বিশাল তেলবাহী কিকু পাড়ি দিল হরমুজ প্রণালি
গ্রিসের মালিকানাধীন বিশাল তেলবাহী জাহাজ কিকু ২৫ জুলাই বিকেলে কাতারের মেসাইয়েদ তেল রপ্তানি টার্মিনালে পৌঁছায়। ৩০টি জাহাজ একসঙ্গে দেশটির পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত এই বিশাল বন্দরে নোঙর করতে পারে। দোহার প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে এই বন্দরটি।
অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল বোঝাই করে কিকু চার দিন পর হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে। এটি ছিল ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) শ্রেণির জাহাজ, অর্থাৎ সবচেয়ে বড় ধরনের তেলবাহী ট্যাংকার। ১ হাজার ফুটেরও বেশি এর দৈর্ঘ্য। পারস্য উপসাগর পেরিয়ে যাওয়ার সময় জাহাজটি ঘণ্টায় ১৩ নট গতিতে চলছিল, যা এর সর্বোচ্চ গতির কাছাকাছি।
এরপর ৩১ জুলাই দুপুর ২টার কিছু পর দুবাই উপকূলের কাছে হঠাৎ কিকু উধাও হয়ে যায়। তার অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম–এআইএস ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দিয়েছিল জাহাজটি। এই সামুদ্রিক রেডিও ডিভাইসের মাধ্যমে একটি জাহাজের পরিচয়, গতি, গতিপথ ও অবস্থান জানা যায়। বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক যানবাহন পর্যবেক্ষণকারী ট্র্যাকিং পরিষেবাগুলোর কাছে মনে হলো, কিকু যেন হঠাৎ করেই পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে গেছে।
কিন্তু ১ আগস্ট সকাল ১০টায় আবারও কিকুকে খুঁজে পাওয়া গেল। তবে এবার সেটি হরমুজ প্রণালির অন্য পাশে। এটি তেল শিল্পের নতুন কৌশলের অংশ—রাতে ‘ডার্ক’ বা গোপন অবস্থায়, অর্থাৎ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর পাহারায় হরমুজ প্রণালি পার হওয়া। লক্ষ্য হলো ইরানের ড্রোন হামড়া এড়ানো। এক মাস আগেও কিকুকে একটি ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। তবে সেই ড্রোনটি বিস্ফোরিত না হওয়ায় জাহাজটি রক্ষা পায়।
মার্কিন নৌবাহিনীর সহায়তায় সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল কোম্পানিগুলো এখন এমন তেলবাহী জাহাজ ভাড়া করছে, যেগুলো ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে পারস্য উপসাগর থেকে তেল নিয়ে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগরে যাচ্ছে। সেখানে অপেক্ষমাণ ক্রেতাদের মালিকানাধীন অন্য ট্যাংকারে তেল তুলে দিয়ে তারা আবার প্রণালি পেরিয়ে ফিরে আসছে।
এর ফলে ইরানের হামলার ঝুঁকি ও বিমার অতিরিক্ত খরচের বোঝা বাণিজ্যিক জাহাজ পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সরে গিয়ে পড়ছে মার্কিন সরকার ও তেল উৎপাদকদের ওপর। মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মতে, এই কৌশল কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০ লাখ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছে। এটি বিপুল পরিমাণ। ট্রান্সপন্ডার সংকেতের ওপর নির্ভর করা ওয়াল স্ট্রিটের তেল বিশ্লেষক এবং কেপলারের মতো শিপিং ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠানগুলো যে পরিমাণ তেল পরিবহনের হিসাব দেয়, তার প্রায় দ্বিগুণ।
এই গোপন বা ‘ডার্ক’ যাতায়াত মধ্যপ্রাচ্যের তেল শিল্পের হিসাব-নিকাশই বদলে দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন দুই দিনে ওমান উপসাগরে এক ডজনেরও বেশি জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর প্রত্যক্ষ করেছে। এসব তেলবাহী জাহাজ পরে চীন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশের দিকে রওনা হয়েছে।
এটি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল একটি কৌশল। তবে আপাতত এটি তেলের বাজারকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। যুদ্ধের আপাত সমাপ্তি এবং হরমুজ প্রণালির জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো স্থায়ী পরিকল্পনা এখনও অধরা। ফলে এই বিকল্প ব্যবস্থা অন্তত কিছুটা সময় কিনে দিচ্ছে।
কিকুর সাম্প্রতিক যাত্রার মতো ‘ডার্ক ট্রানজিট’ বেড়ে যাওয়ার ঘটনা জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ঘটছে। ইরান যুদ্ধ অনেকের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে চলছে। গত ছয় মাসে এটি বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ব্যাহত করেছে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পৌঁছেছে।
বাণিজ্যিক মজুত থেকে কয়েক বিলিয়ন ব্যারেল তেল ও জ্বালানি উধাও হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি তেল মজুত ১৯৮০-এর দশকের শুরুর পর আর কখনও এত কম ছিল না। তেলের দাম ১৫০ ডলারে পৌঁছানো ঠেকাতে চীনের বিশাল তেল মজুত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু সেই মজুতও চিরকাল ব্যবহার করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বন্ডবাজারের বিনিয়োগকারী ও ভোটাররাও উচ্চ দামের কারণে ধৈর্য হারাচ্ছেন। এই দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতির মুখে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদকরা গত কয়েক সপ্তাহে নতুন কৌশলটি ব্যবহার শুরু করেছে।
তবে এটি কোনো নিখুঁত সমাধান নয়। হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত সরু, কোথাও কোথাও এর প্রস্থ মাত্র ২৩ মাইল। সেখানে লুকিয়ে থাকার জায়গাও খুব বেশি নেই। ট্রান্সপন্ডার বন্ধ থাকলেও রাডারে একটি জাহাজ ধরা পড়তে পারে। চলতি সপ্তাহেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের মালিকানাধীন দুটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
তারপরও কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা জাহাজের প্রায় ৮০ শতাংশই ‘ডার্ক’ অবস্থায় চলেছে। এসব জাহাজ ইরানের যতটা সম্ভব দূরে থেকে ওমানের উপকূল ঘেঁষে প্রণালি অতিক্রম করছে। তবে আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে কিছু ট্র্যাকিং ডেটায় জিপিএস জ্যামিং হয়েছে। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই নতুন কৌশল ব্যবহারকারী অনেক জাহাজের মতো কিকুও ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করার এক দিন পর আবার সংকেত দেয়। তখন সেটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দরনগরী ফুজাইরার কাছে নোঙর করা ছিল। ট্রান্সপন্ডার আবার চালু হওয়ার পর কিকু আরেকটি গ্রিক মালিকানাধীন সুপারট্যাংকার নেভ ইলেকট্রনের পাশে নোঙর করে। নেভ ইলেকট্রন তার এক দিন আগে ওমান উপসাগরে পৌঁছেছিল।
দুটি জাহাজ সেখানে এক সপ্তাহ পাশাপাশি অবস্থান করে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর করে। ৮ আগস্ট তারা আলাদা হয়ে যায়। নেভ ইলেকট্রন তেলবোঝাই অবস্থায় উপসাগর ছেড়ে আরব সাগরের দিকে যায়। তার গন্তব্য ছিল চীনের নিংবো। অন্যদিকে কিকু ফুজাইরার উপকূলে প্রায় ১৪ আগস্ট পর্যন্ত অবস্থান করে। এরপর আবার সেটি ‘ডার্ক’ হয়ে যায়। পরদিন বিকেল ৪টার কিছু আগে কিকুর সংকেত আবার দেখা যায়। এবার সেটি পারস্য উপসাগরের দিকে ফিরে কাতারের দিকে যাচ্ছিল।
মার্কিন সামরিক পাহারায় এই ‘ডার্ক ট্রানজিট’ মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদকদের নতুন কৌশলের সর্বশেষ উদাহরণ। এর মাধ্যমে তারা বিশ্ববাজারে ক্রেতাদের কাছে আরও বেশি তেল পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ, কৌশলের দিক থেকে ইরানকেই পাল্টা চাপে ফেলা হচ্ছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সৌদি আরব। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালিতে অপেক্ষমাণ ট্যাংকারে পাঠানোর পরিবর্তে অন্য পথে পাঠাচ্ছে।
এই তেল ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দরে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদকরা প্রতিদিন আরও ২০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে অন্য পথে পাঠাচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও তেল উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে পরিস্থিতি সামাল দিতে।
ব্রাজিল, গায়ানা ও ভেনেজুয়েলা মিলিয়ে প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি অতিরিক্ত তেল উৎপাদন যোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও প্রতিদিন আরও কয়েক লাখ ব্যারেল তেল বাজারে যোগ করেছে। এ ছাড়া আরও অনেক কম সমন্বিত এবং সামরিক সুরক্ষা ছাড়া ‘ডার্ক ট্রানজিট’ও কয়েক মাস ধরে চলছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার জরুরি তেল মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছে। এতে দেশটির স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা কৌশলগত তেল মজুত ব্যাপকভাবে কমে গেছে। চীনও তার বিশাল তেল মজুতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। একই সময়ে দেশটি অপরিশোধিত তেল আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দাম বাড়ার কারণে মানুষ ও প্রতিষ্ঠান কম তেল ব্যবহার করছে। এটিও তেলের বাজারে ভারসাম্য আনতে এবং প্রয়োজনীয় ক্রেতাদের কাছে তেল পৌঁছাতে সাহায্য করছে। অর্থাৎ, বাজার কোনো না কোনো পথ খুঁজে নিচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় বিশ্বের সবচেয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরাও যে মাত্রার জটিলতা ও নমনীয়তা আশা করেছিলেন, বাস্তবে তেলের বাজার তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল এবং নমনীয় বলে প্রমাণিত হয়েছে।
রাডার ও স্যাটেলাইটের ছবি হরমুজ প্রণালির এমন একটি চিত্র তুলে ধরছে, যা শুধু ট্রান্সপন্ডার ডেটা দেখে বোঝা সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৪ আগস্টের স্যাটেলাইট ছবিতে ওমানের উপকূল ঘেঁষে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে বাঁক নিয়ে যাওয়া সারি সারি বিন্দু দেখা যায়।
কিন্তু ওই বিন্দুগুলো একই সময়ের জাহাজ-ট্র্যাকিং ডেটার সঙ্গে মেলে না। কারণ ওই ‘বিন্দু’গুলো ছিল এমন জাহাজ, যেগুলো ডার্ক হয়ে গিয়েছিল। আবার ৭ আগস্ট, ট্রান্সপন্ডার ডেটায় দুটি গ্রিক মালিকানাধীন ট্যাংকারকে ওমান উপসাগরে পাশাপাশি দেখা যায়। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, নিসোস কিথনস নামের একটি শাটল ট্যাংকার, যেটি ডার্ক অবস্থায় হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছিল, ফ্রন্ট ওত্রার পাশে অবস্থান করছে। ১৪ আগস্ট ফ্রন্ট ওত্রাকে আরব সাগরে তাইওয়ানের দিকে যেতে দেখা যায়। অন্যদিকে নিসোস কিথনস তখন আবার পারস্য উপসাগরে ফিরে গেছে।
তবে এই ব্যবস্থা চিরকাল চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যুদ্ধ চলাকালে বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত প্রায় ১৯০ কোটি ব্যারেল পর্যন্ত কমে গেছে। বাজার যদি আবার ভারসাম্যে ফিরতে পারে, তাহলে পরবর্তী সংকট ঠেকাতে এই মজুতগুলো পুনরায় পূরণ করতে হবে। আর যদি বাজার ভারসাম্যে ফিরতে না পারে, তাহলে মজুত একসময় এত নিচে নেমে যাবে যে বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদা মেটাতে আর সেগুলোর ওপর নির্ভর করা যাবে না।
তখন পরিস্থিতি এমন এক বিন্দুতে পৌঁছাবে, যেখানে চাহিদা আরও কমিয়ে আনার জন্য তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোই হবে একমাত্র উপায়। অর্থাৎ দাম এত বাড়াতে হবে যে মানুষ ও প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে আরও কম তেল ব্যবহার করবে।
জ্বালানি বাজারেও ইতিমধ্যে একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের চারটি প্রধান রিফাইনিং হাবের মধ্যে তিনটি গুরুতর সংকটে রয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং ওই অঞ্চল থেকে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে। আরেকটি বড় জ্বালানি সরবরাহকারী রাশিয়াও ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান আরেক যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার শোধনাগারগুলোতে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ায় মস্কো তার জ্বালানি রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে। চীনও নিজ দেশে জ্বালানি সংকট এড়াতে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চীন সাধারণত বিশ্ববাজারে একটি বড় জ্বালানি রপ্তানিকারক। ফলে বৈশ্বিক চাহিদার বড় অংশের চাপ এখন যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের শোধনাগারগুলোর ওপর পড়েছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোও চিরকাল সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে গ্যাস, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের চাহিদা এত বেশি, অথচ এগুলো উৎপাদনের জন্য পরিশোধন ক্ষমতা এত সীমিত যে এসব জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। দাম এতটাই বেড়েছে যে অপরিশোধিত তেলের দামের তুলনায় পরিশোধিত জ্বালানির দাম যে মাত্রায় থাকার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক মাস ধরে আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতি আসছে বলে আশ্বাস দিয়ে তেলের দাম কম রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তাঁর পরিকল্পনা বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল হলো ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চেপে ধরা। এর অংশ হিসেবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নৌ অবরোধ চালিয়ে দেশটির বিরুদ্ধে একটি ‘দুমড়ে মুচড়ে দেওয়া অর্থনৈতিক অভিযান’ শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনার কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরে তেলের দাম ধীরে ধীরে বাড়ছে। দাম এখন প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। দুই দেশ যখন যুদ্ধের এমন এক জটিল ও অচলাবস্থার মধ্যে আটকে আছে, যার সহজ সমাধান দেখা যাচ্ছে না, তখন হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই তেলের পাশাপাশি বিশেষ করে গ্যাস, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দাম অস্বস্তিকরভাবে উচ্চ পর্যায়ে।
এর ফলে ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে এবং তাদের হাতে খরচ করার মতো অর্থ কমে যাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বাজারের এই সংঘাতকে অন্তত আংশিকভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার অসাধারণ সক্ষমতা তেলের দামকে আরও ভয়াবহ মাত্রায় বেড়ে যাওয়া থেকে ঠেকিয়েছে। অর্থাৎ, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ সংকটগুলোর একটি যে মাত্রায় দাম বাড়িয়ে দেওয়ার কথা ছিল, বাজারের নানা বিকল্প পথ তৈরি করার ক্ষমতা সেই বিস্ফোরণকে এখনো অনেকটাই ঠেকিয়ে রেখেছে।