রশাসন।বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিমল বণিক বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসবকে আনন্দমুখর, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন করতে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আন্তরিক ভূমিকা রয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন কঠোর আইনি নির্দেশনা দিয়েছে। আমরা আশা করি, প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সুনামগঞ্জে শারদীয় দুর্গোৎসব উৎসবমুখর ও সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশে উদ্যাপিত হবে।দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে নতুন পোশাক, জুতা, প্রসাধনীসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাকাটার প্রস্তুতিও শুরু করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। বাজারগুলোতে বাড়ছে মানুষের উপস্থিতি। পূজাকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, মিষ্টি, খাবার ও উপহারসামগ্রীর দোকানে বেচাকেনা বাড়ার প্রত্যাশা রয়েছে। পূজার দিনগুলোতে মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়বে। এ কারণে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং মণ্ডপের প্রবেশপথ ও আশপাশের সড়ক পরিষ্কার রাখার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন আয়োজকেরা। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক সংযোগ ও আলোকসজ্জার সরঞ্জাম ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।দুর্গাপূজার ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন ও পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হবে। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে শারদীয় দুর্গোৎসব। প্রতিটি মণ্ডপেই এসব ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা যথাযথভাবে পালনের প্রস্তুতি চলছে। দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পূজার দিনগুলোতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষ মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করেন। অনেক পরিবারে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার প্রস্তুতিও চলছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে কিংবা প্রবাসে থাকা স্বজনদের অনেকে পূজাকে কেন্দ্র করে নিজ এলাকায় ফিরবেন বলে আশা করছেন পরিবারের সদস্যরা।স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জানান, তারা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন করতে চান। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সব ধর্মের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় থাকুক এটাই তাদের প্রত্যাশা। আয়োজকদের মতে, দুর্গোৎসব সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহাবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। তাই ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি বিভিন্ন মণ্ডপে প্রসাদ বিতরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন করা হয়। এতে স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে উৎসব আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, দেবী দুর্গার আগমন অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। সেই বিশ্বাস, ধর্মীয় আবেগ ও উৎসবের আনন্দকে ধারণ করে সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ৪৪৪টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে মণ্ডপের সাজসজ্জা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সব ক্ষেত্রেই এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজকেরা। প্রশাসনের সহযোগিতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব উদযাপিত হবে এমন প্রত্যাশা জেলার সর্বস্তরের মানুষের।