তথ্য সচিবের বহুমুখী বিতর্ক ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক:তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সচিব মাহবুবা ফারজানার কার্যক্রম, রাজনৈতিক ভূমিকা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে তীব্র অসন্তোষ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন, লিয়েনে বিদেশি প্রকল্পে কাজ এবং একাধিক দেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও বিদেশ সফরের সুযোগ পাওয়ার কারণে তাঁর ‘বঞ্চিত’ থাকার দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি, বর্তমান অন্তর্বর্তী ও পরবর্তী সরকারের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা, তথ্য ক্যাডারের পদোন্নতিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং গণভোটের পক্ষে প্রকাশ্য প্রচারণায় অংশ নেওয়ার মতো ঘটনা প্রশাসনের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।বিগত সরকারের আমলে ‘সুবিধাভোগী’ অবস্থানের অভিযোগদাপ্তরিক নথি ও সার্ভিস রেকর্ড (PDS) অনুযায়ী, মাহবুবা ফারজানা বিগত সরকারের প্রায় ১৫ বছরে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তিন দফায় (২০০৩, ২০১৩ ও ২০২০ সালে), ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অর্থ বিভাগে এবং ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন।এছাড়া, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি লিয়েনের সুবিধায় বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প SEIP ও SIIP-এ জেন্ডার স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই সময়ে তিনি সরকারি পদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি বেতনের সুযোগ পান। পাশাপাশি, গত দেড় দশকে সরকারি ও প্রকল্পের অর্থে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া (চারবারসহ), জাপান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভারতসহ অন্তত ১০টি দেশ সফর করেছেন তিনি। ২০২০ সালের জুনে যুগ্মসচিব পদে দ্রুত পদোন্নতি পাওয়ার বিষয়টিও তাঁর ‘বঞ্চিত’ থাকার দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।তথ্য ক্যাডারের পদোন্নতিতে স্থবিরতা ও অসন্তোষতথ্য ক্যাডারের শূন্য পদে পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা আহ্বানের প্রক্রিয়া বিভিন্ন অজুহাতে দীর্ঘায়িত করার অভিযোগ রয়েছে সচিবের বিরুদ্ধে। গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তের কথা বলে প্রক্রিয়াটি ঝুলিয়ে রাখার ফলে ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্য কোনো সার্ভিসে এ ধরনের তদন্তের নজির না থাকলেও সচিবের দীর্ঘসূত্রতার কারণে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি আটকে গেছে।রাজনৈতিক অবস্থান ও সমন্বয়হীনতার বিতর্করাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সচিব পদে বহাল থাকা মাহবুবা ফারজানার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিভিন্ন মহল। বিশেষ করে, ২০২৬ সালের গণভোটে রাজশাহীতে একটি সরকারি অনুষ্ঠানে কর্তৃত্ববাদী শাসন ঠেকাতে তিনি প্রকাশ্যেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন। এছাড়া, বিভিন্ন সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে বাধা ও অসহযোগিতার অভিযোগ এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণের অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। বর্তমান বিএনপি সমর্থিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গেও তাঁর কাজের সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।সরকারের প্রচারব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাবমন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ এই অসন্তোষ ও দপ্তরগুলোর সঙ্গে দূরত্বের কারণে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং জনসংযোগ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার ফলে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, নীতি ও সিদ্ধান্ত সময়মতো গণমাধ্যমে পৌঁছানো ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে সরকারের সামগ্রিক জনসংযোগ ও প্রচার কার্যক্রম মার খাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।প্রশাসনের কার্যকারিতা ও গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে দ্রুত দক্ষ ও নিরপেক্ষ নেতৃত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।