শান্ত পরিবারের আড়ালে না-বলা কষ্টের গল্প ‘ব্লু হেরন’
হঠাৎ করেই পরিবারের বড় সন্তান জেরেমির আচরণ বদলে যেতে শুরু করে। কখনো সে খুব রেগে যায়, কখনো আবার হঠাৎ কোথাও হারিয়ে যায়। শুরুতে মা–বাবা বিষয়টিকে সাধারণ দুষ্টুমি ভেবে শাসন করলেও ধীরে ধীরে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। একটি পরিবারের ভেতরে জমে থাকা কষ্ট, ভয়, মানসিক চাপ এবং না-বলা কথাগুলোকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হয়েছে কানাডীয় চলচ্চিত্র ‘ব্লু হেরন’।সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন কানাডীয় পরিচালক সফি রোমভারি। এটি তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি সিনেমাটির গল্পের অনুপ্রেরণা নিয়েছেন।সিনেমাটিকে একটি পারিবারিক বা ফ্যামিলি ড্রামা মনে হলেও এতে শৈশবের স্মৃতি, অভিবাসী জীবনের বাস্তবতা, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিচালক, যা বিশ্বের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। দিন দিন বহু মানুষ উদ্বাস্তু হচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, নিরাপত্তাসহ বহু কারণে অনেকেই দেশ ছাড়ছেন। দেশান্তর শিশুদের মনের ওপর গভীর ছাপ ফেলে যায়, যা আড়ালেই থেকে যায়। এমন ঘটনাগুলো শিশুদের একসময় পারিবারিক ট্রমার গভীরে নিয়ে যায়। ভ্যারাইটিতে পরিচালক বলেছেন, ‘একটি শিশু পরিবারের সংকটকে যেভাবে দেখে, তা বড়দের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। শিশুর কাছে অনেক ঘটনা রহস্যময়, বিভ্রান্তিকর এবং কখনো কখনো ভয়ংকর হয়ে ওঠে।’সিনেমাটির অন্যতম শক্তি এর নির্মাণভঙ্গি। পরিচালক সফি রোমভারি অতিরঞ্জিত নাটকীয়তা এড়িয়ে নীরবতা, দীর্ঘ শট, ঘরের স্বাভাবিক শব্দ, প্রকৃতির দৃশ্য এবং চরিত্রগুলোর সূক্ষ্ম অভিব্যক্তির মাধ্যমে সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন। অতি সংলাপ বর্জন করা হয়েছে। তার জায়গায় পরিবেশের সঙ্গে শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক দিক, আলো–আঁধারের খেলা, নীরবতা এবং স্মৃতির অনুভূতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যে কারণে সিনেমাটি প্রশ্ন করে, একটি পরিবার মানসিক সংকটের মুখোমুখি হলে কীভাবে টিকে থাকে? শিশুরা বড়দের আচরণ কীভাবে বুঝতে শেখে? শুধু তা–ই নয়, শিশুরা শৈশবের ট্রমা নিয়েই বড় হতে থাকে। এই ট্রমা কখনোই মুছে যায় না। যা দিন দিন আরও মানসিক সংকট তৈরি করে। ঘটনাগুলো শিশুর বেড়ে ওঠার ওপর প্রভাব ফেলে। একসময় বাস্তবতাকে আলাদা করে দেয়।‘ব্লু হেরন’ আলোচনায় এসেছে আরও কয়েকটি কারণে। এর আগে সফি রোমভারি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা বানালেও এটি তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। প্রথম সিনেমাতেই রয়েছে পরিপক্বতার ছাপ। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে গল্প নির্মাণ করায় সিনেমাটিতে বাস্তবতার ছাপ ঘুরে–ফিরে এসেছে। শৈল্পিক এই সিনেমায় পরিবার, শোক, অভিবাসী জীবনের অনিশ্চয়তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলোকে খুব কাছ থেকে দেখা যায়। যে কারণে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতেও সিনেমাটি ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে।পরিচালক লোকার্ন উৎসবে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ আমাকে একজন নির্মাতা হিসেবে আত্মবিশ্বাস এবং নিজস্ব ভাষা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। এখন ফিরে তাকালে দেখি, আমার প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র থেকে “ইটস হোয়াট ইচ পারসন নিডস” পর্যন্ত একটি সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে সেই ভাষা তৈরি করার পরই “ব্লু হেরন”-এ আমি নিজেকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পেরেছি। কারণ, এ গল্পটি আমার।’ সাক্ষাৎকারে পরিচালক আরও জানান, বড় কোনো নাটকীয় ঘটনার চেয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবারের নীরব ভাঙন এবং একজন শিশুর বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতার দিকে। ধীরগতির, সংবেদনশীল এবং গভীর মানবিক এই চলচ্চিত্র দর্শককে সহজ উত্তর দেয় না; বরং পরিবার, স্মৃতি এবং মানসিক ক্ষত নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।খুবই কম বাজেটের এই ইন্ডি সিনেমায় প্রধান চরিত্র সাশা। এ চরিত্রে অভিনয় করেছে আইয়ুল গুভেন। প্রাপ্তবয়স্ক সাশা চরিত্রে অভিনয় করেছেন অ্যামি জিমার। জেরেমি চরিত্রে অভিনয় করেছেন এডিক বেডোজ। মায়ের চরিত্রে ইরিঙ্গো রেতি এবং বাবার চরিত্রে আদাম তোম্পা। সিনেমাটির আইএমডিবি রেটিং ৭.১। এখনো সিনেমাটি বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হচ্ছে। সিনেমাটি আগামী মেলবোর্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হবে। সিনেমাটি লোকার্ন উৎসব থেকে স্পেশাল মেনশনসহ দুটি পুরস্কার পায়। টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব থেকে বেস্ট কানাডিয়ান ডিসকভারি অ্যাওয়ার্ড জয় করে।