শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM
Topic Ads 1
কেন এত ঋণ যুক্তরাষ্ট্রের?

কেন এত ঋণ যুক্তরাষ্ট্রের?

যুক্তরাষ্ট্রের দিন দিন ঋণ বাড়ছে। জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন (৪০ লাখ কোটি) ডলার ছাড়িয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির জন্য এটি একটি নতুন মাইলফলক হলেও অর্থনীতিবিদেরা এটিকে সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছেন। তাদের আশঙ্কা, ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। এতে সরকারের আর্থিক চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের ঋণ নেওয়ার খরচেও।  যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় ছিল ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের কিছু কম। এক দশকের মধ্যে তা দ্বিগুণ হয়েছে। দেশটির ঋণ এখন প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯০ হাজার ডলার করে বাড়ছে। দিনে বাড়ছে প্রায় ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ১৯৮১ সালে প্রথমবার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তখন বিষয়টিকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হয়েছিল। অর্থনীতিবিদ মায়া ম্যাকগিনিস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বছরে এসে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই সেই সময়ের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছে দেশটি। কেন এত ঋণ যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বড় ব্যবধান রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে কর কমানোর ফলে সরকারের রাজস্ব কমেছে। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট ও কোভিড-১৯ মহামারির মতো সংকট মোকাবিলায়ও বিপুল পরিমাণ ঋণ করতে হয়েছে সরকারকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদের হার। সুদের হার বেশি থাকায় সরকারের পুরোনো ও নতুন ঋণের সুদ পরিশোধের খরচও বেড়েছে। অর্থনীতিবিদ এরিক সোয়ানসনের মতে, এক দশক আগের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতির বড় পার্থক্য হলো সুদের হার। যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর পেছনে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কার পাশাপাশি সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার বিষয়টিও ভূমিকা রাখছে। সুদ পরিশোধেই বড় চাপ সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এখন ১৫ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এল-ইরিয়ানের হিসাবে, সরকারের মোট কর আয়ের প্রায় ২০ শতাংশই এখন ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। এই ব্যয় প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয়ের চেয়েও বেশি। ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে নতুন ঋণ নিতে আরও বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। কারণ, বিনিয়োগকারীরা সরকারি বন্ড কিনে অর্থ ধার দেওয়ার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি মুনাফা চাইছেন। এর আরেকটি কারণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিপুল বিনিয়োগ। এসব কোম্পানিও বড় অঙ্কের অর্থ ধার করছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের অর্থের জন্য সরকার ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। এখনই সংকট নয়, তবে সতর্কসংকেত যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ দেশটির অর্থনীতির আকারের প্রায় ১২৬ শতাংশ। তবে জাপান ও ইতালির মতো কয়েকটি উন্নত দেশের তুলনায় এই অনুপাত এখনো কম। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং মার্কিন ডলার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হওয়ায় দেশটি অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি সময় ধরে বড় ঋণের বোঝা বহন করতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদেরা পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্বস্তিদায়কও মনে করছেন না। এল-ইরিয়ানের ভাষায়, এটি এখনো ‘লাল সংকেত’ নয়, বরং ‘হলুদ সংকেত’। অর্থাৎ পরিস্থিতি সংকটজনক পর্যায়ে না পৌঁছালেও সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, একপর্যায়ে বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ড থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। তখন বন্ড বিক্রি বাড়তে পারে এবং আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তবে ঠিক কোন পর্যায়ে গিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের ওপর সরকারের ঋণের বোঝা বাড়ার প্রভাব শুধু সরকারি হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উচ্চ সুদের হার অব্যাহত থাকলে বাড়ি কেনার ঋণ, গাড়ির ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও বাড়তে পারে। এতে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ বেশি পড়বে। এ ছাড়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বেশি সুদে ঋণ নিলে সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দাম বাড়ানোর মাধ্যমে ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। ফলে ঋণের বোঝার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও পড়তে পারে। সামনে কী করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছুটা ধীর হয়েছে। তবে এখনো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপ সামলানো তুলনামূলক সহজ হবে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট না হলে সরকারকে কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এর মধ্যে করব্যবস্থায় সংস্কার, সরকারি ব্যয় কমানো কিংবা কৃচ্ছ্রসাধনের মতো পদক্ষেপ থাকতে পারে। চরম পরিস্থিতিতে ঋণ পুনর্গঠনের বিষয়টিও সামনে আসতে পারে। সম্প্রতি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ সরকারি ঋণের কিছু বন্ড পুনরায় কিনে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। এতে সাময়িকভাবে বন্ডের চাহিদা বাড়ে এবং ঋণ নেওয়ার খরচ কমে। কিন্তু এক দিন পরই দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদ আবার বেড়ে যায়।

Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream