বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM
Topic Ads 1
ইসরায়েলের নির্দেশনায় এয়ার ফ্রান্সের ফ্লাইটে ৩১ দেশের ক্রুদের দায়িত্বে নিষেধাজ্ঞা

ইসরায়েলের নির্দেশনায় এয়ার ফ্রান্সের ফ্লাইটে ৩১ দেশের ক্রুদের দায়িত্বে নিষেধাজ্ঞা

এয়ার ফ্রান্স ইসরায়েলের নতুন নির্দেশনা মেনে দেশটির আকাশসীমায় চলাচলকারী ফ্লাইটে নির্দিষ্ট ৩১টি দেশের নাগরিক পাইলট ও কেবিন ক্রুদের দায়িত্ব দেওয়া থেকে বিরত থাকছে। বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর নাগরিকদের লক্ষ্য করে জারি করা এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে। ফরাসি আইনজীবীদের মতে, বিদেশি সরকারের নিরাপত্তাসংক্রান্ত নির্দেশনা মানতে গিয়ে এয়ার ফ্রান্স নিজ দেশের শ্রম আইন লঙ্ঘন করতে পারে এবং আইনি জটিলতায় পড়তে পারে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের নতুন বিধিনিষেধের আওতায় আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইরান, ওমান, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও নাইজারসহ ৩১টি দেশের নাগরিকদের ইসরায়েলের আকাশসীমায় প্রবেশকারী ফ্লাইটে কাজ করার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এয়ার ফ্রান্স আল-জাজিরাকে জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলের নতুন বিধিনিষেধ মেনে চলছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, যেসব দেশে তারা ফ্লাইট পরিচালনা করে, সেসব দেশের কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রবেশসংক্রান্ত বিধিবিধান যাত্রী ও কর্মী- উভয়ের ক্ষেত্রেই মেনে চলতে হয়। ফ্লাইটের সহপাইলটকে ঘিরে ঘটনার পর নির্দেশনা ইসরায়েলি সম্প্রচারমাধ্যম এন১২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় গত ১ অক্টোবর বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোকে নতুন নির্দেশনা দেয়। এতে বলা হয়, ইসরায়েলের আকাশসীমায় চলাচলকারী ফ্লাইটের পাইলট ও কেবিন ক্রুদের এমন কোনও দেশের নাগরিকত্ব বা দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা যাবে না, যেসব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটের সহপাইলট বিমানটি ছিনতাই করে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে আছড়ে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন বলে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে। ওই ঘটনায় সহপাইলটের বিরুদ্ধে বিমানের ভারতীয় পাইলটকে আক্রমণের অভিযোগও রয়েছে। আহত পাইলট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুস্থ হয়ে উঠছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনার পরদিনই বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর প্রতি নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে এন১২ জানিয়েছে। এয়ার ফ্রান্স বলেছে, তেল আবিবগামী ফ্লাইটের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের নতুন নিয়ম সম্পর্কে জানানো হয়েছে। প্রভাব পড়তে পারে বহু আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থায় ইসরায়েলের নির্দেশনার প্রভাব দেশটিতে, দেশটি থেকে এবং দেশটির আকাশসীমা ব্যবহার করে চলাচলকারী কয়েক ডজন বিমান সংস্থার ওপর পড়তে পারে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ইসরায়েলের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল আল-জাজিরা। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আল-জাজিরা ইসরায়েলে ফ্লাইট পরিচালনাকারী ১৫টি বড় আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার কাছেও জানতে চেয়েছিল, তারা নতুন নির্দেশনা পেয়েছে কি না এবং এর ফলে কর্মীদের দায়িত্ব বণ্টনে কোনও পরিবর্তন এনেছে কি না। চেক প্রজাতন্ত্রের বৃহত্তম বিমান সংস্থা স্মার্টউইংস নির্দেশনা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আপাতত তাদের কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়েনি। তবে তারা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বিধিনিষেধ মেনে চলবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান সংস্থা ইউনাইটেড এয়ারলাইনস শুধু জানিয়েছে, এ বিষয়ে তাদের বলার মতো কিছু নেই। তারা নির্দেশনা পেয়েছে কি না বা তা অনুসারে কোনও পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত করেনি। ফরাসি অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম মিডিয়াপার্টের হাতে আসা এয়ার ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ একটি স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, নির্দেশনা না মানলে বিমান সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্মী- উভয়েই সম্ভাব্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়তে পারেন। তবে আল-জাজিরা স্মারকলিপিটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। ফরাসি আইনে বৈষম্যের অভিযোগ প্যারিসভিত্তিক বৈষম্যবিরোধী আইনজীবী ক্লারা গাঁদাঁর মতে, ইসরায়েলের নির্দেশনা মেনে চলার কারণে এয়ার ফ্রান্স ফ্রান্সের শ্রম আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থানে পড়তে পারে। তিনি বলেন, ৩১টি দেশের নাগরিকদের সবাইকে সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করার মধ্য দিয়ে একটি সামষ্টিক ধারণার ভিত্তিতে বৈষম্য করা হচ্ছে। দেশগুলোর বেশির ভাগই আরব বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফরাসি শ্রম আইনের ১১৩২-১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নাগরিকত্বের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা নেওয়া নিষিদ্ধ। কর্মীদের দায়িত্ব বণ্টন, বেতন ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এ বিধান প্রযোজ্য। ফলে কোনও কর্মী আল-জেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইরান বা তালিকাভুক্ত অন্য কোনও দেশের নাগরিক হওয়ার কারণে নির্দিষ্ট ফ্লাইট থেকে বাদ পড়লে, বেতন কমানো না হলেও তা সরাসরি বৈষম্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে ক্লারা গাঁদাঁর মত। তার মতে, এই বিধিনিষেধ পরোক্ষভাবে জাতিগত পরিচয় কিংবা অনুমিত ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেও বৈষম্য তৈরি করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে পেশাগত প্রয়োজনের কারণে ভিন্ন আচরণের সুযোগ ফরাসি আইনে রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে বৈধ উদ্দেশ্য, আনুপাতিকতা এবং সংশ্লিষ্ট কাজের প্রকৃতির সঙ্গে বিধিনিষেধের সরাসরি সম্পর্ক থাকতে হয়। ক্লারা গাঁদাঁ বলেন, বিমান চালানোর ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট জাতীয়তা থাকা পেশাগত শর্ত হতে পারে না। একই পাইলট ও কেবিন ক্রুরা অন্য রুটে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন, অথচ শুধু ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে তাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে- এটি তাদের নিরাপত্তাঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা না করারই ইঙ্গিত দেয়। তার মতে, ইসরায়েলের বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখার বাণিজ্যিক স্বার্থ বৈষম্যকে আইনগতভাবে বৈধতা দিতে পারে না। আকাশসীমার সার্বভৌমত্ব বনাম শ্রম আইন তবে কোনও রাষ্ট্রের আকাশসীমা ও ভূখণ্ডে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং অন্য দেশের শ্রম আইনের অধীনে বিমান সংস্থার দায়িত্ব- দুটি পৃথক আইনি বিষয়। কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিমান আইনবিষয়ক অধ্যাপক ভিনসেন্ট কোরেইয়া বলেন, ১৯৪৪ সালের শিকাগো কনভেনশনের প্রথম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজ ভূখণ্ডের ওপর অবস্থিত আকাশসীমায় সার্বভৌমত্ব রয়েছে। কনভেনশনের ১৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে যাত্রী ও ক্রুদের প্রবেশসংক্রান্ত আইন প্রয়োগ করতে পারে। তার মতে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্রুদেরও অভিবাসন ও শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ফলে জাতীয়তার ভিত্তিতে তাদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রাষ্ট্রগুলোর রয়েছে। তবে ক্লারা গাঁদাঁর বক্তব্য, ইসরায়েলের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকলেও তা এয়ার ফ্রান্সকে ফরাসি শ্রম আইন ও বৈষম্যবিরোধী বিধান মানার বাধ্যবাধকতা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অব্যাহতি দেয় না। এক্ষেত্রে এয়ার ফ্রান্সের সামনে বিকল্পও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চাইলে বর্তমান শর্তে ইসরায়েলগামী ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করতে পারে অথবা ফরাসি সরকার, দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাধ্যমে নির্দেশনাটির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে। বিধিনিষেধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীরা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোও মামলা করতে পারে। ক্লারা গাঁদাঁর মতে, বিষয়টি ফৌজদারি আইনের আওতায় পড়লে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ৪৫ হাজার ইউরো জরিমানার বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে। এছাড়া কর্মীদের কাছ থেকে নাগরিকত্বসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও তথ্য সুরক্ষা আইনের প্রশ্ন উঠতে পারে। এমন তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে কর্মীর কাজের সরাসরি ও প্রয়োজনীয় সম্পর্ক থাকতে হয়। মিডিয়াপার্ট জানিয়েছে, এয়ার ফ্রান্স প্রথমে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের স্বেচ্ছায় নিজেদের পরিচয় জানানোর অনুরোধ করার কথা বিবেচনা করেছিল। তবে পাইলটদের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিয়ন অল্টার কর্তৃপক্ষকে সেই পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়। ইউনিয়নটির মতে, এমন উদ্যোগও নাগরিকত্বের ভিত্তিতে বৈষম্যের শামিল হতে পারে। বিমান আইন বিশেষজ্ঞ কোরেইয়া সতর্ক করে বলেছেন, অন্য দেশগুলোও একই ধরনের বিধিনিষেধ চালু করলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল পরিচালনা আরও জটিল হয়ে উঠবে। বিশেষ করে পাইলটের ঘাটতির সময়ে জাতীয়তার ভিত্তিতে ক্রু বাছাইয়ের বাধ্যবাধকতা বিমান সংস্থাগুলোর ফ্লাইট পরিকল্পনায় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা

Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream