বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM
Topic Ads 1
উত্তম কুমার বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ: প্রসেনজিৎ

উত্তম কুমার বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ: প্রসেনজিৎ

বাঙালির আবেগ ও ভালোবাসা আজও অটুট বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারকে ঘিরে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে প্রয়াণের চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় মহানায়কের স্মৃতিচারণা করে এবার তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। প্রসেনজিৎ মনে করেন, উত্তম কুমার বাঙালির কাছে কখনোই অতীত হয়ে যাননি। বরং তিনি এখনো বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার ভাষায়, ‘উত্তম কুমার নামের এক অভিনেতা ছিলেন, এক সময়ে’—এমন কথা কোনো বাঙালিকে বলতে শোনা যাবে না। কারণ তাঁর স্মৃতি, হাসি, তাকানো, হাঁটা-চলা কিংবা কথা বলার ধরন—সবকিছুই যেন বাঙালির জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। মহানায়কের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ককে একটু অন্যরকম বলেই মনে করেন প্রসেনজিৎ। তার মতে, উত্তম কুমার কারও আত্মীয় নন, অথচ কোথাও গিয়ে তিনি যেন সবার নিজের মানুষ। কারও কাছে তিনি বাবা-মায়ের দেখা সিনেমার নায়ক, কারও কাছে শৈশবের রবিবারের দুপুর, কারও কাছে প্রথম প্রেমের মুখ। আবার কারও কাছে তিনি অভিনয়ের এক অসাধারণ পাঠ। প্রসেনজিৎ বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেদের মতো করে উত্তম কুমারকে আবিষ্কার করেছে। তবে শুধু নস্টালজিয়া দিয়ে কোনো শিল্পীকে এত দীর্ঘ সময় বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এর পেছনে রয়েছে উত্তম কুমারের অভিনয়ের বহুমুখিতা। তার অভিনয়ের বৈচিত্র্য তুলে ধরে প্রসেনজিৎ বলেন, একই মানুষ কখনো নিখাদ প্রেমিক, কখনো সাধারণ মধ্যবিত্ত, কখনো অহংকারী তারকা, আবার কখনো ক্লান্ত ও একাকী মানুষ হয়ে উঠেছেন। তাঁর চরিত্রগুলো নিখুঁত ছিল না। তারা ভুল করেছে, ভালোবেসেছে, হারিয়েছে, দ্বিধায় পড়েছে, এমনকি কখনো নিজের কাছেই হেরে গেছে। প্রসেনজিতের মতে, উত্তম কুমারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল নিজের তারকা-সত্তাকে অতিক্রম করার ক্ষমতা। এত বড় তারকা হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের জনপ্রিয়তার ছাপ প্রতিটি চরিত্রের ওপর চাপিয়ে দেননি। বরং চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে বদলে নিয়েছেন। ফলে দর্শক অনেক সময় ভুলে গেছেন যে পর্দায় ‘উত্তম কুমার অভিনয় করছেন’; তাঁরা চরিত্রটিকেই সত্যি বলে বিশ্বাস করেছেন। বর্তমান সময়ের সঙ্গে মহানায়কের প্রাসঙ্গিকতার প্রসঙ্গেও কথা বলেছেন প্রসেনজিৎ। তাঁর মতে, সিনেমার ভাষা বদলেছে, নায়কের সংজ্ঞা বদলেছে, বদলেছে দর্শকের রুচিও। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা, একাকিত্ব, অহংকার, ব্যর্থতা কিংবা স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষার মতো অনুভূতিগুলো বদলায়নি। আর সেই চিরন্তন অনুভূতিগুলোই উত্তম কুমার অসাধারণভাবে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন। তাই সময়ের সঙ্গে উত্তম কুমারের প্রাসঙ্গিকতা কমে যাওয়ার কোনো কারণ দেখেন না প্রসেনজিৎ। বরং তাঁর মতে, একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ কখনো শেষ না হওয়া। সবশেষে উত্তম কুমারকে বাঙালির এক বিশেষ অভ্যাসের সঙ্গে তুলনা করেছেন প্রসেনজিৎ। তাঁর কথায়, যা প্রয়োজন হলে মনে করতে হয়, তা স্মৃতি। আর যা আলাদা করে মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, তা অভ্যাস। উত্তম কুমারের কাছে বারবার ফিরে আসা বাঙালির তেমনই এক অভ্যাস। সূত্র: সংবাদ প্রতিদিন

জন্মশতবর্ষেও উত্তমকুমার যে কারণে এতটা প্রাসঙ্গিক

আজ ৩ সেপ্টেম্বর বেঁচে থাকলে উত্তমকুমার ১০০ বছর বয়সে পা রাখতেন। জন্মশতবর্ষ পেরিয়েও তাঁর ব্যক্তিত্ব, অভিনয়ক্ষমতা, সংগ্রাম, প্রভাব, সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা—সবই এখনো বাঙালির নিত্যদিনের চর্চার বিষয়। ভবানীপুরের মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। থিয়েটার দেখে ছোটবেলায় অভিনয়ের প্রতি ভালো লাগা, লুকিয়ে রিহার্সাল দেখা, পরে যুক্ত হয়ে যাওয়া পাড়া আর স্কুলের নাটকের সঙ্গে এবং এভাবে অভিনয়ের প্রেমে বিভোর হয়ে যাওয়া সেই ছিপছিপে গড়নের ছেলেটি নেহাতই ঝোঁকের মাথায় ঢুকে পড়েছিলেন চলচ্চিত্রে। তখন তাঁর বাচনভঙ্গিতে সামান্য জড়তাও ছিল। সেই ত্রুটি কাটিয়ে ওঠার জন্য দিনের পর দিন পরিশ্রম। এক ছিমছাম ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ছেলে চোখে কল্পনার রঙিন চশমা লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে স্টুডিও পাড়ায়—এটা ব্যতিক্রম কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু উত্তমকুমারের মধ্যে যেটা স্বতন্ত্র ব্যাপার ছিল, সেটা হলো তাঁর লেগে থাকা, দিনের পর দিন নিজেকে তৈরি করে নেওয়া এবং লক্ষ্যে একলব্যের মতো একাগ্র থাকা। একসময় উত্তমকুমার টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়া চষে বেড়িয়েছেন একটু সুযোগের আশায়। এই অধ্যবসায়ের তাৎক্ষণিক ফল প্রথম দিকের যে সিনেমাগুলো, তার প্রায় সব কটাতেই তিনি ব্যর্থ হন। ব্যর্থতা দিয়েই শুরু হয়েছিল তাঁর পথচলা। সিনেমায় উত্তমের প্রথম আত্মপ্রকাশ ১৯৪৮ সালে—‘দৃষ্টিদান’ সিনেমায়। এতে তিনি নায়ক নন, ছিলেন পার্শ্বচরিত্রে। সিনেমা ফ্লপ হয়। পরের বছর পর্দায় নায়ক হিসেবে দেখা দেন ‘কামনা’ সিনেমা দিয়ে। সেটিও ব্যর্থ। ‘মর্যাদা’ সিনেমায় নাম পাল্টে অরূপ কুমার নামে অভিনয় করেন। কিন্তু নাম বদলালেও ভাগ্য বদলায়নি। ‘সহযাত্রী’, ‘ওরে যাত্রী’, ‘নষ্টনীড়’, ‘সঞ্জীবনী’—টানা ফ্লপের কারণে তাঁকে একটা সময়ে প্রযোজকেরা নিতেই চাইতেন না। তাঁর নামের পাশে বসে গিয়েছিল ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ তকমা। কিন্তু কোনো দিনই ধৈর্য হারাননি। তাঁর মূলধন ছিল ধৈর্য আর বিনয়। পরিচালক সুকুমার দাশগুপ্ত জানিয়েছেন, উত্তমকুমারের স্বভাবে কোনো দিনই বিরক্তি বা ঔদ্ধত্য দেখা যায়নি। বরং সবার সঙ্গে এমন মধুর ও আন্তরিক ব্যবহার করতেন, দারোয়ান কিংবা প্রোডাকশন বয় থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি পর্যন্ত তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতেন। অভিনয়ের সময় তিনি ছিলেন ছাত্রের মতো। অভিনয় শেখার প্রতি ছিল অবিচল নিষ্ঠা। ১৯৫২ সালে ‘বসু পরিবার’ দিয়ে আলোর দেখা পান উত্তম। ১৯৫৪ সালে ‘চাঁপাডাঙ্গার বউ’, ‘সদানন্দের মেলা’, ‘ওরা থাকে ওধারে’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘কল্যাণী’সহ তাঁর একগুচ্ছ সিনেমা মুক্তি পায়। এ বছর থেকেই উত্তমকুমারের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরতে শুরু করে। পঞ্চাশের দশকে বাংলা সিনেমা গ্ল্যামারের প্রতিযোগিতায় হিন্দির কাছে নিশ্চিতভাবে হেরে যাচ্ছিল। দর্শকদের ভালো লাগাকে মুগ্ধতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তখনকার বাংলা সিনেমার ছিল না। ঠিক এই পটভূমিতে আসে অগ্রদূতের পরিচালনায় ‘অগ্নিপরীক্ষা’। নায়ক উত্তমকুমার, নায়িকা সুচিত্রা সেন। প্রায় ম্যাজিকের মতো ফল পাওয়া যায় এই সিনেমা থেকে। নায়ক থেকে মহানায়কের শীর্ষ আসনটিতে উত্তরণের সঠিক যাত্রারম্ভ হয় অগ্নিপরীক্ষা থেকে। বাঙালি দর্শক তাঁদের আইডিয়াল একজন রোমান্টিক হিরোকে খুঁজে পান উত্তমকুমারের মধ্যে। পঞ্চাশের দশকের প্রায় মধ্যভাগ থেকে দর্শক, প্রযোজক, পরিবেশক ও পরিচালকদের দৃষ্টি কেড়ে নিতে লাগলেন উত্তমকুমার। বক্স অফিসের নিশ্চিত গ্যারান্টি হয়ে উঠলেন। এই দশকে মুক্তি পায় ‘গৃহপ্রবেশ’, ‘মন্ত্রশক্তি’, ‘মরণের পরে’, ‘রাইকমল’, ‘শাপমোচন’, ‘সবার উপরে’, ‘সাগরিকা’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘চিরকুমার সভা’, ‘একটি রাত’, ‘শ্যামলী’, ‘ত্রিযামা’, ‘শিল্পী’, ‘নবজন্ম’, ‘পৃথিবী আমারে চায়’, ‘তাসের দেশ’, ‘হারানো সুর’, ‘পথে হলো দেরী’, ‘বিচারক’সহ কালজয়ী সব সিনেমা। প্রায় একই রকম অবস্থা ষাটের দশকেও। ভালো-মন্দ-মাঝারি সব মিলিয়ে তিনিই সর্বোচ্চ সিনেমার মুখ্য ভূমিকায়। শুধু রোমান্টিক নায়কের ভূমিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, মদ্যপ জমিদার থেকে ছিঁচকে চোর—বহু ভূমিকাতেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। এই দশকেই উত্তমকুমারের জীবনে আরও একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ও ‘চিড়িয়াখানা’ সিনেমায় অভিনয় করেন। তাঁর অভিনয়ের ব্যপ্তি ও বিশালতা যে কত দূর যেতে পারে, তা প্রমাণ করে দেয় এই দুটি সিনেমা। ষাটের দশকের সাফল্যের পর সত্তরের দশকেও অবস্থা অপরিবর্তিত থাকে। একটানা সাফল্যের জয়রথটা সাময়িকভাবে কখনো যে একটু থমকে দাঁড়ায়নি, এমন নয়। কিন্তু সেই থামাটা পথের ওপর দাগ না ফেলতেই জয়রথ আবার গতি পেয়েছে। ১৯৮০ সালে আচমকা তাঁর প্রস্থান স্তব্ধ করে দিয়েছিল বাংলা সিনেমাকে। কিন্তু সময় কিংবা মৃত্যু—কোনোটিই বাঙালির হৃদয় থেকে উত্তমকুমারকে দূরে সরাতে পারেনি। জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়েও তাঁর সেই চিরচেনা জাদুকরি হাসি, নিখুঁত বাচনভঙ্গি আর রোমান্টিক রাজকীয় আবেদন বিন্দুমাত্র মলিন হয়নি। সিনেমা হলের রুপালি পর্দা থেকে হালের ওটিটি—আজও মধ্যবিত্ত বাঙালির আবেগ, ভালোবাসা আর নস্টালজিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি। জন্মশতবর্ষ পেরিয়েও মহানায়কের সিংহাসনে উত্তমকুমার একা, অপরাজিত ও চিরভাস্বর।

জন্মশতবর্ষেও উত্তমকুমার যে কারণে এতটা প্রাসঙ্গিক
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream