ডিমলা খাদ্য গুদামের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ
আব্দুর রহিম রিয়াদ, ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি। নীলফামারীর ডিমলায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলারদের চাল সরবরাহে ঘুষ আদায়,চাল কম দেয়া,নিম্নমানের চাল সরবরাহ ও সরকারি নতুন বস্তা বিক্রি করে পুরোনো ছেঁড়া-ফাটা বস্তায় বোরো ধান সংগ্রহসহ ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ফের খাদ্য গুদামের দুই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।এর আগেও ডিমলা খাদ্য গুদামের এই দুই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকারের কোটি টাকা ক্ষতি করে ঘুষ বাণিজ্য, টিসিবির ডিলারদের নিম্নমানের চাল সরবরাহ, খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির ডিলারদের চাল সরবরাহে অর্থ আদায়সহ বিভিন্ন অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্া কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা দিন-দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ রয়েছে কি না।অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের আগস্ট মাসে উপজেলার ৪১ জন খাদ্যবান্ধব ডিলারের মধ্যে চারজনকে ৩০ কেজির ছোট বস্তায় ও ৩৭ জনকে ৫০ কেজির বড় বস্তায় মোট ৬৪০ মেট্রিক টন চাল সরবরাহ করা হয়।এসব ৩৭ জন ডিলারকে ৫০ কেজির বস্তায় চাল সরবরাহের সময় খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) নবাব ডিলার প্রতি সর্বনিম্ন ৩ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেন।ডিলারদের কম চাল ও নিম্নমানের চালও সরবরাহ করেন।এছাড়া চাল সরবরাহের আগে হাইকোর্টের রিট সংক্রান্ত অনুমতিপত্রে জেলা সরকারি কৌঁসুলি (জিপি) অথবা পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) অনুমতি নেওয়ার কথা বলে খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদ ডিলারদের কাছ থেকে কৌশলে ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির এক ডিলার বলেন, বড় বস্তায় চাল নিতে গিয়ে ওসিএলএসডিকে ৩ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। পাশাপাশি হাইকোর্টের কাগজে পিপি অথবা জিপির অনুমতি নেওয়া ও খাদ্য নিয়ন্ত্রকের অফিসের খরচ বাবদ সব ডিলারের পক্ষ থেকে খাদ্য নিয়ন্ত্রককে ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।এ ছাড়াও তাকে ডিলার প্রতি দেড় হাজার টাকা করে অফিস খরচ বাবদ দেয়া হয়েছে।অপর দুই ডিলার অভিযোগ করে বলেন, বড় বস্তায় চাল নেওয়ায় ডিলারপ্রতি ওসিএলএসডিকে ৫ হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে।জীবনে এই ওসিএলএসডির মত কোনো ওসিএলএসডি দেখিনি।এনার সংসারের মরিচ থেকে শুরু করে পরিবারের যাবতীয় খরচ ও ব্যক্তিগত সকল খরচ সবই চলে ডিলার-ব্যবসায়ীদের টাকায়।তাদের মধ্যে একজন চাল কম পেয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন।আরেক ডিলার বলেন, বড় বস্তায় চাল নেওয়ার কারণে আমাকেও ওসিএলএসডিকে ৪ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। আগের মতই বাণিজ্য চলছে।শুধু চাল সরবরাহে অর্থ আদায়ের অভিযোগই নয়, গুদামের কাগজপত্রে প্রায় ৪২ হাজার বস্তা পুরোনো দেখিয়ে ৯ হাজারের বেশি ৫০ কেজি ধারণক্ষমতার নতুন বস্তা (ক্যালেন্ডার) গোপনে বেশি দামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরে কম দামে পুরোনো, ছেঁড়া ও ফাটা বস্তা কম মুল্যে কিনে সেগুলোতে বোরো ধান সংগ্রহের মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়।এসব বস্তার মধ্যে গত ৫ ও ৬ জুলাই ভোরে গোপনে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বস্তা সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে গত ১৩ জুলাই ঢাকা মেট্রো-ট-১৬-৫৮৮৫ নম্বরের একটি ট্রাকে করে আরও আড়াই হাজার বস্তা সরিয়ে নেওয়া হয়।এদিকে আগস্ট মাসের চাল ডিলারদের বিক্রি শেষ হওয়া মাত্রই সেপ্টেম্বর মাস শুরু হতে আরও বেশকিছু দিন বাকি থাকলেও তড়িঘড়ি করে আগে ভাগেই গত মাসের মতই ঘুষ নিয়ে সেপ্টেম্বরের চাল খাদ্য গুদাম থেকে ডিলারদের সরবরাহ করা হচ্ছে।এছাড়াও খাদ্য গুদাম থেকে লোক দেখানো আংশিক ধান সরবরাহ করে অধিকাংশ ধানের মান যাচাই-বাছাই না করে ও গুদামে উত্তোলন না করেই বাহির থেকে সরাসরি ছাটাইয়ের জন্য ঘুষের বিনিময়ে চুক্তিবদ্ধ মিলকে দেয়া হচ্ছে।তারপর সেইসব ধান গুদামে উত্তোলন দেখিয়ে বিভিন্ন কৃষকের নামে বিল করার অভিযোগও রয়েছে ওই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।এসব মিলের মধ্যে শুধু সালভি অটো রাইস মিলকে গুদামের বাহির থেকে সরাসরি ১ হাজার ২শত বস্তার ধান দেয়া হয়েছে।অভিযোগ রয়েছে, ডিমলা খাদ্য গুদামের এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং দায়সারা তদন্তের জন্য সমমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে প্রধান করে এর আগে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিলো। এ বিষয়ে স্থানীয় ডিলার ও সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, একই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বারবার অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠলেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? তাই বিষয় গুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।এ বিষয়ে খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসিএলএসডি) নবাব বলেন, কে আপনাকে অভিযোগ করেছে তাকে আপনি অফিসে নিয়ে আসেন।খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদ বলেন,আমরা এবার পিপির নয়,জিপির অনুমতি নিয়েছি।এবার আমি কোনো রকম কারো সাথে কথা বলিনি ও কোনো রকম কোনো লেনদেনে থাকিনি।আর হয়তোয়া গুদামে ৪২ হাজার বস্তার মধ্যে কিছু নতুন ছোট বস্তা বেড়িয়েছে তা বিক্রি করতে পারেন ওসিএলএসডি।জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সৈয়দ আতিকুল হক ফোন রিসিভ না করলেও ক্ষুদে বার্তার উত্তরে বলেন, ম্যাসেজ দেখে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছি।দু-তিন দিন অপেক্ষা করুন।ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) ইমরানুজ্জামান বলেন,আর্থিক সংশ্লিষ্টতা যদি কারো পাওয়া যায় আমরা এবার হার্ডলাইনে যাব।যদি কেউ অন্যায় করে থাকেন ও আর্থিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় তবে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।তবে জেলা প্রশাসক(ডিসি) মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামানকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।এমনকি ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর মেলেনি।