রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM

সম্পাদকীয়

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার নতুন দ্বার

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার নতুন দ্বার

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, territorial integrity এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের যেকোনো সিদ্ধান্ত হতে হবে অত্যন্ত বিচক্ষণ, বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে সামনে এসেছে, এবং বাংলাদেশও বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে।  আমার ব্যক্তিগত মত হলো, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য এই উদ্যোগকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আমাদের অনুরোধ—বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ—সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে যদি দেশের জন্য কল্যাণকর মনে হয়, তাহলে মক্কা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার বিষয়টি সাহস ও দূরদর্শিতার সঙ্গে বিবেচনা করুন।  বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাব ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে যে উদ্বেগগুলো জনমনে রয়েছে, সেগুলোও উপেক্ষা করা উচিত নয়। ‘অখণ্ড ভারত’ বা ‘Greater India’-র ধারণা ভারতীয় উপমহাদেশকে একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক পরিসর হিসেবে দেখার একটি রাজনৈতিক-আদর্শিক ধারণা; তবে এটিকে ভারতের রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশকে দখল বা একীভূত করার পরিকল্পনার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করার আগে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকা জরুরি।  তাই আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত কোনো দেশের বিরুদ্ধে অন্ধ বিরোধিতা নয়, বরং বাংলাদেশ প্রথম—যে দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক হোক, তা হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারের ভিত্তিতে। শক্তিশালী কূটনীতি, আধুনিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব—এই তিনটির সমন্বয়ই পারে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে আরও শক্তিশালী করতে।  মক্কা চুক্তিতে যোগদান যদি বাংলাদেশের জন্য সেই কৌশলগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বাড়ায়, তাহলে এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে; তবে সিদ্ধান্তটি অবশ্যই আবেগ দিয়ে নয়, পূর্ণাঙ্গ জাতীয় স্বার্থের হিসাব-নিকাশ করেই নিতে হবে।আমার পক্ষ থেকে মূল বার্তা একটাই—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা নীতির চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং দেশের মানুষের নিরাপত্তা। কোনো বিদেশি শক্তির চাপ, প্রভাব বা স্বার্থ নয়; বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রেরই।

নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: সাফল্য ও বাস্তবায়নের মধ্যবর্তী অবস্থান

বাংলাদেশের নতুন বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু উদ্যোগ ও পরিবর্তন দেখা গেলেও, বড় ধরনের অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।বাংলাদেশের নতুন বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে সরকার একদিকে বিভিন্ন সংস্কার ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি সংকট, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির নানা চাপের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে ছয় মাসের পারফরম্যান্স নিয়ে সরকারের দাবি ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার মধ্যে এখনও কিছুটা ব্যবধান রয়েছে।সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম ছয় মাসকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরির সময় হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর কাছে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা আরও সুনির্দিষ্টভাবে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।স্বাস্থ্য খাতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা সুবিধা আরও সহজলভ্য করার কথা জানিয়েছে সরকার। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব ফলাফল সাধারণ মানুষের কাছে পুরোপুরি দৃশ্যমান হতে আরও সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।অর্থনীতির ক্ষেত্রে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের দুর্বলতা, ব্যাংক খাতের সমস্যা এবং কর্মসংস্থান। কিছু অর্থনৈতিক সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা বলা হলেও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে মানুষের উদ্বেগ এখনো রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ বড় সমস্যা হয়ে আছে।ব্যাংক খাতও সরকারের জন্য বড় একটি পরীক্ষা। দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক এবং আর্থিক খাতের অনিয়ম মোকাবিলায় সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। সরকার এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও এর বাস্তব প্রভাব পুরোপুরি দেখতে আরও সময় লাগবে।জ্বালানি খাতেও পরিস্থিতি সহজ ছিল না। গ্যাসের সরবরাহ সংকট শিল্পকারখানা ও উৎপাদন খাতে প্রভাব ফেলেছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কিছু কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং কোথাও কোথাও প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা লেঅফের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এতে কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের ওপর চাপ রয়েছে। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। সরকার আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নের উদ্যোগের কথা বললেও বিভিন্ন ঘটনায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সরকারকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিরোধী মত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও মানুষের প্রত্যাশা রয়েছে।পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় রয়েছে। প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন ও ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে ঢাকা। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, নিরাপত্তা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে প্রত্যর্পণ ইস্যুর মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।সরকারের ছয় মাসের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে সমর্থকেরা নতুন সামাজিক কর্মসূচি, প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রচেষ্টার কথা বলছেন। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, জনগণ এখন ঘোষণার চেয়ে বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়। বাজারে দাম কমা, চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি, নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া এবং সরকারি সেবার মান উন্নত হওয়াই শেষ পর্যন্ত সরকারের জনপ্রিয়তা নির্ধারণ করবে।বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সরকারের জন্য ছয় মাস খুব দীর্ঘ সময় নয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সমস্যাগুলো কয়েক মাসে সমাধান করা কঠিন। তবে ছয় মাসের মধ্যে সরকারের অগ্রাধিকার ও কাজের দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হয়ে যায়। এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।আগামী ছয় মাসে তাই সরকারের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংক খাত সংস্কার, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং দুর্নীতি কমানো। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তে পারে।সব মিলিয়ে নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসকে একেবারে ব্যর্থ বা পুরোপুরি সফল—কোনো একটি শব্দে মূল্যায়ন করা কঠিন। সরকার বেশ কিছু কর্মসূচি ও সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু সেগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল এখনো পরিমাপ করার সময় আসেনি। জনগণের জন্য বাস্তব পরিবর্তন কতটা আসে, সেটিই শেষ পর্যন্ত সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হয়ে থাকবে।

নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: সাফল্য ও বাস্তবায়নের মধ্যবর্তী অবস্থান

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে কি বদলে যাচ্ছে শক্তির ভারসাম্য?

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নতুন সমীকরণ শুধু সামরিক চুক্তি নয়; এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিতকলামমধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন একটি অধ্যায় শুরু হয়েছে। ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নেতারা যে ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষর করেছেন, সেটিকে নিছক আরেকটি প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেকটাই আড়ালে থেকে যাবে। চুক্তির মূল বার্তা স্পষ্ট—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। (Reuters)এই ঘোষণার সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য যখন একের পর এক সংঘাত, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা সংকট এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অস্থির, ঠিক তখনই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার পথে হাঁটল।প্রশ্ন হচ্ছে—কেন এখন?আমার দৃষ্টিতে, এর উত্তর শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে খুঁজলে হবে না। এর পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা-নির্ভরতার ধারণায় পরিবর্তন।এক চুক্তিতে তিন ধরনের শক্তিসৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক—তিন দেশই মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, কিন্তু তাদের শক্তির ভিত্তি এক নয়।সৌদি আরবের প্রধান শক্তি তার অর্থনীতি, জ্বালানি সম্পদ, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং সামরিক ব্যয়। পাকিস্তানের রয়েছে বিশাল সামরিক বাহিনী ও পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা। তুরস্ক আবার ন্যাটোর সদস্য এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলেছে।অর্থাৎ এই তিন দেশের অংশীদারত্বে অর্থনৈতিক শক্তি, সামরিক সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও কৌশলগত অবস্থান—সবকিছুই এক জায়গায় আসছে।তবে শুধু শক্তির হিসাব দিয়ে এই চুক্তির গুরুত্ব বোঝা যাবে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিন দেশ এখন নিজেদের নিরাপত্তাকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।‘একজনের ওপর হামলা, সবার ওপর হামলা’চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, এর প্রতিরক্ষা ধারা প্রযুক্তিগতভাবে ন্যাটোর Article 5-এর সঙ্গে তুলনীয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো হামলার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তিন দেশের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হবে। সহায়তার ধরন পরিস্থিতি অনুযায়ী গোয়েন্দা তথ্য, রসদ, সামরিক সহায়তা কিংবা প্রয়োজনে সেনা মোতায়েন পর্যন্ত হতে পারে। (The Washington Post)এখানেই চুক্তিটির বাস্তব গুরুত্ব।কারণ প্রতিরক্ষা জোটের শক্তি শুধু অস্ত্রের সংখ্যায় নয়; সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে এই বার্তা দেওয়াতেও যে একটি দেশকে আঘাত করলে একাধিক দেশের প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।এটি কি ইরানবিরোধী জোট?এ প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনায় ইরানকে বাদ দিয়ে কোনো নিরাপত্তা বিশ্লেষণ করা কঠিন।কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে তুরস্ক বলেছে, চুক্তিটি ইরান বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে তৈরি হয়নি। হাকান ফিদান জানিয়েছেন, চুক্তিতে কোনো সাধারণ শত্রুর নাম উল্লেখ নেই এবং যে দেশ তাদের আক্রমণ করবে না, তাকে লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে না। (The Washington Post)এই অবস্থানটি কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সৌদি আরব যদি প্রকাশ্যে ইরানবিরোধী সামরিক ব্লক গঠন করে, তাহলে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। বরং ‘প্রতিরক্ষামূলক’ কাঠামো হিসেবে চুক্তিটিকে উপস্থাপন করলে রিয়াদ ও আঙ্কারা উভয়েরই কূটনৈতিক জায়গা কিছুটা বিস্তৃত থাকে।যুক্তরাষ্ট্র কি তার প্রভাব হারাচ্ছে?চুক্তিটির সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন সম্ভবত এটিই।মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্রে বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে ওয়াশিংটনের প্রভাব গভীর।তবে আঞ্চলিক দেশগুলো এখন যে একটি বিকল্প বা অতিরিক্ত নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ছাতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর প্রবণতা তুলে ধরছে। (Council on Foreign Relations)তবে এটিকে ‘মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়’ বলা এখনই অতিরঞ্জিত হবে।বরং বাস্তবতা হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র থাকবে, কিন্তু তার পাশাপাশি আঞ্চলিক দেশগুলোও নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াবে।তুরস্কের জন্য লাভ কোথায়?এই চুক্তি সৌদি আরবের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তুরস্কের জন্যও তা কম নয়।আঙ্কারা বহুদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের কৌশলগত প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তুরস্ক আঞ্চলিক সংকটের সমাধানে ‘আঞ্চলিক শক্তির নেতৃত্বে আঞ্চলিক সমাধান’-এর ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। নতুন চুক্তি সেই কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। (RUSI)আরেকটি বড় বিষয় হলো প্রতিরক্ষা শিল্প। তুরস্ক ইতোমধ্যে ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অবস্থান শক্ত করেছে। নতুন চুক্তিতে যৌথ সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা, যৌথ উৎপাদন এবং প্রযুক্তি বিনিময়ের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। (Reuters)অর্থাৎ ভবিষ্যতে এটি শুধু সেনা-সেনা সম্পর্ক নয়; প্রতিরক্ষা শিল্পেরও একটি বড় সহযোগিতামূলক প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।পাকিস্তানের জন্য নতুন কৌশলগত সুযোগপাকিস্তানের জন্য চুক্তিটির গুরুত্ব আরও বিস্তৃত।দেশটি একদিকে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করে। এখন সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ায় ইসলামাবাদের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়তে পারে।বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। নতুন চুক্তি সেই পুরোনো সম্পর্ককে একটি বহুপাক্ষিক কাঠামো দিয়েছে। (Reuters)তবে পাকিস্তানের জন্য ঝুঁকিও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সংঘাতে জোটের বাধ্যবাধকতা সক্রিয় হলে ইসলামাবাদকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।মক্কা থেকে পরবর্তী গন্তব্য কোথায়?সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চুক্তিটি এখন কাগজের বাইরে কতটা বাস্তব রূপ পায়।তুরস্ক জানিয়েছে, তিন দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সামরিক বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে নিয়মিত সমন্বয় কাঠামো তৈরি হবে। সৌদি আরবে একটি স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে স্থল, সমুদ্র, আকাশ ও সাইবার ক্ষেত্রে যৌথ সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে। (Reuters)আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভবিষ্যতে অন্য দেশ এই কাঠামোয় যোগ দিতে পারে। তুরস্কের পক্ষ থেকে মিসরের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের কথাও বলা হয়েছে। (The Washington Post)এটি বাস্তবায়িত হলে তিন দেশের চুক্তি ধীরে ধীরে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিণত হতে পারে।সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাতবে এখানে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ারও সুযোগ নেই।একটি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করা সহজ; কিন্তু সংকটের মুহূর্তে তিন দেশের রাজনৈতিক অবস্থান এক রাখা কঠিন। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নিজেদের জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক অগ্রাধিকার ও পররাষ্ট্রনীতির পার্থক্য রয়েছে।তাই চুক্তিটির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—রাজনৈতিক ঐক্য, সামরিক সমন্বয় এবং সংকটের সময়ে বাস্তব সহযোগিতা।আমার কাছে মক্কা চুক্তির সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই। এটি হয়তো রাতারাতি মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা বদলে দেবে না। কিন্তু এটি দেখিয়ে দিয়েছে, আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তার প্রশ্নে আগের চেয়ে বেশি সক্রিয়।মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা থাকবে। ইরান থাকবে। ইসরায়েলও থাকবে। কিন্তু তাদের পাশাপাশি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যদি নিজেদের মধ্যে কার্যকর সামরিক ও রাজনৈতিক সমন্বয় গড়ে তুলতে পারে, তাহলে শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আসবেই।মক্কার এই চুক্তি তাই শুধু তিনটি দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সমঝোতা নয়—এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোন পথে এগোতে পারে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।তথ্যসূত্রReuters — Turkey, Saudi Arabia and Pakistan defence pactReuters — Saudi Arabia, Turkey and Pakistan sign joint defence dealAssociated Press — Pact is not aimed at Iran, says TurkeyAtlantic Council — Analysis of the Mecca defence agreement

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে কি বদলে যাচ্ছে শক্তির ভারসাম্য?
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream