সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM
Topic Ads 1
চা শ্রমিকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মাখন লাল কর্মকার ছিলেন প্রাতঃস্মরণীয়: সৈয়দ আমিরুজ্জামান

চা শ্রমিকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মাখন লাল কর্মকার ছিলেন প্রাতঃস্মরণীয়: সৈয়দ আমিরুজ্জামান

দেওয়ান মাসুকুর রহমান শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (রেজি. নং বি-৭৭) সভাপতি, শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাজঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং দেশের চা শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যায্য দাবির আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা শ্রমিক নেতা মাখন লাল কর্মকার স্মরণে শ্রীমঙ্গলে শোক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভার শুরুতে প্রয়াত এই নেতার সম্মানে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন করা হয়।  বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বেলা ১২টায় মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল শহরস্থ বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সদর দপ্তর লেবার হাউসের সভা কক্ষে এ শোক সভার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এ শোকসভায় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয়, বালিশিরা সহ ৭ ভ্যালির প্রতিনিধি ও বিভিন্ন চা বাগানের পঞ্চায়েত নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। এছাড়াও অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা'র বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান। তিনি বলেন, "দীর্ঘ জীবনে মাখন লাল কর্মকার চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, জীবনমানের উন্নয়ন, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের চা শ্রমিক অঙ্গন, শ্রমিক সংগঠন, রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।"তিনি বলেন, মাখন লাল কর্মকার ছিলেন চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পরিচিত মুখ। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে থেকে তিনি দীর্ঘদিন চা শ্রমিকদের বিভিন্ন ন্যায্য দাবি-দাওয়া নিয়ে কাজ করেছেন। শ্রমিকদের সংগঠিত করা, তাদের দাবি কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে তুলে ধরা এবং অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।শ্রমিক নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাজঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এলাকার সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।চা অধ্যুষিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকার শ্রমিকদের কাছে তিনি ছিলেন পরিচিত ও আস্থাভাজন নেতা। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও শ্রমিক-সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে চা শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা ও অধিকারসংক্রান্ত বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।"সভায় বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, "বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আমরা আজ এই শোকসভা পালন করছি। মাখন লাল কর্মকার দীর্ঘদিন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনারা জানেন, দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সংগঠনের সংগ্রামী পথচলায় মাখন লাল কর্মকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি ছিলেন একজন বলিষ্ঠ ও নিবেদিতপ্রাণ শ্রমিক নেতা। "তাঁর মৃত্যুতে আভীর  সমবেদনা প্রকাশ করছি। আমরা প্রার্থনা করি, পরমেশ্বর যেন তাঁকে শান্তিতে রাখেন এবং তাঁর আত্মার শান্তি দান করেন। তাঁর কর্ম ও স্মৃতি চিরঞ্জীব হোক। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি চা শ্রমিকদের জন্য অনেক কিছু করে গেছেন। তাঁর অবদান আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করব।" বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পঙ্কজ এ কন্দের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শোকসভায় বক্তব্য দেন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল, অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দী, সাংগঠনিক সম্পাদক ও বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা, বালিশিরা ভ্যালি সম্পাদক কর্ণ তাঁতী, লংলা ভ্যালির সভাপতি শহিদুল ইসলাম, ইউনিয়ন প্রতিনিধি সুমন তাঁতী, চা শ্রমিক নেত্রী খাইরুন আক্তার, মাকড়ীছড়া চা বাগানের কাশিনারায়ন গড়, সাতগাঁও চা বাগানের কাজল কালেন্দি, মধুপুর চা বাগানের গোপাল গড়, কামাইছড়া চা বাগানের বিমল ভর, দারাগাঁও চা বাগানের প্রেমলাল আহির, ফুলছড়া চা বাগানের জগবন্ধু রায়, রাজঘাট চা বাগানের পলাশ বোনার্জী, নূর হোসেন, উজ্জ্বল দাস, সরফরাজ সাজু, সুভাষ রবিদাস,সহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। উল্লেখ্য, মাখন লাল কর্মকার বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন নম্বর বি-৭৭-এর সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সংগ্রামী নেতা ছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি চা শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। সম্প্রতি তাঁর মৃত্যুতে চা শ্রমিক সংগঠন ও শ্রমিকদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।উল্লেখ্য যে, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শ্রীমঙ্গল উপজেলার খেজুরিছড়া চা বাগানে নিজ বাসভবনে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২ বছর।মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও চার মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধব ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

মেননকে হত্যাচেষ্টার ৩৪ বছর : বিচার অধরাই রয়ে গেছে!

“মেনন এখনো – আমাদের সাহসের পতাকাশোনো সবাই!মেননের বুক আজও কাঁপিয়ে দেয় সময়কে—সেই বুক, যেটা গুলির ঝাঁঝরা হয়েছিল,তবুও থামেনি হৃদস্পন্দন,থামেনি মুক্তির মিছিলের ধ্বনি।যখন রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল,বাংলার মাটি শপথ নিয়েছিল—এ মানুষ বাঁচবে,কারণ তাঁর শ্বাসে আছেআমাদের সাহসের জ্যোতি।ছয় মাস—দেশে বিদেশে,হাসপাতালের বিছানায় লড়াই,কিন্তু বুলেট পারেনি তাঁর চোখের আগুন নিভাতে।তিনি ফিরেছেন—বুকে ক্ষতের দাগ নিয়ে,আর হাতে ভবিষ্যতের স্বপ্ন তুলে দিয়ে।আজ মেননের বুক শুধু এক শরীরের গল্প নয়,এটা এক পতাকা—যেটা বলে, “বুলেট আমাকে থামাতে পারবে না।”যেটা বলে, “ভয়কে আমরা বন্দী করব,সাহসকে আমরা মুক্ত করব।”তাঁর বুকের ক্ষত আজ আমাদের শপথের প্রতীক—যেখানে প্রতিটি দাগ মানে নতুন সংগ্রাম,প্রতিটি শ্বাস মানে বৈষম্য মুক্তির নতুন ঘোষণা।তুমি যদি ভীত হও—তবে মেননের দিকে তাকাও।তুমি যদি দুর্বল হও—তবে মেননের কাছ থেকে শক্তি নাও।কারণ তিনি বেঁচে আছেন—আমাদের সাহসের রক্ত হয়ে।”—(“মেনন এখনো–আমাদের সাহসের পতাকা” —সৈয়দ আমিরুজ্জামান)১৭ আগস্ট বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি জননেতা কমরেড রাশেদ খান মেননকে হত্যাচেষ্টার ৩৪ পূর্ণ হলেও আততায়ীরা অধরাই রয়ে গেছে। অথচ বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এবং সামাজিক ন্যায্যতা-সমতা প্রতিষ্ঠাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জনগণতান্ত্রিক আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রয়োজনেই এর একটা ফয়সালা হওয়া জরুরী।বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি এ দিনটিকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী দিবস’ পালন হিসেবে পালন করে আসছে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় ও মৌলভীবাজারসহ সারাদেশে জেলা-উপজেলা শাখার উদ্যোগে আলোচনাসহ সভা-সমাবেশ করা হতো।বিএনপি’র শাসনামলে ১৯৯২-এর ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় পার্টি অফিসের সামনে কমরেড রাশেদ খান মেননকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়। মৃতবৎ কমরেড মেননকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর সিএমএইচ-এ লিভারে অপারেশন করা হয় এবং অবস্থার উন্নতি না হলে তাকে লন্ডনের কিংস কলেজ হাসপাতালে পুনরায় অপারেশন করা হয়। পাঁচমাস লন্ডন ও ব্যাংককে চিকিৎসা নেবার পর ১৯৯৩ এর ১০ জানুয়ারী বিমান বন্দরে বিপুল সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তবে এই ৩৪ বছরেও তার ঐ হত্যাচেষ্টার বিচার হয়নি। আততায়ীরা অধরাই রয়ে গেছে। অন্যদিকে একই সময়কালে চুয়াডাঙার কুলবিলা গুচ্ছগ্রাম, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃবৃন্দকে হত্যা করা হয় যার বিচার আজও হয়নি।রাশেদ খান মেননের হত্যাচেষ্টার বিরুদ্ধে ওই সময়ে দেশব্যাপী যে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল তার জন্য পার্টি ও তিনি নিজে দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু দেশে সন্ত্রাস নির্মুল হয় নাই পক্ষান্তরে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড চলছে।জননিরাপত্তার স্বার্থেই এটা বন্ধ হওয়া দরকার।পার্টির তরফ থেকে এই হত্যাচেষ্টার পিছনে সেই সময় মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হাত রয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করা হলেও পুলিশ একটি দায়সারা তদন্ত করে কতিপয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার্জশীট দাখিল করে। পরে পার্টির তরফ থেকে পুনঃতদন্তের দাবির প্রেক্ষিতে অধিকতর তদন্তের পদক্ষেপ নেয়া হলেও কোন কাজ হয়নি। পুলিশের দায়েরকৃত ওই মামলা বিচারের জন্য উঠলেও তার পরিণতি নেয়ার কোন সম্ভাবনা নাই।রাশেদ খান মেননের হত্যাচেষ্টায় সারাদেশে সৃষ্ট তীব্র প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভের মুখে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিএনপি সরকার রাশেদ খান মেননের চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়ার কথা প্রচার করলেও পরিবার ও পার্টি সহকর্মীদের উদ্যোগেই তার চিকিৎসা হয় এবং এ কারণে হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে তাকে তার বাড়ি বিক্রি করতে হয়।২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিএনপি-জামায়াত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় প্রকাশ্যে গ্রেনেড ও গুলি ছুড়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা, পরের বছর, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে একযোগে বোমা হামলা ও ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডেও ১৫ আগস্টের আদর্শিক কুশীলবরা জড়িত।আবার ১৫ ও ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলির সম্পৃক্ততার বিষয়টি দলিল-দস্তাবেজসহ প্রমাণ করার জন্য তদন্ত কমিশন গঠন করা জরুরী। গোয়েন্দা অনুসন্ধান এবং একাডেমিক গবেষণার মাধ্যমেও বিষয়টি বেরিয়ে আসতে পারে। ঘটনা গুলোর পরের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে অবস্থাগত ও ধারণাগতভাবে এটি আন্দাজ করা যায় যে, এসব ঘটনায় জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষা একই সমান্তরালে অবস্থান করছিল। একই কুশিলবরা ১৯৯২ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি জননেতা কমরেড রাশেদ খান মেননকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়েছিল। এ হত্যাচেষ্টার আমরা বিচারে চাই। এখনো দেশি বিদেশি চক্রান্ত চলছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অর্জিত বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দর্শন ও ধারাকে নস্যাৎ করার জন্য। জন্যগণের সামগ্রিক প্রয়োজনেই এ ধারা রক্ষায় পার্টির নেতৃত্বে পরিবর্তন অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক বৈষম্যহীন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জোরদার করতে হবে।উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালের এই দিনে সন্ধ্যায় পার্টি কার্যালয়ের সামনে রাশেদ খান মেননকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলী করা হয়েছিল। দেশে- বিদেশে চিকিৎসা ও দেশবাসীর ভালবাসা আর দোয়ায় তিনি জীবন ফিরে পান এবং মানুষের পাশে থেকে রাজনীতি করেছেন।১৯৯৩ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মৃত্যুঞ্জয়ী জননেতা রাশেদ খান মেনন তাঁর প্রিয় স্বদেশভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন। জনগণের মেনন ফিরে আসেন জনগণের মাঝে। বিমান থেকে নেমে সরাসরি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিশাল গণসংবর্ধনায় যোগ দেন এবং মেহনতি মানুষের অতলস্পর্শী ভালোবাসায় সংবর্ধিত হোন।রাশেদ খান মেনন বাংলাদেশের বাম প্রগতিশীল রাজনীতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাঁর রাজনীতি গ্রামবাংলার কোটি কোটি গরিব খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের মুক্তির রাজনীতি – শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ার রাজনীতি।শোষণ বঞ্চনা বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার, জনগণের সামগ্রিক মুক্তির জন্য নিবেদিত প্রাণ রাজনীতির এক বাতিঘর কমরেড রাশেদ খান মেনন। তাঁর পিতা বিচারপতি আব্দুল জব্বার খানের কর্মস্থল ফরিদপুরে ১৯৪৩ সনের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতৃভূমি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ থানার বাহেরচর-ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামে।ষাটের দশকের তুখোর ছাত্রনেতা রাশেদ খান মেনন বাষট্টির আয়ুববিরোধী সামরিক শাসন ও শিক্ষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে আসেন। তারপর নিরন্তর দুর্গম কণ্টকাকীর্ণ পথ চলা। যে পথ চলায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি কোনো শক্তি। মেনন মৃত্যুকে কখনো ভয় করেননি আজও করেন না। ১৯৬৩-৬৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর সহ-সভাপতি (ভিপি) ও ‘৬৪-৬৭ সালে পূর্বপাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। বাষট্টি সালে নিরাপত্তা আইনে প্রথম কারাবন্দী হওয়ার পর ‘৬৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন মেয়াদে নিরাপত্তা আইন, দেশরক্ষা আইন ও বিভিন্ন মামলায় কারাবরণ করেন। ‘৬৪-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে ছাত্র সমাজের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কুখ্যাত মোনেম খানের আগমনকে বিরোধীতা করতে গিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন ও পরে সুপ্রীম কোর্টের রায়ে ঐ বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হলে জেল থেকে এম.এ পরীক্ষা দেন। ‘৬৭-৬৯ জেলে থাকাকালীন অবস্থায় তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি ক্যান্টনমেন্টে নীত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দেশের বাইরে তার যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে কাজ করেন।ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন কৃষক সমিতিতে যোগ দেন ও সন্তোষে ঐতিহাসিক কৃষক সম্মেলনের সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন।১৯৭০-এর বাইশে ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানের জনসভায় ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ কায়েমের দাবি করায় এহিয়ার সামরিক সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ও তার অনুপস্থিতিতে সামরিক আদালতে সাত বছর সশ্রম কারাবাস ও সম্পত্তির ষাট ভাগ বাজেয়াপ্তের দণ্ডাদেশ প্রদান করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আত্মগোপনে যান ও স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র প্রস্তুতি গ্রহণের কাজ শুরু করেন।পচিশে মার্চ পল্টনের শেষ জনসভায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।পচিশে মার্চের কালরাতের গণহত্যার পর তিনি আর এক মুহূর্ত দেরী না করে ঢাকার অদূরে নরসিংদীর শিবপুরকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজ শুরু করেন এবং পরে ভারতে গিয়ে সকল বামপন্থী সংগঠনকে নিয়ে ‘জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ সমন্বয় কমিটি’ গঠন করে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে প্রবাসী সরকারের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরে এবং দেশের অভ্যন্তরে কেন্দ্র স্থাপন করে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।১৯৭৪-এ ভাসানী ন্যাপ থেকে বেরিয়ে এসে ইউনাইটেড পিপলস পার্টি (ইউপিপি) গঠিত হলে তার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৭৮-এ ইউপিপি সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে যোগ দিলে রাশেদ খান মেনন ইউপিপি ত্যাগ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গঠন করেন এবং ১৯৭৯ সনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।১৯৮২ জেনারেল এরশাদ সামরিক শাসন জারি করলে রাশেদ খান মেনন সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ঐ সামরিক শাসনবিরোধী প্রথম বিবৃতিটি যা পরবর্তীকালে পনের দল গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে তার রচয়িতাও ছিলেন তিনি। ‘৮৩-এর মধ্য ফেব্রুয়ারির ছাত্র আন্দোলনের কারণে তাকে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের সাথে চোখ বেঁধে সামরিক ছাউনির নির্জন সেলে আটক রাখা হয়।পাঁচদল নেতা হিসেবে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ঐক্য পুনঃস্থাপনে রাশেদ খান মেনন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং পাঁচদল, সাত দল ও আট দলের ঐতিহাসিক তিন জোটে’র ঘোষণার ভিত্তিতে ‘৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাহীর পতন হয়। ১৯৯১-এর পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাশেদ খান মেনন পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের জন্য সংসদের ‘বিশেষ কমিটি’তে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সংসদে তিনি জামাত-শিবিরের মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক তৎপরতা, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে সশস্ত্র আক্রমণ, সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী তৎপরতা, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর কাছে সরকারের নতজানু নীতি, কাঠামোগত সংস্কার, বিশেষ করে পাটকলের কাঠামোগত সংস্কারের নামে পাট শিল্পের ধ্বংস সাধন, মুক্ত বাজার অর্থনীতির নামে লুটপাটের অর্থনীতিক নীতি অনুসরণের এবং দৃঢ় বিরোধীতা, কৃষক, খেতমজুর ও শ্রমজীবী মানুষের স্বপক্ষে দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ করেন। সংসদের বাইরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলন সংগঠিত করতেও তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন।এই সব মিলিয়ে রাশেদ খান মেনন সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী গোষ্ঠীর আক্রমণের টার্গেটে পরিণত হন এবং তার বিরুদ্ধে জামাত-শিবিরসহ ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোর পক্ষ থেকে আক্রমণাত্মক প্রচারণা শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯২-এর ১৭ আগস্ট নিজ পার্টি কার্যালয়ের সামনে গুলিবিদ্ধ করে তাকে হত্যার চেষ্টা হয়। প্রথমে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল ও পরে লন্ডনে কিংস কলেজে দু’বার অস্ত্রোপচার হলে তিনি জীবনে বেঁচে যান।রাশেদ খান মেনন গুলিবিদ্ধ হলে সারা দেশে যে অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয় তার মধ্য দিয়ে তার প্রতি দেশবাসীর ভালবাসার বিশেষ প্রকাশ ঘটে। দেশবাসীর দেয়া রক্ত, দোয়া, আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছার বরকতে তিনি সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। এই সময় তিনি ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জাতীয় সংগ্রামেও বিশেষ ভূমিকা রাখেন।১৯৯৮ সালে বিকল্প গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগার দল গঠন করে বিভিন্ন জাতীয় ও অর্থনৈতিক, শ্রমজীবী মানুষের ইস্যুতে তিনি আন্দোলন গড়ে তোলেন। এর মধ্যে তেল-গ্যাস-বন্দর জাতীয় সম্পদ রক্ষার জন্য জাতীয় কমিটি গঠন, গ্যাস বিদেশে রপ্তানি ও চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার বিরুদ্ধে ঐ জাতীয় কমিটির উদ্যোগে দেশব্যাপী লং মার্চ সংগঠিত করে গ্যাস রপ্তানি প্রতিরোধ করেন।২০০১ সালে বিএনপি-জামাত চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে, এ সময় দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব শুরু হলে তিনি তার বিরুদ্ধে অন্যান্যদের নিয়ে প্রতিরোধ সংগঠিত করেন। জোট সরকারের সময়ে যে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে তার বিরুদ্ধেও প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে ওয়ার্কার্স পার্টি। দু:শাসন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক নীতির বিরুদ্ধে প্রথমে এগার দল ও পরে আওয়ামী লীগ, জাসদ, ন্যাপসহ চৌদ্দ দলের আন্দোলন গড়ে ওঠে। চৌদ্দ দলের ৩১ দফা নির্বাচনী সংস্কার ও ২৩ দফা ন্যূনতম কর্মসূচি প্রণয়নে তিনি মুখ্য ভূমিকা রাখেন। ২০০৫ সালের ১৫ জুলাই শেখ হাসিনা ওই নির্বাচনী সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরলে তা জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৮ নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এই সংসদের তিনি কার্যউপদেষ্টা কমিটির সদস্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি। এ ছাড়া সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিরও তিনি সদস্য।তিনি এ বছর গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়ার বিদেশীদের দেয়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদকে ভূষিত হয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার সুপ্রীম পিপলস এসেম্বলীয় সিদ্ধান্ত অনুসারে তাঁকে এই পদকে ভূষিত করেন। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম ইল সুং-এর জন্মশতবর্ষ পালনের জন্য অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক উৎসবের শেষ দিনে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে উত্তর কোরিয়ার সুপ্রীম পিপলস এসেম্বলীর ভাইস-প্রেসিডেন্ট উ সুংহুক তাকে এই পদক গলায় ঝুলিয়ে দেন।রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও গবেষণার কাজ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা, বিশেষ করে জাতীয় দৈনিকসমূহে তার নিয়মিত কলাম লিখেছেন। তার ঐ কলামসমূহ একত্রিত করে এ পর্যন্ত পাঁচটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও বাতিঘর থেকে প্রকাশিত হয়েছে কমরেড রাশেদ খান মেননের আত্মজীবনীর প্রথম পর্ব ‘এক জীবন : স্বাধীনতার সূর্যোদয়’।ব্যক্তি জীবনে রাশেদ খান মেনন ১৯৬৯-এর মে মাসে তার ছাত্র আন্দোলনের সহকর্মী লুৎফুন্নেছা খান বিউটিকে বিয়ে করেন। লুৎফুন্নেছা খান বিউটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর পপুলেশন রিসার্চ এন্ড ট্রেনিং এর সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর হিসেবে অবসর নিয়েছেন। কন্যা ড. সুবর্ণা খান ক্যান্সার সেলের ওপর পিএইচডি করে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত। পুত্র আনিক রাশেদ খান আইনের ছাত্র।রাশেদ খান মেনন রাজনৈতিক বিভিন্ন সভা, সম্মেলন ও সেমিনার উপলক্ষ্যে ভারত, নেপাল, গণচীন, কিউবা, উত্তর কোরিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, আলজেরিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপের জার্মানী, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, ফ্রান্স, বুলগেরিয়া ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন।রাশেদ খান মেনন ৬০-এর দশকের সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ. ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা রাখার জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশন ৮ অক্টোবর ২০০৮ সনের রাজধানীর মগবাজার চৌরাস্তা হতে বাংলামটর রোড পর্যন্ত এই সড়কের নাম রেখেছে “রাশেদ খান মেনন সড়ক”।২০১২ সনের ১৩ সেপ্টেম্বর মহাজোট সরকারের পক্ষ থেকে রাশেদ খান মেননকে মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব দেয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীতে অবশ্য দেশের কী পরিস্থিতিতে সরকারে যোগ দিয়েছিলেন, তা সকলেই অবগত। দেশের সংকটজনক পরিস্থিতিতে প্রগতিশীল রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেয়ার বৃহত্তর স্বার্থে নির্বাচনকালীন সরকারে ২০১৩ সালে তাকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে পুনরায় সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন এবং মহাজোট সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এছাড়াও তিনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।রাশেদ খান মেনন রাজনীতিক হিসেবে সর্বজনপরিচিত। লেখালেখির জন্যও তিনি বিশেষ পরিচিতি পেয়েছিলেন। ছাত্রআন্দোলনের প্রচারপত্র, বিবৃতি আর বিভিন্ন সংকলন প্রকাশের মধ্য দিয়ে এই লেখার শুরু। রাজনীতির প্রয়োজনেই বিভিন্ন বিষয়ে লিখেছেন তিনি। জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিকগুলোতেও নিয়মিত লিখেছেন।এবার আসি, ভিন্ন একটা প্রসঙ্গে। দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কমরেড রাশেদ খান মেনন ভাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমাদের ধারণা, পরিকল্পিত এক ব্লেম গেইমের অংশ হিসেবে কমরেড মেনন ভাইকে গ্রেপ্তারের পর দুর্নীতি নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তথ্য প্রমাণ উল্লেখ না করেই এ ধরনের মানহানিকর প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলো। আর তাইতো সিনিয়র সাংবাদিক পুলক ঘটক লিখেছেন, রাশেদ খান মেননকে গ্রেপ্তার করার কয়েকদিন পর একটি নিউজ ছাড়া হয়। “মেননের ২৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ”! গত ১৭ অক্টোবর অধিকাংশ মিডিয়ায় এটি ছিল লিড নিউজ। সংবাদ প্রকাশের পর বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে আমাদের সৎ, মেধাবী ও দলদরদমুক্ত সাংবাদিক বন্ধুরা ফেসবুকে এটি সশব্দে পোস্ট করতে থাকেন। বিএনপি ও বামৈসলামিক যৌথ বিপ্লবীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সংবাদটির আরও কয়েকগুণ প্রসার ঘটান। পিছিয়ে ছিলেন না নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরাও। সবাই সৎ ও দেশপ্রেমিক।একজন মানুষের পক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুকিয়ে রাখতে পারা বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য। এই সংবাদ কোনো মিডিয়া আগে প্রকাশ করল না?আমি বেশ কয়েকজন সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করেছি, বর্তমান সরকারের লোকেরা বলার আগে মেননের গোপন টাকশালের কথা কেউ প্রকাশ করেননি কেন? “আমার কুড়ে ঘরের ছাদে একটি হাতি উঠেছে”-এ কথা কেউ বললেই তা যাচাই না করে সংবাদ প্রকাশ করা যায় কিনা?২৫-এর পরে কয়টা শূণ্য দিলে ২৫ হাজার কোটি টাকা হয় গবেষণা করেছি। ক্যালকুলেটরে হিসাব করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছি। হিসাবে দেখা গেল, এই সম্পদ বাংলাদেশের মোট বাজেটের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। বসুন্ধরা গ্রুপের মোট সম্পদের পরিমাণ ১৫০০ কোটি টাকা (গ্রুপের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য)। অর্থাৎ প্রায় ১৭টি বসুন্ধরা গ্রুপের সম্পদ একত্রে মিলালে মেননের সমান হবে। লোকটা যদি ঘুষ গ্রহণের দোকান খুলে বিরতিহীনভাবে প্রতিদিন ১ কোটি টাকা ঘুষ নেয় তবুও এই টাকা জমাতে ২৫ হাজার দিন (প্রায় ৬৯ বছর) সময় লাগবে।মেননের ঘরের গোপন কক্ষে বিশাল হিমালয় পর্বতমালা ঢেকে রাখার সংবাদটি জোরেসোরে প্রচার হয়েছে এবং হচ্ছে। যেমন প্রচার হয়েছে বাংলাদেশে ২৬ লাখ ভারতীয় চাকরি করে। প্রচার করতে তো বিবেক বা সততা লাগে না! পাঠকের মনে প্রশ্নও তৈরি হয় না!!! আমার মামার বাড়ির খেজুর গাছে গতকাল যে হাতিটি উঠেছিল সে সংবাদ কোনো মিডিয়া প্রচার করল না, কোনো সৎ বুদ্ধিজীবী তা ফেসবুকে শেয়ার দিল না- এটাই আপসোস!”হয়তো এসব কারণেই বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় মিডিয়া বিভাগের আহ্বায়ক কমরেড মোস্তফা আলমগীর রতন স্বাক্ষরিত ও প্রেরিত পলিটব্যুরোর বিবৃতিতে বলা হয়, কমরেড মেননের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ৫৮টি হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। যে গুলো সবই মিথ্যা। বর্তমান সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে পথ বেছে নিয়েছে তা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। জননেতা কমরেড রাশেদ খান মেনন এদেশের দেশপ্রেমিক সন্তান, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সামরিক শাসন বিরোধী লড়াইসহ দেশের সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রথম সারির একজন প্রবীণ সংগ্রামী জননেতা, ৬বারের নিবাচিত এমপি ও মন্ত্রি ছিলেন। রাজনীতির নীতিবোধে একজন কিংবদন্তি বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন বিপ্লবী মানুষ।ওয়ার্কার্স পার্টি সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেছে, ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করতে বুঝা জরুরি; সকল অন্যায়কে ন্যায় বলে রাষ্ট্রশক্তির অপব্যবহার করা উচিত হবে না, রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবিলা করুন, সেটিই হবে উত্তম পন্থা। এ পন্থা পরিহার না করলে ইতিহাসই আপনাদের ভবিষ্যত রাস্তা নির্দেশ করবে। অবিলম্বে কমরেড রাশেদ খান মেননকে মুক্তি দিতে হবে।মহান ও কীর্তিমান মানুষদের নিয়ে সব সময়ই লেখা যায় আমরা এটা বিশ্বাস করি। পরিশেষে, সমাজতন্ত্র অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সমতা-ন্যায্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনেই বিশ্বজনীন মহান এই গুণীর রাজনীতি, জীবন সংগ্রাম, কীর্তি, ইতিহাস, তত্ত্ব ও অনুশীলন সম্পর্কে পাঠ প্রাসঙ্গিক ও জরুরী।জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে রাষ্ট্র ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে ২১ দফার ভিত্তিতে সামাজিক ন্যায্যতা-সমতা প্রতিষ্ঠাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জনগণতান্ত্রিক আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও জনগণের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে গেছেন এই অবিসংবাদিত নেতা। হত্যাচেষ্টার ৩৪তম বার্ষিকীতে মৃত্যুঞ্জয়ী জননেতা কমরেড রাশেদ খান মেননের মুক্তি চাই এবং কমরেড মেননের প্রতি অভিবাদন এবং রেড স্যালুট।সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

মেননকে হত্যাচেষ্টার ৩৪ বছর : বিচার অধরাই রয়ে গেছে!

অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু লাল সালাম!

সৈয়দ আমিরুজ্জামানবৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের কিংবদন্তি ও অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু লাল সালাম!তিনি ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোর বেলায় বৃটিশদের হাত থেকে জন্মভূমিকে মুক্ত করার জন্য নির্ভয়ে দৃঢ় পায়ে হাসতে হাসতে পরেছিলেন ফাঁসির দড়ি। কোন কোন চরিত্র জীবনভর মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে | ক্ষুদিরাম সেরকম একটি চরিত্র |ফাঁসির সময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ১৮ বৎসর ৭ মাস ১১ দিন। ফাঁসির দড়ি পরানোর সময় ক্ষুদিরাম হাসতে হাসতে জানতে চান জল্লাদের কাছে, ‘আচ্ছা তোমরা ফাঁসির দড়িতে মোম দাও কেন?’ এই হচ্ছেন ক্ষুদিরাম।অঞ্জলি লও হে বিপ্লবী | ক্ষুদিরামরা বাংলার বুকে বার বার জন্ম নেন , শিখিয়ে দেন কিভাবে দেশ ও মানুষকে ভালবাসতে হয়-গাইতে হয় মরণ জয়ের গান।ক্ষুদিরাম বসুকে নিয়ে কবি আল মাহমুদ লিখেছিলেন, ‘চিনতে নাকি সোনার ছেলে ক্ষুদিরামকে চিনতে? রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিল যে মুক্ত বাতাস কিনতে।’প্রায় দুইশ বছর শাসন করা ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্তি পেতে আন্দোলন সংগ্রামে যারা অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছেন, যারা অস্ত্র হাতে অত্যাচারী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন সেই তালিকার শুরুর দিকে রয়েছে তাঁর নাম।কিশোর ক্ষুদিরাম বসু’র স্বপ্ন ছিলো স্বদেশকে মুক্ত করা। এর নির্মম পরিণতির কথা তাঁর অজানা ছিলো না। তারপরও দুঃখ, কষ্ট, বিপদ এবং মৃত্যুর কথা জেনেও তিনি দেশকে মুক্ত করতে পিছপা হননি। মুক্ত হাওয়া, মুক্ত পরিবেশ এবং বাধাহীন শৈশবে বেড়ে ওঠার সঙ্গে আত্মপরিচয়ে বাঁচতে শেখার নাম স্বাধীনতা।বাংলার ইতিহাসে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পর থেকে বাংলার স্বাধীনতা ব্রিটিশের হাতে চলে যায়। সেখান থেকে স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে প্রাণ দিয়েছেন বহু দেশপ্রেমিক।ক্ষুদিরামের ফাঁসির পর ১৯০৮ সালের ১২ আগস্ট অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সেই সময়ের বর্ণনায় জানা যায়:‘মুজাফফরপুর, ১১ আগস্ট অদ্য ভোর ছয় ঘটিকার সময় ক্ষুদিরামের ফাঁসি হইয়া গিয়াছে। ক্ষুদিরাম দৃঢ় পদক্ষেপে প্রফুল্ল চিত্তে ফাঁসির মঞ্চের দিকে অগ্রসর হয়। এমন কি তাহার মাথার ওপর যখন টুপি টানিয়া দেওয়া হইল, তখনও সে হাসিতে ছিল। স্বদেশের জন্য মৃত্যুকে কিভাবে হাসিমুখে বরণ করতে হয় তা শিখেছিলেন ক্ষুদিরাম বসু।আঠারো বছর বয়স যে কি সাহসী হয় তারও প্রমাণ ক্ষুদিরামের দৃঢ় মনোবল। তার স্মরণে রচিত বিখ্যাত গান, একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি- আজ মানুষের অন্তরে প্রবাহিত।বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও তাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। ক্ষুদিরাম আজও আছে এই বাংলায়। প্রতিটি সাহসী দেশপ্রেমিক কিশোরই আজ একজন ক্ষুদিরাম।ক্ষুদিরাম বসুর জন্ম ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর মেদেনীপুর জেলার হাবিবপুর গ্রামে। পিতা ত্রৈলক্যনাথ বসু এবং মাতা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। ক্ষুদিরাম নামকরণের পেছনেও রয়েছে ছোট্ট ইতিহাস। তিনকন্যা সন্তান জন্মের পর তিনি ছিলেন চতুর্থ সন্তান। তার আগেই দুই পুত্র জন্মের পর মারা গিয়েছিল বলে জন্মের পরই তিন মুঠ ক্ষুদের বিনিময়ে তাকে তার দিদির কাছে দেন। এর থেকে তার নাম হয় ক্ষুদিরাম। ১৮৯৫ সালে তার মা-বাবা মৃত্যুবরণ করলে তার বড় বোন অপরূপা তাকে প্রতিপালনের দায়িত্ব নেন। তার ভেতরে স্বদেশের চেতনা জন্ম নিতে সময় নেয়নি। ১৯০৬ সালের মার্চ মাসে মেদেনীপুরের এক কৃষি ও শিল্পমেলায় বিপ্লবী পত্রিকা ’সোনার বাংলা’ বিলি করার সময় ক্ষুদিরাম প্রথম পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর থেকে ক্ষুদিরাম বসু ক্রমেই ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন কাজে অংশ নেন। স্বদেশি আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার জন্য তার জামাইবাবুর সরকারি চাকরিতে অসুবিধা হলে তাকে আশ্রয় দেন মেদেনীপুরের উকিল সৈয়দ আব্দুল ওয়েজেদের বোন। এ সময় কিংসফোর্ড নামটি ছিল বাঙালিদের কাছে ঘৃণার।বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের কঠোর সাজা ও দমননীতির কারণে, কলকাতার প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। ক্ষুদিরাম জীবন বাজি রেখে ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিহারে ইউরোপিয়ান ক্লাবের সামনে বোমা ছুড়ে হত্যা করতে গিয়েছিলেন কিংসফোর্ডকে। তার সঙ্গে ছিলেন বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না। যে গাড়িটিতে তাদের থাকার কথা ছিল তারা ছিলেন না সেদিন। তার বদলে মারা যায় দুই ইংরেজ মহিলা। দুই বিপ্লবী নিজের রাস্তায় পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গী বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী ধরা পড়ে নিজের কাছে থাকা রিভলবার দিয়ে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়েন ক্ষুদিরাম বসু। বিচারে তার ফাঁসির রায় দেন বিচারক মি. কর্নডফ। তিনি ক্ষুদিরামকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- ফাঁসিতে যে মরতে হবে সেটা বুঝেছো? জবাবে ক্ষুদিরাম বলেছিলেন, বুঝেছি। তার মুখের অবিচলিত হাসি হাসি ভাব দেখেই বিচারক প্রশ্নটি করেছিলেন।এ প্রসঙ্গে ‘সঞ্জিবনী’তে লেখা হয়, ‘মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞার পর ক্ষুদিরামকে সম্পূর্ণ অবিচলিত দেখিয়া এবং তাহার নির্বিকার ভাব লক্ষ্য করিয়া বিদেশী রাজার স্বজাতীয় বিচারকের মনে সম্ভবতঃ এইরূপ ধারণা জন্মিয়াছিল যে, আসামীর প্রতি যে চরমদণ্ড প্রদত্ত হইয়াছে তাহা সে বুঝিতে পারে নাই। এই ধারণাতে বিচারক ক্ষুদিরামকে উক্ত প্রশ্নটি করেছিলেন। মৃত্যুকে যে জীবনের সাথে মিলিয়ে নিয়েছে তার কাছে মৃত্যু আর জীবনের মাঝে কোনো বিভেদ নেই সেকথা তখন বিচারকও বুঝতে অক্ষম ছিল।’মৃত্যু যে কত সহজে বরণ করে নেওয়া যায় তা শিখিয়ে গেছে ক্ষুদিরাম। ফাঁসির আগে শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হয়। ক্ষুদিরামের কাছেও জানতে চাওয়া হয়েছিল। জবাবে ক্ষুদিরাম বলেছিল, তিনি বোমা বানাতে জানেন। ব্রিটিশদের অনুমতি পেলে তিনি তার বোমা বানানোর বিদ্যা ভারতবাসীকে শিখিয়ে যেতে চান। কি অসীম সাহস থাকলে মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়েও দেশের কথা ভাবা যায়, মানুষের মুক্তির কথা চিন্তা করা যায় তার উদাহরণ ক্ষুদিরাম বসু।"ক্ষুদিরাম, তোমায় সালাম"অগ্নিযুগের রক্তভেজা পথে যে কিশোর যায়,হাসিমুখে মৃত্যুর কাছে জীবনের গান গায়;শিকল ভাঙার স্বপ্ন বুকে, মুক্ত আকাশ চায়—সে তো ক্ষুদিরাম, আজও বাংলার হৃদয় গায়।মেদিনীপুরের মাটির ঘরে জন্মেছিল ছেলে,দুঃখ-কাঁটার দিন পেরিয়ে উঠল আগুন জ্বেলে;স্বদেশ তখন শৃঙ্খলিত, পরাধীনতার জালে,কিশোর বুকে বজ্র উঠল অন্যায়েরই কালে।দুটি চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল আঁকা,মায়ের মুখে দেশের মাটি—সেই তো ছিল মাখা;জীবন তার ক্ষুদ্র হলেও স্বপ্ন ছিল বড়,দেশের তরে মৃত্যুকেও করল সে আপন করে।বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে জেগেছিল যে দেশ,স্বদেশি সেই অগ্নিমন্ত্রে জ্বলল অবশেষ;কাগজ হাতে, পথে পথে সে বিলিয়েছে বাণী,ব্রিটিশ শাসন কাঁপিয়ে দিল কিশোরেরই প্রাণী।কিংসফোর্ডের অত্যাচারে ক্ষুব্ধ ছিল প্রাণ,বিচার নামে নিপীড়নের বাড়ছিল অপমান;প্রফুল্ল চাকী পাশে ছিল, দুজন অগ্নিশপথে,জীবন রেখে এগিয়ে গেল মৃত্যুরই রথে।মুজাফফরপুরের অন্ধ রাতে বজ্রের মতো ক্ষণ,বোমার শব্দ কাঁপিয়ে দিল ঔপনিবেশিক মন;লক্ষ্যভ্রষ্ট সেই বিস্ফোরণে ঘটল মর্মান্তিক ক্ষয়,তবু ইতিহাস লিখে রাখল তাদের অমর জয়।প্রফুল্ল গেল আত্মবলিদানে, বন্দি হলো ক্ষুদিরাম,বিচারক দিল মৃত্যুদণ্ড—নিভল না তার প্রাণ;“ফাঁসির দড়ি বুঝেছ?”—প্রশ্ন, শান্ত কিশোর হাসে,মৃত্যু যেন তুচ্ছ তার কাছে স্বাধীনতার আশে।এগারো আগস্ট ভোরের বেলা উঠল শেষ প্রহর,ফাঁসির মঞ্চে কিশোর গেল দৃপ্ত পায়ে নির্ভর;মাথার উপর মৃত্যুর টুপি, চোখে অমলিন হাসি,বাংলার মাটি দেখল সেদিন মৃত্যুঞ্জয়ী আসি।মাত্র আঠারো বছর বয়স—কতটুকু সে কাল!তবু তারই বুকের ভিতর জ্বলল সূর্যজাল;যে বয়সে হয় খেলাঘর আর স্বপ্ন বোনার দিন,সে বয়সেই মৃত্যুর সাথে করল আলিঙ্গন।শেষ ইচ্ছাতেও নিজের কথা ভাবেনি সে আর,বোমা বানানোর বিদ্যাটি দিতে চেয়েছে সবার;দেশের মানুষ শিখুক কেমন শিকল ভাঙার রণ—মৃত্যুকূপেও জেগে ছিল মুক্তিরই স্পন্দন।“একবার বিদায় দে মা”—কেঁদে ওঠে বাংলার গান,ক্ষুদিরামের রক্তে লেখা স্বাধীনতার মান;প্রতিটি সাহসী কিশোর যখন অন্যায়ের রুখে,ক্ষুদিরামের ছায়া যেন দাঁড়ায় তারই বুকে।স্বাধীনতা শুধু পতাকা নয়, শুধু বিজয়গান নয়,ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে হাসি—সেই তো সত্য জয়;বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার শপথ হোক আজ প্রাণে,মানুষ যেন মানুষ থাকে মানুষেরই সম্মানে।ধর্ম-বর্ণের বিভেদ মুছে, শোষণ-শৃঙ্খল ভেঙে,ন্যায়-সমতার সূর্য উঠুক বাংলার আকাশ রাঙিয়ে;যে স্বপ্ন নিয়ে প্রাণ দিয়েছিল অগ্নিযুগের ছেলে,সেই স্বপ্ন আজ বাঁচুক মানুষের অধিকারের মেলে।ক্ষুদিরাম, তোমার রক্ত বৃথা যেতে দেব না আর,অন্যায়ের কাছে নত হবে না বাংলার অধিকার;শোষিত মানুষের মুক্তির পথে জ্বলুক তোমার নাম,অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী—তোমায় লাল সালাম।ফাঁসির দড়ি ভয় দেখাতে পারেনি যে প্রাণ,আজও তারই সাহস জাগায় কোটি মানুষের গান;মৃত্যু পেরিয়ে বেঁচে আছো বাংলার প্রতিটি ধাম—স্বাধীনতার অমর সৈনিক, ক্ষুদিরাম—সালাম।—(ক্ষুদিরাম, তোমায় সালাম;—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)মহান ও কীর্তিমান মানুষদের নিয়ে সব সময়ই লেখা যায় আমরা এটা বিশ্বাস করি। পরিশেষে, সমাজতন্ত্র অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সমতা-ন্যায্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনেই অগ্নিযুগের মহান এই বিপ্লবীর রাজনীতি, জীবন সংগ্রাম, কীর্তি, ইতিহাস ও অনুশীলন সম্পর্কে পাঠ প্রাসঙ্গিক ও জরুরী। ১১৮তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু তোমায় সালাম! সৈয়দ আমিরুজ্জামানমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;বিশেষ প্রতিনিধি, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;সম্পাদক, আরপি নিউজ;কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।E-mail : syedzaman.62@gmail.comWhatsApp : 01716599589

অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু লাল সালাম!
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream