রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM
Topic Ads 1
ইরানের পিকঅ্যাক্সে হামলার ইঙ্গিত ট্রাম্পের

ইরানের পিকঅ্যাক্সে হামলার ইঙ্গিত ট্রাম্পের

ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স’ পর্বতে খুব শিগগির হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সময় শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ কথা বলেন। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প।  তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিরতি দিয়ে দিয়ে ইরানে হামলা চালাচ্ছে। এ সংঘাতকে যুদ্ধ বলা যায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি একে ‘সামরিক সংঘাত’ বলতে পছন্দ করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘অনেকেই এটিকে যুদ্ধ বলেন না। আমিও এটিকে সামরিক সংঘাত বলি। কারণ, এটি আমাদের জন্য ছোটখাটো বিষয়। এটি বড় কোনো ব্যাপার নয়।’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ‘বিরতি দিয়ে দিয়ে হামলা’ চালাচ্ছে। তার দাবি, সম্প্রতি ইরানের রাডারব্যবস্থায় হামলার আগে কয়েক দিন সেখানে সক্রিয় কোনো লড়াই হয়নি। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এখন লড়াই করছি না। কোনো লড়াই হচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর হামলা চালাচ্ছে। ট্রাম্পের দাবি, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের সুরক্ষায় থাকা ইরানের রাডার, উড়োজাহাজ ও অন্যান্য ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া মাইন অপসারণকারী জাহাজ দিয়ে হরমুজ প্রণালির মাইনও সরানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রেখেছে। তার ভাষ্যমতে, এতে ইসরায়েল ও পুরো মধ্যপ্রাচ্য সুরক্ষিত হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরান) পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। আমরা সেটিই করেছি। ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। কারণ, তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে আপনারা হয়তো আর এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন না।’ ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স’ পর্বতে হামলার বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা খুব শিগগির পিকঅ্যাক্সে হামলা চালাতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, পিকঅ্যাক্সসহ ইরানের বিভিন্ন জায়গায় কারা চলাফেরা করছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ তথ্য রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, পিকঅ্যাক্স পর্বত ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার কাছে অবস্থিত অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনা। পাহাড়ের শত শত মিটার পুরু গ্রানাইটের নিচে এখানে দুটি টানেল কমপ্লেক্স রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের ধারণা, সেখানে গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা থাকতে পারে।  তবে ইরানের দাবি, এটি উন্নত সেন্ট্রিফিউজ তৈরি ও সংযোজনের জন্য ব্যবহৃত হয়। গভীর ভূগর্ভে থাকায় স্থাপনাটি ধ্বংস করা কঠিন। এ কারণে এটি যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। চলমান সংঘাত কবে শেষ হবে, তা জানতে চাইলে ট্রাম্প কোনো সময়সীমা বলেননি। তবে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে তাদের প্রধান লক্ষ্য অর্জন করেছে। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমরা ইতিমধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয়টি অর্জন করেছি—ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না।’ ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনই ইরান থেকে সরে গেলেও দেশটির অবকাঠামো ও সক্ষমতা পুনর্গঠনে তেহরানের ২৫ বছর সময় লাগবে।

ইরানের সঙ্গে যা চলছে এটাকে যুদ্ধ বলব না: জেডি ভ্যান্স

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়েছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছে। তিনি সরাসরি বলে দেন, এটিকে যুদ্ধ বলাই যায় না। তবে এর শেষ কবে সেটিও জানেন না তিনি। এদিকে এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও যুদ্ধটি জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স এই যুদ্ধের পরিণতি বা প্রভাবকে তুচ্ছ করে দেখানোর চেষ্টা করেন। এমনকি এই সংঘাতকে কী নামে অভিহিত করা উচিত, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। ভ্যান্স বলেন, ‘আমি এটিকে যুদ্ধ বলব না। এই মুহূর্তে কোনো সক্রিয় গোলাগুলি হচ্ছে না।’ এরপর তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমি স্বীকার করি, এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেখানে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক দিন ধরে চলা তীব্র হামলা-পাল্টা হামলার পর ভ্যান্সের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য এলো। তা সত্ত্বেও ভ্যান্স দাবি করেন যে মূল সামরিক অভিযান কেবল ‘প্রায় ছয় সপ্তাহ’ স্থায়ী ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করতে সফল হয়েছে। যুদ্ধের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালীর দিকেও মনোযোগ ঘোরানোর চেষ্টা করেন ভ্যান্স। গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করার জন্য তিনি ইরানকে দায়ী করেন। সাংবাদিকদের ভ্যান্স বলেন, ‘আপনি যখন প্রশ্ন করেন, “এটি কবে শেষ হবে? ” তখন আসলে আমাকে এমন একটি প্রশ্ন করছেন ইরানিরা কবে জাহাজে গুলি চালানো বন্ধ করবে?’ তিনি বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, ওই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না। আপনাকে ইরানিদেরই জিজ্ঞাসা করতে হবে।’ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধে জাহাজ চলাচল করত। কিন্তু ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম দফায় হামলা চালানোর পর ইরান বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য জলপথটি বন্ধ করে দেয়। এতে বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধাক্কা লাগে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হতো। তবে ভ্যান্সের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন বাড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি করতে সহায়তা করছে। তিনি আরও দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল তেলের মজুদের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরের নতুন একটি চুক্তি বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমাতে সহায়তা করবে। ভ্যান্স বলেন, ‘ইরানিরা কবে জাহাজে গুলি চালানো বন্ধ করবে এবং এর প্রভাব বিশ্ববাজারে পড়া বন্ধ হবে? এর উত্তর হলো, দিন দিন এর প্রভাব কমছে।’ যুদ্ধে আরও বেশি অবদান না রাখায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরও ভর্ৎসনা করেন ভ্যান্স। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাই জ্বালানি সংকট ঠেকাচ্ছেন বলে প্রশংসা করেন। ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা এখন যা করছি, তা হলো বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা, যাতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট দেখা না দেয়। আমরা এখন জ্বালানি সংকটে পড়িনি শুধু প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বের কারণে নয়, আমাদের সামরিক বাহিনীর চমৎকার কাজের কারণেও।’ ইরানে বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভ্যান্স বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। তবে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে হামলাটির বিষয়ে দেওয়া বর্ণনা নিয়ে তিনি ‘অত্যন্ত সন্দিহান’ বলেও মন্তব্য করেন। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা এটি তদন্ত করছি, কারণ স্পষ্টতই আমরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা জানতে চাই। আমাদের সামরিক বাহিনী যখন ভুল করে, তখন তারা সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেয় এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো করার চেষ্টা করে।’ ওই হামলায় শিশুসহ অন্তত পাঁচজন নিহত এবং আরও প্রায় ৭০ জন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা উল্লেখ করেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় অতীতেও যুক্তরাষ্ট্র হামলার দায় অস্বীকার করেছে। এসব হামলার শিকার ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগও খুবই সীমিত। এই ঘটনার বিষয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা ‘কখনোই বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করে না’। যুদ্ধের প্রথম দিন ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিমান হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায়ও দায় অস্বীকার করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। নিহতদের বেশির ভাগই ছিল স্কুলশিক্ষার্থী। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের পর্যালোচনা করা প্রমাণে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

ইরানের সঙ্গে যা চলছে  এটাকে যুদ্ধ বলব না: জেডি ভ্যান্স

শর্ত মানলেই খুলবে হরমুজ, না মানলে বন্ধই থাকবে

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহেব্বি ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া হবে না যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত মেনে না নিলে।হরমুজ প্রণালীর সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পারস্য উপসাগরে শত্রুপক্ষের কোনো সামরিক জাহাজ নেই এবং হরমুজ প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।আইআরজিসির মুখপাত্র বলেন, হরমুজ প্রণালী থেকে শত্রুপক্ষের সব যুদ্ধজাহাজ কমপক্ষে ৪০০ কিলোমিটার দূরে সরে গেছে। সামরিক ও আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের অনুমতি ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো জাহাজ এই পানিপথ অতিক্রম করতে পারবে না।তিনি আরো বলেন, ওমানের নিকটবর্তী পানিপথটিও সম্পূর্ণভাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।মোহেব্বি বলেন, হরমুজ প্রণালী ইরান ও বিপরীতে অবস্থিত ওমানের অন্তর্গত। প্রায় এক মাস আগে ওমানের সাথে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য কিছু সমঝোতায় পৌঁছানো গেছে।তিনি আরো বলেন, এসব আলোচনায় প্রণালীর পানিসীমায় দুই দেশের অংশ এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত আয়ে ইরান ও ওমানের অংশীদারিত্বের বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে।আইআরজিসির মুখপাত্র অভিযোগ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছে, যার কারণে কাজের অগ্রগতি বিলম্বিত হয়েছে।তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত না মানলে কোনো অবস্থাতেই হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া হবে না।সূত্র : পার্সটুডে

শর্ত মানলেই খুলবে হরমুজ, না মানলে বন্ধই থাকবে

করিডোর হবে, মাইনও সরবে—তবু হরমুজ খুলবে না ইরান

ওমান ও ইরান হরমুজ প্রণালিতে অস্থায়ী ট্রানজিট করিডোর এবং মাইন অপসারণ নিয়ে আলোচনা করেছে। তবে বুধবার তেহরান সতর্ক করে বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধ না করা পর্যন্ত পুনরায় চালু হবে না। তেহরানে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ইরান ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য একটি রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেন। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই রূপরেখার মধ্যে নৌ-চলাচলের অস্থায়ী করিডোর এবং মাইন অপসারণ প্রকল্প আছে।  মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, প্রস্তাবিত রূপরেখাটি শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি অঙ্গীকার এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে অবিচল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রণালির তীরবর্তী দেশ দুটি জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে একটি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করারও চেষ্টা করছে। গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকে এ ধরনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পরও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে আছে। এর ফলে তেলের বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই নিজেদের মতো করে প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করে রেখেছে।

করিডোর হবে, মাইনও সরবে—তবু হরমুজ খুলবে না ইরান

ইরান-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যে অর্থনৈতিক ডি-ডে’ ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সোমবার (২৪ আগস্ট) তেহরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও দেশগুলোর বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক সংবাদ সম্মেলনে এ পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশকে ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করতে এটাই শেষ সতর্কবার্তা। না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বাদ পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। বেসেন্ট বলেন, বিশ্বজুড়ে আমরা ইরানের আর্থিক যোগাযোগের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক হামলা শুরু করেছি। আমাদের লক্ষ্য হলো এই শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা প্রতিটি অর্থনৈতিক পথ বন্ধ করে দেওয়া, যাতে তেহরান একা হয়ে পড়ে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং তেল পাচারে ইরান যেসব নেটওয়ার্ক ও আর্থিক মাধ্যম ব্যবহার করে, সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ইরানের অবৈধ আয়ের সব উৎস বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করবে। মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ইরান তার অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, সোনা, বিমান চলাচল ও নৌপরিবহন এই পাঁচটি খাত ব্যবহার করছে। এসব খাতের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। চীন কয়েক বছর ধরে ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। চীনে ইরানি তেল কেনা-বেচা বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র চাপ বাড়িয়েছে। তবে এ বাণিজ্যে জড়িত থাকতে পারে, এমন বড় চীনা ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে এখনো সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় ছয় মাস হতে চলেছে। বড় ধরনের লড়াই কমলেও যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক আলোচনা এগোয়নি। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন এখনো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম চড়া রয়েছে। যুদ্ধ ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের প্রভাব ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ওপরও পড়েছে। সর্বশেষ রয়টার্স/ইপসোস জরিপে মাত্র ৩৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক তার কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে ট্রাম্পের দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে এই অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে ইরানের ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে। এসব নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের তেল বিক্রির আয় কমানো এবং বিমান চলাচল, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ সীমিত করা। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবসার অর্থের প্রবাহও বন্ধ করার চেষ্টা করেছে ওয়াশিংটন। নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য মার্কিন ডলারনির্ভর আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা ব্যবহার করার সুযোগ থাকে না। তবে ইরান বহু আগে থেকেই ভুয়া কোম্পানি, নতুন প্রতিষ্ঠান ও জাহাজ নিবন্ধনের মাধ্যমে এসব নিষেধাজ্ঞা দ্রুত পাশ কাটানোর কৌশল বজায় রেখে আসছে।

ইরান-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যে অর্থনৈতিক ডি-ডে’ ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

ইরান ইস্যুতে এশিয়ার শেয়ারবাজারে ওঠানামা

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধের’ পরিকল্পনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের মধ্যে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে ওঠানামা দেখা গেছে। তেলের দামও একই সময়ে কিছুটা বেড়েছে। পাশাপাশি সতর্কতা বেড়েছে ওয়াল স্ট্রিটে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দরপতন এবং চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের আগে বাজারে। তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখন ষষ্ঠ মাসে গড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, হোয়াইট হাউস ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ ঘোষণা করছে। এছাড়াও ইরানের সাথে বাণিজ্য করা দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার আলোচনা থমকে আছে। যুদ্ধে কোনো পক্ষই পিছু হটার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। ফলে আগস্টের বেশিভাগ সময় তেলের দাম বেড়েছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ আরো বেড়েছে এবং বন্ড বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। সোমবার সাংবাদিকদের বেসেন্ট বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে আমাদের লক্ষ্য হলো এই স্বৈরাচারী সরকারকে টিকিয়ে রাখে এমন প্রতিটি অর্থনৈতিক পথ বন্ধ করে দেয়া, যতক্ষণ না তেহরান পুরোপুরি একঘরে হয়ে পড়ে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনব। এটি এই সরকারের অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ।’ বেসেন্ট জানান, যারা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেবে না, তারাও ইরানের সাথে বিচ্ছিন্নতার ‘অংশীদার’ হবে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের নেতাদের ফোন করে তেহরানের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছেন। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, স্বর্ণ, বিমান চলাচল ও নৌপরিবহন খাত নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হবে। সোমবার তেলের দু’টি প্রধান আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কের দামই ২ শতাংশের বেশি কমেছিল। বেসেন্টের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে—এমন ইঙ্গিত পাওয়ার পর এ দরপতন ঘটে। তবে মঙ্গলবার এশিয়ার বাজারে তেলের দাম আবার কিছুটা বেড়েছে। কুইন্টেক্স ইন্টেলের বৈশ্বিক কৌশলবিদ স্টিফেন ইনেস বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান তেহরানের বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সংকুচিত করার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছে। একইসাথে এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপ বজায় রেখে বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘আপাতত তেলের বাজার বিষয়টিকে এভাবেই নিয়েছে।’ এতে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা সুবিধা পাচ্ছে, কারণ তেলের দাম কম থাকলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপও কমে। তবে এশিয়ার শেয়ারবাজারে পরিস্থিতি ছিল দুর্বল। ওয়াল স্ট্রিটে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দরপতনের ধারাবাহিকতায় এশিয়াতেও প্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলোতে বিক্রির চাপ দেখা গেছে। প্রযুক্তি কোম্পানিনির্ভর সিউলের বাজার একপর্যায়ে ২ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাং-এর শেয়ারের দর কমে যায়। হংকং, সাংহাই, তাইপে ও ম্যানিলার বাজারও নিম্নমুখী ছিল। অন্যদিকে টোকিও, সিডনি, সিঙ্গাপুর ও ওয়েলিংটনের শেয়ারবাজারে দর বেড়েছে। এশিয়ার বাজারের এই দুর্বল পরিস্থিতির মধ্যে বিনিয়োগকারীরা এখন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার বহুল প্রতীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে আছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে এনভিডিয়ার আর্থিক প্রতিবেদনকে পুরো প্রযুক্তি ও এআই বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত দুই বছরে এআই প্রযুক্তিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পর কোম্পানিগুলো সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত ফল দিতে পারবে কি-না, তা নিয়ে বাজারে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যাশার চেয়ে ভালো আর্থিক ফল করলেও কখনো কখনো তা বিনিয়োগকারীদের সন্তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। সূত্র : বাসস

ইরান ইস্যুতে এশিয়ার শেয়ারবাজারে ওঠানামা

বিশ্বাসের সংকট মেটাতে ইরান-সৌদির জন্য ইরাকের নতুন উদ্যোগ

ইরান এবং সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের দুই আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে বিদ্যমান ‘বিশ্বাসের সংকট’ দূর করতে দুটি দেশের মধ্যে ইরাক একটি যৌথ নিরাপত্তা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। ইরাকি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরাকিয়া টিভির এক সাক্ষাৎকারে সোমবার (২৪ আগস্ট) এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাসিম আল-আরাজি জানান, ইতোমধ্যেই বাগদাদের পক্ষ থেকে তেহরান এবং রিয়াদ—উভয় দেশের সরকারের কাছে এই আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হয়েছে। ইরাকিয়া টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আল-আরাজি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের মূল সমস্যাটি হলো একে অপরের প্রতি গভীর বিশ্বাসের সংকট। এই সমঝোতা প্রস্তাবের মাধ্যমে এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের দ্বিধা ও টানাপোড়েন নিরসন সম্ভব বলে মনে করছে বাগদাদ। সূত্র: ডন

বিশ্বাসের সংকট মেটাতে ইরান-সৌদির জন্য ইরাকের নতুন উদ্যোগ

বিশাল তেলবাহী কিকু পাড়ি দিল হরমুজ প্রণালি

গ্রিসের মালিকানাধীন বিশাল তেলবাহী জাহাজ কিকু ২৫ জুলাই বিকেলে কাতারের মেসাইয়েদ তেল রপ্তানি টার্মিনালে পৌঁছায়। ৩০টি জাহাজ একসঙ্গে দেশটির পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত এই বিশাল বন্দরে নোঙর করতে পারে। দোহার প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে এই বন্দরটি। অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল বোঝাই করে কিকু চার দিন পর হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে। এটি ছিল ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) শ্রেণির জাহাজ, অর্থাৎ সবচেয়ে বড় ধরনের তেলবাহী ট্যাংকার। ১ হাজার ফুটেরও বেশি এর দৈর্ঘ্য। পারস্য উপসাগর পেরিয়ে যাওয়ার সময় জাহাজটি ঘণ্টায় ১৩ নট গতিতে চলছিল, যা এর সর্বোচ্চ গতির কাছাকাছি। এরপর ৩১ জুলাই দুপুর ২টার কিছু পর দুবাই উপকূলের কাছে হঠাৎ কিকু উধাও হয়ে যায়। তার অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম–এআইএস ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দিয়েছিল জাহাজটি। এই সামুদ্রিক রেডিও ডিভাইসের মাধ্যমে একটি জাহাজের পরিচয়, গতি, গতিপথ ও অবস্থান জানা যায়। বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক যানবাহন পর্যবেক্ষণকারী ট্র্যাকিং পরিষেবাগুলোর কাছে মনে হলো, কিকু যেন হঠাৎ করেই পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে গেছে। কিন্তু ১ আগস্ট সকাল ১০টায় আবারও কিকুকে খুঁজে পাওয়া গেল। তবে এবার সেটি হরমুজ প্রণালির অন্য পাশে। এটি তেল শিল্পের নতুন কৌশলের অংশ—রাতে ‘ডার্ক’ বা গোপন অবস্থায়, অর্থাৎ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর পাহারায় হরমুজ প্রণালি পার হওয়া। লক্ষ্য হলো ইরানের ড্রোন হামড়া এড়ানো। এক মাস আগেও কিকুকে একটি ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। তবে সেই ড্রোনটি বিস্ফোরিত না হওয়ায় জাহাজটি রক্ষা পায়। মার্কিন নৌবাহিনীর সহায়তায় সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল কোম্পানিগুলো এখন এমন তেলবাহী জাহাজ ভাড়া করছে, যেগুলো ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে পারস্য উপসাগর থেকে তেল নিয়ে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগরে যাচ্ছে। সেখানে অপেক্ষমাণ ক্রেতাদের মালিকানাধীন অন্য ট্যাংকারে তেল তুলে দিয়ে তারা আবার প্রণালি পেরিয়ে ফিরে আসছে। এর ফলে ইরানের হামলার ঝুঁকি ও বিমার অতিরিক্ত খরচের বোঝা বাণিজ্যিক জাহাজ পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সরে গিয়ে পড়ছে মার্কিন সরকার ও তেল উৎপাদকদের ওপর। মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মতে, এই কৌশল কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০ লাখ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছে। এটি বিপুল পরিমাণ। ট্রান্সপন্ডার সংকেতের ওপর নির্ভর করা ওয়াল স্ট্রিটের তেল বিশ্লেষক এবং কেপলারের মতো শিপিং ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠানগুলো যে পরিমাণ তেল পরিবহনের হিসাব দেয়, তার প্রায় দ্বিগুণ। এই গোপন বা ‘ডার্ক’ যাতায়াত মধ্যপ্রাচ্যের তেল শিল্পের হিসাব-নিকাশই বদলে দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন দুই দিনে ওমান উপসাগরে এক ডজনেরও বেশি জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর প্রত্যক্ষ করেছে। এসব তেলবাহী জাহাজ পরে চীন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশের দিকে রওনা হয়েছে। এটি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল একটি কৌশল। তবে আপাতত এটি তেলের বাজারকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। যুদ্ধের আপাত সমাপ্তি এবং হরমুজ প্রণালির জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো স্থায়ী পরিকল্পনা এখনও অধরা। ফলে এই বিকল্প ব্যবস্থা অন্তত কিছুটা সময় কিনে দিচ্ছে। কিকুর সাম্প্রতিক যাত্রার মতো ‘ডার্ক ট্রানজিট’ বেড়ে যাওয়ার ঘটনা জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ঘটছে। ইরান যুদ্ধ অনেকের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে চলছে। গত ছয় মাসে এটি বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ব্যাহত করেছে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পৌঁছেছে। বাণিজ্যিক মজুত থেকে কয়েক বিলিয়ন ব্যারেল তেল ও জ্বালানি উধাও হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি তেল মজুত ১৯৮০-এর দশকের শুরুর পর আর কখনও এত কম ছিল না। তেলের দাম ১৫০ ডলারে পৌঁছানো ঠেকাতে চীনের বিশাল তেল মজুত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু সেই মজুতও চিরকাল ব্যবহার করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বন্ডবাজারের বিনিয়োগকারী ও ভোটাররাও উচ্চ দামের কারণে ধৈর্য হারাচ্ছেন। এই দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতির মুখে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদকরা গত কয়েক সপ্তাহে নতুন কৌশলটি ব্যবহার শুরু করেছে। তবে এটি কোনো নিখুঁত সমাধান নয়। হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত সরু, কোথাও কোথাও এর প্রস্থ মাত্র ২৩ মাইল। সেখানে লুকিয়ে থাকার জায়গাও খুব বেশি নেই। ট্রান্সপন্ডার বন্ধ থাকলেও রাডারে একটি জাহাজ ধরা পড়তে পারে। চলতি সপ্তাহেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের মালিকানাধীন দুটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। তারপরও কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা জাহাজের প্রায় ৮০ শতাংশই ‘ডার্ক’ অবস্থায় চলেছে। এসব জাহাজ ইরানের যতটা সম্ভব দূরে থেকে ওমানের উপকূল ঘেঁষে প্রণালি অতিক্রম করছে। তবে আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে কিছু ট্র্যাকিং ডেটায় জিপিএস জ্যামিং হয়েছে। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই নতুন কৌশল ব্যবহারকারী অনেক জাহাজের মতো কিকুও ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করার এক দিন পর আবার সংকেত দেয়। তখন সেটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দরনগরী ফুজাইরার কাছে নোঙর করা ছিল। ট্রান্সপন্ডার আবার চালু হওয়ার পর কিকু আরেকটি গ্রিক মালিকানাধীন সুপারট্যাংকার নেভ ইলেকট্রনের পাশে নোঙর করে। নেভ ইলেকট্রন তার এক দিন আগে ওমান উপসাগরে পৌঁছেছিল। দুটি জাহাজ সেখানে এক সপ্তাহ পাশাপাশি অবস্থান করে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর করে। ৮ আগস্ট তারা আলাদা হয়ে যায়। নেভ ইলেকট্রন তেলবোঝাই অবস্থায় উপসাগর ছেড়ে আরব সাগরের দিকে যায়। তার গন্তব্য ছিল চীনের নিংবো। অন্যদিকে কিকু ফুজাইরার উপকূলে প্রায় ১৪ আগস্ট পর্যন্ত অবস্থান করে। এরপর আবার সেটি ‘ডার্ক’ হয়ে যায়। পরদিন বিকেল ৪টার কিছু আগে কিকুর সংকেত আবার দেখা যায়। এবার সেটি পারস্য উপসাগরের দিকে ফিরে কাতারের দিকে যাচ্ছিল। মার্কিন সামরিক পাহারায় এই ‘ডার্ক ট্রানজিট’ মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদকদের নতুন কৌশলের সর্বশেষ উদাহরণ। এর মাধ্যমে তারা বিশ্ববাজারে ক্রেতাদের কাছে আরও বেশি তেল পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ, কৌশলের দিক থেকে ইরানকেই পাল্টা চাপে ফেলা হচ্ছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সৌদি আরব। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালিতে অপেক্ষমাণ ট্যাংকারে পাঠানোর পরিবর্তে অন্য পথে পাঠাচ্ছে। এই তেল ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দরে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদকরা প্রতিদিন আরও ২০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে অন্য পথে পাঠাচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও তেল উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। ব্রাজিল, গায়ানা ও ভেনেজুয়েলা মিলিয়ে প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি অতিরিক্ত তেল উৎপাদন যোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও প্রতিদিন আরও কয়েক লাখ ব্যারেল তেল বাজারে যোগ করেছে। এ ছাড়া আরও অনেক কম সমন্বিত এবং সামরিক সুরক্ষা ছাড়া ‘ডার্ক ট্রানজিট’ও কয়েক মাস ধরে চলছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার জরুরি তেল মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছে। এতে দেশটির স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা কৌশলগত তেল মজুত ব্যাপকভাবে কমে গেছে। চীনও তার বিশাল তেল মজুতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। একই সময়ে দেশটি অপরিশোধিত তেল আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দাম বাড়ার কারণে মানুষ ও প্রতিষ্ঠান কম তেল ব্যবহার করছে। এটিও তেলের বাজারে ভারসাম্য আনতে এবং প্রয়োজনীয় ক্রেতাদের কাছে তেল পৌঁছাতে সাহায্য করছে। অর্থাৎ, বাজার কোনো না কোনো পথ খুঁজে নিচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় বিশ্বের সবচেয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরাও যে মাত্রার জটিলতা ও নমনীয়তা আশা করেছিলেন, বাস্তবে তেলের বাজার তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল এবং নমনীয় বলে প্রমাণিত হয়েছে। রাডার ও স্যাটেলাইটের ছবি হরমুজ প্রণালির এমন একটি চিত্র তুলে ধরছে, যা শুধু ট্রান্সপন্ডার ডেটা দেখে বোঝা সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৪ আগস্টের স্যাটেলাইট ছবিতে ওমানের উপকূল ঘেঁষে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে বাঁক নিয়ে যাওয়া সারি সারি বিন্দু দেখা যায়। কিন্তু ওই বিন্দুগুলো একই সময়ের জাহাজ-ট্র্যাকিং ডেটার সঙ্গে মেলে না। কারণ ওই ‘বিন্দু’গুলো ছিল এমন জাহাজ, যেগুলো ডার্ক হয়ে গিয়েছিল। আবার ৭ আগস্ট, ট্রান্সপন্ডার ডেটায় দুটি গ্রিক মালিকানাধীন ট্যাংকারকে ওমান উপসাগরে পাশাপাশি দেখা যায়। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, নিসোস কিথনস নামের একটি শাটল ট্যাংকার, যেটি ডার্ক অবস্থায় হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছিল, ফ্রন্ট ওত্রার পাশে অবস্থান করছে। ১৪ আগস্ট ফ্রন্ট ওত্রাকে আরব সাগরে তাইওয়ানের দিকে যেতে দেখা যায়। অন্যদিকে নিসোস কিথনস তখন আবার পারস্য উপসাগরে ফিরে গেছে। তবে এই ব্যবস্থা চিরকাল চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যুদ্ধ চলাকালে বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত প্রায় ১৯০ কোটি ব্যারেল পর্যন্ত কমে গেছে। বাজার যদি আবার ভারসাম্যে ফিরতে পারে, তাহলে পরবর্তী সংকট ঠেকাতে এই মজুতগুলো পুনরায় পূরণ করতে হবে। আর যদি বাজার ভারসাম্যে ফিরতে না পারে, তাহলে মজুত একসময় এত নিচে নেমে যাবে যে বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদা মেটাতে আর সেগুলোর ওপর নির্ভর করা যাবে না। তখন পরিস্থিতি এমন এক বিন্দুতে পৌঁছাবে, যেখানে চাহিদা আরও কমিয়ে আনার জন্য তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোই হবে একমাত্র উপায়। অর্থাৎ দাম এত বাড়াতে হবে যে মানুষ ও প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে আরও কম তেল ব্যবহার করবে। জ্বালানি বাজারেও ইতিমধ্যে একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের চারটি প্রধান রিফাইনিং হাবের মধ্যে তিনটি গুরুতর সংকটে রয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং ওই অঞ্চল থেকে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে। আরেকটি বড় জ্বালানি সরবরাহকারী রাশিয়াও ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান আরেক যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার শোধনাগারগুলোতে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ায় মস্কো তার জ্বালানি রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে। চীনও নিজ দেশে জ্বালানি সংকট এড়াতে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চীন সাধারণত বিশ্ববাজারে একটি বড় জ্বালানি রপ্তানিকারক। ফলে বৈশ্বিক চাহিদার বড় অংশের চাপ এখন যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের শোধনাগারগুলোর ওপর পড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোও চিরকাল সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে গ্যাস, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের চাহিদা এত বেশি, অথচ এগুলো উৎপাদনের জন্য পরিশোধন ক্ষমতা এত সীমিত যে এসব জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। দাম এতটাই বেড়েছে যে অপরিশোধিত তেলের দামের তুলনায় পরিশোধিত জ্বালানির দাম যে মাত্রায় থাকার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক মাস ধরে আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতি আসছে বলে আশ্বাস দিয়ে তেলের দাম কম রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তাঁর পরিকল্পনা বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল হলো ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চেপে ধরা। এর অংশ হিসেবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নৌ অবরোধ চালিয়ে দেশটির বিরুদ্ধে একটি ‘দুমড়ে মুচড়ে দেওয়া অর্থনৈতিক অভিযান’ শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরে তেলের দাম ধীরে ধীরে বাড়ছে। দাম এখন প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। দুই দেশ যখন যুদ্ধের এমন এক জটিল ও অচলাবস্থার মধ্যে আটকে আছে, যার সহজ সমাধান দেখা যাচ্ছে না, তখন হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই তেলের পাশাপাশি বিশেষ করে গ্যাস, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দাম অস্বস্তিকরভাবে উচ্চ পর্যায়ে। এর ফলে ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে এবং তাদের হাতে খরচ করার মতো অর্থ কমে যাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বাজারের এই সংঘাতকে অন্তত আংশিকভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার অসাধারণ সক্ষমতা তেলের দামকে আরও ভয়াবহ মাত্রায় বেড়ে যাওয়া থেকে ঠেকিয়েছে। অর্থাৎ, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ সংকটগুলোর একটি যে মাত্রায় দাম বাড়িয়ে দেওয়ার কথা ছিল, বাজারের নানা বিকল্প পথ তৈরি করার ক্ষমতা সেই বিস্ফোরণকে এখনো অনেকটাই ঠেকিয়ে রেখেছে।

বিশাল তেলবাহী কিকু পাড়ি দিল হরমুজ প্রণালি

সাইবার হামলায় অচল যুক্তরাজ্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র

যুক্তরাজ্যের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের সাইবার হামলায় চার দিন পুরোপুরি বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ।  এটিকে ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের প্রথম ‘সফল’ সাইবার হামলা যুক্তরাজ্যের বিদ্যুৎকেন্দ্রে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলাটি গত মাসে চালানো হয়। হামলার পর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। পরে কর্মীরা টানা কাজ করে সেটির কার্যক্রম পুনরায় চালু করেন। নিরাপত্তার কারণে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নাম প্রকাশ করেনি। হামলার শিকার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি তুলনামূলক ছোট হওয়ায় চার দিন বন্ধ থাকলেও ব্রিটেনের সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় সাইবার হামলার সক্ষমতা নিয়ে এ ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য জরুরি সেবার অবকাঠামোও এ ধরনের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হামলাটি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের সক্ষমতা প্রদর্শন বা পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে চালানো হয়ে থাকতে পারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পানি সরবরাহ অবকাঠামোতেও ধারাবাহিক সাইবার হামলার ঘটনা ঘটে। দেশটির ১২টি অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন স্থাপনা  এসব হামলার শিকার হয়।  ব্রিটিশ কর্মকর্তারা এখনো হামলার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানকে দায়ী করেননি। তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ক্রমেই ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এগুলো সাইবার হামলার ঝুঁকিতে পড়ছে।

সাইবার হামলায় অচল যুক্তরাজ্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র

হামলার জবাবে আরও বড় প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের

আগের চেয়ে আরও বড় পরিসরে ইরানের ওপর যে কোনো হামলার জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত শনিবার (২২ আগস্ট) দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তার সামরিক কৌশলে পরিবর্তন আনছে। আগে দেশটির সামরিক নীতি মূলত প্রতিরক্ষামূলক ছিল। এখন তা ধীরে ধীরে আক্রমণাত্মক অবস্থানের দিকে সরে যাচ্ছে।তবে আকরামিনিয়া স্পষ্ট করে বলেছেন, এর মানে এই নয় যে ইরান শত্রুর বিরুদ্ধে আগাম হামলা চালাবে। তিনি বলেন, আমাদের ওপর কোনো আগ্রাসন হলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে এর জবাব দেব। আর সেই জবাব হামলার চেয়েও বড় পরিসরে হবে।তিনি জানান, আগের লড়াইয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক ব্যবস্থা মেরামত করা হয়েছে এবং নতুন কিছু সামরিক সরঞ্জামও বাহিনীতে যোগ করা হয়েছে। শত্রু আবার কোনো ভুল হিসাব করলে আগের চেয়েও ভয়াবহ জবাব দেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি, বলেন তিনি।সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব কাঠামোয় সাম্প্রতিক পরিবর্তনের লক্ষ্য দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আরও দ্রুত সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানো বলেও জানান আকরামিনিয়া। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি ও সাময়িক নীরবতার সময়ও ইরান কোনো মুহূর্ত নষ্ট করেনি। কারণ আমরা শত্রুকে মোটেও বিশ্বাস করি না।এছাড়া তিনি বলেন, যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালি ইরানের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রভাব অর্জন করেছে। একই সাথে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেন।

হামলার জবাবে আরও বড় প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের

যুদ্ধের আশঙ্কায় অস্ত্রভাণ্ডার শক্ত করছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আবারো যুদ্ধ শুরু করলে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) আগের চেয়ে আরও বেশি ধ্বংসাত্মক অস্ত্র ব্যবহার করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।  তারা এখন নতুন অস্ত্র তৈরি করছে বলেও জানিয়েছেন এক মুখপাত্র।আল জাজিরা ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি’র বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।আইআরজিসির মুখপাত্র সারদার মোহেব্বি জানান, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত ওয়ারহেডের ধ্বংসক্ষমতা আগের যুদ্ধগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।তিনি বলেন, আবার যুদ্ধ শুরু হলে ইরানের অস্ত্র আগের তুলনায় সব দিক থেকেই ভিন্ন হবে।মোহেব্বি আরও জানান, নতুন অস্ত্রের মধ্যে আরও নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম নতুন প্রজন্মের ওয়ারহেড থাকবে। পাশাপাশি এসব ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লাও আগের তুলনায় বাড়ানো হচ্ছে।তিনি বলেন, ইরান এখনও নিয়মিতভাবে অস্ত্র উৎপাদন করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য নিজেদের সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়াচ্ছে।

যুদ্ধের আশঙ্কায় অস্ত্রভাণ্ডার শক্ত করছে ইরান

ইরানের পাশে দাঁড়ালেই শাস্তি ভোগ করতে হবে: ট্রাম্প

‘বাঁচিয়ে রাখার জন্য’ ইরানকে সমর্থন দেওয়া যে কোনো দেশকে অর্থনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।রয়টার্স লিখেছে, ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন তার অবসান চান।কয়েক হাজার মানুষ এই যুদ্ধে নিহত হয়েছে আর এটি দ্রুত পারস্য উপসাগারীয় দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কার্যকরভাবে তেল, গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রাখায় বৈশ্বিক বাজারগুতে জোর ধাক্কা লেগেছে। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ করা হতো ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে।ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এপ্রিল ও জুনে, দুইবার যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল, গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহের ধারা ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় ও যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্য সামনে রেখে। যুদ্ধ থেকে ইসরায়েল অনেকাংশে সরে যাওয়ার পরও প্রতিবারই দ্রুত ভেঙে পড়ে যুদ্ধবিরতি।ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা এক বার্তায় ট্রাম্প ‘অভূতপূর্ব মাত্রায় অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নকরণের’ ঘোষণা দেন। তবে তার বার্তায় বিস্তারিত তথ্য ছিলনা।টানা প্রায় ৫০ বছর ধরে ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে টিকে আছে ইরান অর্থনেতিক নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলা করে।বার্তায় ট্রাম্প লিখেছেন, “কোনো দেশ যদি তার আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর অথবা সরকারি সংস্থা ইরানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কোনো ধরনের সহযোগিতার অনুমোদন দেয় তবে তাকে ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।”তবে কোনো দেশ এমনটি করলে সেই দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো কী হবে পরিষ্কার করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে তিনি কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি।রয়টার্স লিখেছে, সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প যেসব হুমকি ও ঘোষণা দেন, সেগুলো সবসময় লিখিতভাবে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয় না অথবা সফলভাবে কার্যকর করাও হয় না।মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম, বিনিময় ও অর্থনৈতিক লেনদেন পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করেছে। ইরান থেকে ছোড়া ও সাগরে পড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র তারা শনাক্ত করেছে, আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এমন কথা জানানোর পর ওই নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেয় আবু ধাবি।বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপালারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশ কেনে চীন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে নতুন করে আরও অর্থনৈতিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পাল্টা পদক্ষেপের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কারণ চীন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারক আর দেশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিরল মৃত্তিকা খনিজও সরবরাহ করে।

ইরানের পাশে দাঁড়ালেই শাস্তি ভোগ করতে হবে: ট্রাম্প

‘যুদ্ধ ও কূটনীতিতে আমরাই বিজয়ী’: আরাগচি

'যুদ্ধ এবং কূটনীতি উভয়ক্ষেত্রেই ইরান বিজয়ী হয়েছে' বলে দাবি করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) উল্লেখ করেন, যারা শুরুতে তেহরানের 'শর্তহীন আত্মসমর্পণ' চেয়েছিল, তারা পরবর্তীতে অনুনয় করেছে আলোচনার জন্য। আরাগচি এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে জানান, ইরান বহু দিন ধরে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তি ও পশ্চিমা বিশ্বসহ একাধিক দেশের সমর্থনপুষ্ট বাহিনীর বিরুদ্ধে।তিনি বলেন, ‘যারা শর্তহীন আত্মসমর্পণ দাবি করেছিল, তারা আলোচনার জন্য কাকুতি-মিনতি শুরু করে যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পরেই।’আরাগচি দাবি করেন, শুরুতে তেহরান যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং লড়াই চালিয়ে গিয়েছিল, প্রতিপক্ষ যতক্ষণ না ইরানের শর্তে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনায় রাজি হয়। শক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ ও কূটনৈতিক আলোচনা পরিচালনা করায় বিশ্বের বহু পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার ইরানকে উদ্দেশ্য করে ‘সাদা পতাকা তোলার’ এবং আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানানোর পর আব্বাস আরাগচির এই বক্তব্যটি সামনে এলো।তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

‘যুদ্ধ ও কূটনীতিতে আমরাই বিজয়ী’: আরাগচি

‘ছিল, আছে, থাকবে’—হরমুজ নিয়ে ইরানের বার্তা

ইরান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সবসময়ই ইরানের নিয়ন্ত্রণে ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে বলে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে।সম্প্রতি ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র খুব তাড়াতাড়ি হরমুজ প্রণালিকে মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদি এ কথার জবাবে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) এক্সে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া এই প্রণালি শুধুমাত্র ইরানের নির্দেশেই খোলা বা বন্ধ হবে।তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প বলেছেন ইরান পরাজিত হলে তিনি হরমুজকে মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণা করবেন। কোনো টুইট, এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার বা প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে হরমুজ দখল করা যায় না। এখন পর্যন্ত আপনারা যে বড় ধরনের কৌশলগত পরাজয়ের মুখে পড়েছেন, অন্তত একবার সেই বাস্তবতা স্বীকার করুন।নিউইয়র্কে পুলিশ অ্যাকাডেমির এক সমাবেশে ট্রাম্প হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ইরানকে পুরোপুরি পরাজিত করার পর তিনি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ঘোষণা করবেন। তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী একটি ‘দুষ্ট দেশকে’ থামাতে কিছুটা বেশি পেট্রোলের দাম দেওয়া অর্থবহ।ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা পরে জানান, ট্রাম্প মূলত রসিকতা করেই ওই কথা বলেছিলেন।এর আগে ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে দাবি করেছিলেন, হরমুজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং মার্কিন নৌঅবরোধ এমন এক ‘ইস্পাতের প্রাচীর’ তৈরি করেছে যা ইরান ভাঙতে পারবে না। এই দাবিকে ইরানের সামরিক বাহিনী মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বার্তায় ইরানের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমান্ড ‘খাতাম-আল আনবিয়া’র মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফাগারি বলেন, হরমুজ সম্পূর্ণভাবে ইরানের সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর অনুমতি ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেল ট্যাঙ্কার সেখান দিয়ে নিরাপদে যেতে পারবে না।ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ব্যর্থতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র বারবার ভুল হিসাব করছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে এবার তারা আরও বড় ভুল ধারণায় ভুগছে।উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধ শুরু হয়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হন। এর জবাবে ইরান মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালায়।

‘ছিল, আছে, থাকবে’—হরমুজ নিয়ে ইরানের বার্তা

ইরানের পরমাণু অস্ত্রের হুমকি, ধর্মীয় নেতার বক্তব্যে নতুন শঙ্কা

এতদিন ইরানের সামরিক হুমকির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং হরমুজ প্রণালি। তবে এবার দেশটির এক প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতার বক্তব্যে প্রকাশ্যে এসেছে পরমাণু অস্ত্রের প্রসঙ্গ। তাঁর হুঁশিয়ারি, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা হলে পরিস্থিতির প্রয়োজনে তেহরান পরমাণু অস্ত্রের দিকে যেতে পারে।ইরানের আহভাজ শহরের জুমার নামাজের খতিব ও ধর্মীয় নেতা মোহাম্মদ নবি মুসাভিফার্দ শুক্রবারের খুতবায় এ সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, প্রতিপক্ষ যদি ইরানের বিরুদ্ধে কথিত ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ওয়ার’ বা দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা শুরু করে, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে।মুসাভিফার্দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের অবকাঠামো লক্ষ্য করে যুদ্ধ শুরু হলে দেশটি বাধ্য হয়ে পরমাণু অস্ত্রের দিকে যেতে পারে। তাঁর এই বক্তব্যের পর ইরানের পরমাণু নীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি এখন পর্যন্ত ইরান সরকারের পক্ষ থেকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়। বরং বক্তব্যটি এসেছে দেশটির একজন প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতার কাছ থেকে। মুসাভিফার্দ আরও বলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি দেশটির অভ্যন্তরীণ এখতিয়ার।বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইরানের ওপর পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চাপ বাড়ানো হলে তেহরান আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে—এমন একটি রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এটি ইরানের সম্ভাব্য প্রতিরোধ কৌশল নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেন। মুসাভিফার্দ বলেন, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই এই সংঘাতে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসা দেশটির জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইরান সংঘাতকে আঞ্চলিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা ও প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবারও পৃথক এক বক্তব্যে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ইরানের নীতিগত শর্তগুলো পূরণ করা না হলে চলমান পরিস্থিতি ‘আক্রমণাত্মক যুদ্ধের পর্যায়ে’ চলে যেতে পারে।সব মিলিয়ে ইরানের অবস্থানে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে একদিকে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থ রক্ষার অবস্থান, অন্যদিকে চাপ বাড়লে সামরিক প্রতিরোধ জোরদারের হুঁশিয়ারি। এর সঙ্গে পরমাণু অস্ত্রের প্রসঙ্গ যুক্ত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।তবে মুসাভিফার্দের বক্তব্যকে ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আপাতত একজন ধর্মীয় নেতার দেওয়া কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

ইরানের পরমাণু অস্ত্রের হুমকি, ধর্মীয় নেতার বক্তব্যে নতুন শঙ্কা

খারগ দ্বীপে ফের সক্রিয় ইরানের তেল রপ্তানি

প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপে ফের ট্যাংকারে অপরিশোধিত তেল তোলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে ইরানের। জুলাইয়ের পর শুক্রবার (১৪ আগস্ট) প্রথমবারের মতো দ্বীপটির একটি পিয়ারে ইরানি ট্যাংকারকে তেল তুলতে দেখা গেছে। সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাংকার ট্র্যাকার্স এ তথ্য জানিয়েছে।ট্যাংকার ট্র্যাকার্সের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ইরানিয়ান ট্যাংকার কোম্পানির (এনআইটিসি) একটি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) খার্গ দ্বীপের আজারপাদ জেটি থেকে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল তুলেছে।এক্সে দেওয়া এক পোস্টে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ইরানের অন্যান্য তেল টার্মিনাল থেকেও ট্যাংকারে তেল তোলার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে দেশটির বর্তমান তেল উৎপাদন প্রায় পরিশোধনাগারগুলোর কার্যক্রম বা অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের সমপর্যায়ে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইরানের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রয়োজন নাও হতে পারে বলে মনে করছে ট্যাংকারট্র্যাকার্স।ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ। দেশটির অপরিশোধিত তেলের বড় একটি অংশ এই দ্বীপের টার্মিনাল দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়। ফলে দীর্ঘ বিরতির পর সেখানে আবারও ট্যাংকারে তেল তোলার ঘটনা ইরানের তেল রপ্তানি কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।তবে দেশটির মোট তেল উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং রপ্তানির পরিমাণের মধ্যে ভারসাম্য থাকায় সামনের দিনগুলোতে ইরান কতটা অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠাতে পারবে, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

খারগ দ্বীপে ফের সক্রিয় ইরানের তেল রপ্তানি
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream