রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM
Topic Ads 1
সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা এবং আইন বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। পাশাপাশি দুর্ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে শক্তিশালী ডেটা সেল গঠন এবং পরিবহন খাতগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা। আজ সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আয়োজিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন: বর্তমান প্রেক্ষিত ও সরকারের অঙ্গীকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। বৈঠকে সঞ্চালনা ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নিসচার মহাসচিব লিটন এরশাদ। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, আইন প্রয়োগ, চালকদের প্রশিক্ষণ, যাত্রী সচেতনতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের বিষয় জড়িত। তাই দুর্ঘটনা কমাতে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের পরিবর্তে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বৈঠকে সড়ক দুর্ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য কার্যকর ‘রোড সেফটি ডেটা সেল’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা, দুর্ঘটনার কারণ, হতাহতের সংখ্যা, যানবাহনের ধরন, সড়কের অবস্থা ও আইন লঙ্ঘনের তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করা গেলে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে। পাশাপাশি গৃহীত পদক্ষেপের অগ্রগতিও মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। পরিবহন খাতগুলোর মধ্যে প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা সড়ক, নৌ, রেল ও বিমানপথের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা একই মন্ত্রণালয়ের আওতায় এনে সমন্বিতভাবে পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা ও তুলনামূলক গবেষণার ওপরও গুরুত্ব দেন তাঁরা। বৈঠকে জাতিসংঘের ‘সেফ সিস্টেম’ পদ্ধতি অনুসরণের পাশাপাশি গতিনিয়ন্ত্রণ, চালকদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ, যানবাহনের নিরাপত্তা, পথচারীদের সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, সরকারি সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করে প্রস্তাবিত সড়ক নিরাপত্তা আইনে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ, নিয়মিত তদারকি এবং অগ্রগতি প্রকাশের ব্যবস্থা রাখার মত দেন বক্তারা। জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তা কর্মদশক ২০২১-২০৩০-এর লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সময়সীমা ও অগ্রগতি পরিমাপের সূচক নির্ধারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি বক্তব্য দেন নিসচার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয়। তিনি বলেন, সড়কে নিরাপত্তা জোরদারে নিসচার স্বপ্নদ্রষ্টা ইলিয়াস কাঞ্চনের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারকে সাধুবাদ জানাই। গোলটেবিল বৈঠকের সারসংক্ষেপ ও অংশীজনদের মতামতের আলোকে ২০২৭ সালের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়িত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। নিসচার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন ভার্চ্যুয়ালি বক্তব্যে বলেন, গত ৩৩ বছর ধরে নিসচা সড়ক নিরাপত্তায় জনসচেতনতা তৈরি, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের দাবি জানানো এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার কাজ করছে। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ প্রণয়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে সরকারের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। বৈঠকে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিআরটিএর চেয়ারম্যান হাবীবুর রহমান, বিআরটিসির চেয়ারম্যান মীর আহমেদ তারিকুল ওমর, বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, বুয়েটের অধ্যাপক ও সড়ক বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আইয়ুব ভুঁইয়া, হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন্স) মুনতাসিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান প্রমুখ। বৈঠকে নিসচার পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত সড়ক নিরাপত্তা আইন পর্যালোচনা, অংশীজনদের মতামত তুলে ধরা এবং আইন বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রস্তুতির কথা জানানো হয়।

মোদি সরকারের নতুন গোপনীয়তা আইন নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর আপত্তি

ভারতের নতুন গোপনীয়তা আইন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে অভিযোগ করেছে দেশটির ২১টি সংবাদমাধ্যম। তাদের আশঙ্কা, এই আইনের কারণে সাংবাদিকদের তথ্যসূত্রের পরিচয় ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মঙ্গলবার ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আইনটির বিরুদ্ধে শুনানিতে এসব অভিযোগ তুলে ধরে সংবাদমাধ্যমগুলো। একই সঙ্গে আইনটির বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিলের দাবি জানিয়েছে তারা।প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের করা ‘ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্টের’ বিরুদ্ধে এটি এখন পর্যন্ত অন্যতম আলোচিত আইনি চ্যালেঞ্জ। মামলাকারীদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ধনকুবের মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানির মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমও।সংবাদমাধ্যমগুলোর সংগঠন ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিএনপিএ) সদস্যদের মধ্যে রয়েছে নেটওয়ার্ক–১৮, এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং টাইমস অব ইন্ডিয়া গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান টাইমস ইন্টারনেট। শুনানিতে ডিএনপিএর আইনজীবী মাধবী গোরাদিয়া দাভান বলেন, ‘আইনটি সংবাদ কী, সেই ধারণাই বদলে দিচ্ছে। সাংবাদিকদের প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুমতি নিতে বাধ্য করা হলে সংবাদকক্ষ বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং তা কার্যত আগাম সেন্সরশিপের ব্যবস্থা তৈরি করবে।’ দাভান আরও বলেন, আইনের আগের সংস্করণগুলোতে সাংবাদিকদের জন্য ছাড় রাখা হলেও চূড়ান্ত সংস্করণে তা বাদ দেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করার আগে তাঁকে জানাতে হবে এবং তাঁর সম্মতি নিতে হবে। গবেষণা, আর্কাইভ সংরক্ষণ ও পরিসংখ্যানগত কাজের ক্ষেত্রে ছাড় থাকলেও সাংবাদিকতাকে এর আওতামুক্ত রাখা হয়নি। ডিএনপিএর আশঙ্কা, কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করার আগে তাঁকে জানাতে হলে তিনি প্রমাণ নষ্ট করতে পারেন, সাক্ষীদের ভয় দেখাতে পারেন কিংবা প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই অনুসন্ধান বাধাগ্রস্ত করতে পারেন। আইনে কোনো ব্যক্তি যেকোনো সময় তাঁর সম্মতি প্রত্যাহার করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যবহার বন্ধ করে তথ্য মুছে ফেলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যদি অন্য কোনো আইনে তা সংরক্ষণের নির্দেশ না থাকে। প্রকাশকদের দাবি, সাংবাদিকতার জন্য ব্যতিক্রম না থাকায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লিখিত ব্যক্তিরা এই বিধান ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। এর ফলে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন মুছে ফেলতে বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দিয়ে প্রকাশ করতে হতে পারে, যা ঐতিহাসিক নথি ও জনস্মৃতির ওপরও প্রভাব ফেলবে। আইন অনুযায়ী, সরকার ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কাজ করা যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দিতে পারবে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তথ্য চাওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানানোও নিষিদ্ধ করতে পারে সরকার। সংবাদ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য, সাংবাদিকদের জন্য ব্যতিক্রম না থাকায় এই বিধান সংবাদকক্ষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। তাদের দাবি, আদালতের অনুমোদন ছাড়াই তথ্য চাওয়ার এই ক্ষমতা সাংবাদিকদের তথ্যসূত্র শনাক্ত ও তাঁদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে ব্যবহৃত হতে পারে। এমনকি সাংবাদিক বা তথ্যদাতার কাছে থাকা গোপনীয় যোগাযোগের তথ্যও এর আওতায় আসতে পারে। আইন লঙ্ঘনের দায়ে সরকারের নিয়োগ দেওয়া কেন্দ্রীয় ডেটা প্রোটেকশন বোর্ড কোনো প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ২৫০ কোটি ভারতীয় রুপি জরিমানা করতে পারবে। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৬২ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। ডিএনপিএ বলেছে, সীমিত আর্থিক সামর্থ্য নিয়ে কাজ করা আঞ্চলিক, স্বাধীন ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের জন্য এত বড় অঙ্কের জরিমানা অস্তিত্বের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া, কোনো প্রতিষ্ঠানকে অন্তত দুবার জরিমানা করার পর বোর্ড কনটেন্ট বন্ধের সুপারিশ করলে সরকার ‘সাধারণ জনগণের স্বার্থে’ ওই প্রতিষ্ঠানের সংবাদবিষয়বস্তু বন্ধ করার নির্দেশ দিতে পারবে। প্রকাশকদের মতে, এই বিধান বাক্স্বাধীনতার ওপর আরও বড় হুমকি তৈরি করে, কারণ ‘সাধারণ জনগণের স্বার্থ’কে ভিত্তি করে সংবাদ বন্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, গত আগস্টে সরকারের সঙ্গে বৈঠকে তাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে আইনটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখবে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যের মতো সাংবাদিকদের জন্য সুস্পষ্ট লিখিত ব্যতিক্রম না থাকায় তারা উদ্বিগ্ন। প্রকাশকেরা আইনটির অধিকাংশ বিতর্কিত বিধান বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। এসব বিধান ২০২৭ সালের মে মাস থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমে যাওয়ার অভিযোগ করে আসছেন সমালোচকেরা। তাঁদের দাবি, দেশটির মূলধারার অনেক সংবাদমাধ্যম সরকারের কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে পর্যালোচনা ও সমালোচনা করছে না। তবে ভারত সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সম্মান করে। আইনটির বিরুদ্ধে এর আগে বাক্স্বাধীনতার অধিকারকর্মী ও কয়েকটি ছোট সংবাদমাধ্যম আদালতে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। মঙ্গলবারের শুনানির পর সুপ্রিম কোর্ট আগামী মাসে মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে।

মোদি সরকারের নতুন গোপনীয়তা আইন নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর আপত্তি

গত শাসনামলে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার: আইনমন্ত্রী

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘গত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এ দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন ও সংবিধানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ৪ হাজার ৫০০-রও বেশি ভিন্নমতাবলম্বী বা রাজনৈতিক কর্মী বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন।’ আজ বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সালাম, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। আইনমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক আইনের শাসনের জন্য লড়াই করা প্রায় ৭০০ মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছয় মিলিয়নের বেশি মানুষ রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। এসব মামলার প্রায় ৯৯ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়ের প্রসঙ্গ তুলে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, গত ছয় মাসের বেশি সময়ে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ দেখিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা প্রায় শূন্যের কোঠায় রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পুলিশ মিথ্যা মামলা করেছে—এমন কোনো অভিযোগও তাঁরা পাচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেন। আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে সংবিধান আমাদের পথ দেখানোর মূল ভিত্তি। এভাবেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।’ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৭৮৭ সালের সেপ্টেম্বরে গৃহীত যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের শুরুতে লেখা হয়েছিল ‘উই, দ্য পিপল অব আমেরিকা’। আর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধানেও লেখা হয়েছে ‘উই, দ্য পিপল অব বাংলাদেশ’। তাঁর মতে, দুই সংবিধানের মধ্যে এটি একটি মিল। মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের মূল ভিত্তি গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা। স্বাধীনতার মধ্যে মতপ্রকাশ, সমাবেশ, চলাচল ও সংগঠনের স্বাধীনতাও রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানও কিছু মৌলিক ভিত্তি ও কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারণার মিল রয়েছে। তিনি বলেন, ১৮০৩ সালে মারবারি বনাম ম্যাডিসন মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বিচারিক পর্যালোচনার নীতি প্রয়োগ করে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনেও সুপ্রিম কোর্ট একই ধরনের এখতিয়ার প্রয়োগ করছে। তবে কখনো কখনো এ এখতিয়ার অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগও হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। আইনমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের আগে জন লক, টমাস হবস ও মন্টেস্কুর রাজনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা ও সেগুলো অনুসরণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রেও এসব তত্ত্বের প্রভাব রয়েছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের সময়ও তীব্র আলোচনা ছিল। সংবিধান নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে। বাংলাদেশের সংবিধান নিয়েও শুধু আইনজ্ঞদের মধ্যে নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের চায়ের দোকানেও আলোচনা হয়। সংবিধানের বিভিন্ন বিধান, সংশোধনী ও প্রয়োগ নিয়ে সাধারণ মানুষের এই আলোচনা তাঁদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ যখন প্রয়োজনের মধ্যে থাকে তখন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের পাশে থাকা, কর্তৃত্ববাদিতার বিরুদ্ধে অবস্থান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা এবং নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটকানোর বিরুদ্ধে কথা বলা —এসব বিষয় তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন। একই সঙ্গে সংগঠন ও সমাবেশের স্বাধীনতার পক্ষেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন তিনি। মানবাধিকার কমিশন আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার দেশে আরও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আইন করেছে। আইনের কিছু ধারা নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে বলেও স্বীকার করেন তিনি। তবে জনগণের অধিকার সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যেই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানান। আইনমন্ত্রী বলেন, মানবাধিকার কমিশন আইনে ‘ওএফসিএটি’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের বাছাই কমিটিতে প্রেসক্লাব ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিধান রাখা হয়েছে। তাঁর দাবি, অন্যান্য কিছু দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বাছাই প্রক্রিয়ায় ভিন্ন ধরনের প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়েছে। এখানে বাছাই কমিটির প্রধান হিসেবে স্পিকার থাকছেন এবং বিরোধী দলের নেতাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং সুশাসন বর্তমান সময়ে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে অর্থনীতি ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রে ভঙ্গুর পরিস্থিতি থেকে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, এসব অপরাধের বিচার সম্পন্ন করার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ‘কোনো ব্যক্তি আমাদের লক্ষ্য নয়, আমাদের লক্ষ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন করা’—বলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, এসব অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক নির্বাহীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। চলমান বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁদের হাতে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে এবং এসব প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধ প্রমাণিত হবে বলে তিনি মনে করেন। অনুষ্ঠানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, ১৭৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের সময় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও মতপার্থক্য ছিল। তাঁর মতে, সংবিধানের শক্তি সবাই সব বিষয়ে একমত হওয়ায় নয়; বরং মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি টেকসই কাঠামো তৈরি করতে পারার মধ্যে। তিনি ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক সংশোধনের সুযোগকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের স্থায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উল্লেখ করেন।

গত শাসনামলে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার: আইনমন্ত্রী
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream