মিশিগানে ভোটের লড়াইয়ে ওবামা ও ট্রাম্প
মিশিগান অঙ্গরাজ্যে টানা দুই দিনে প্রচারে অংশ নিলেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রেসিডেন্ট। গত শনিবার ডেট্রয়েটে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে প্রচার চালান সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। পরদিন রোববার পোর্ট হুরনে রিপাবলিকানদের হয়ে ভোট চান বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনের শেষ সময়ে দুই নেতার এই প্রচার থেকেই বোঝা যায়, অঙ্গরাজ্যটি দুই দলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।ওবামা প্রচারে অংশ নেন ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ ও গভর্নর প্রার্থী জোসলিন বেনসনের পক্ষে। অন্যদিকে, ট্রাম্প রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সসহ দলের অন্য প্রার্থীদের জন্য ভোট চান। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারণে মিশিগানের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।ট্রাম্প ও ওবামার মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ দীর্ঘদিনের। এবারের প্রচারেও তাঁরা একে অপরকে আক্রমণ করেছেন। ট্রাম্প ওবামাকে ব্যর্থ ও অযোগ্য বলে সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল-সাইয়েদকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরেন।অন্যদিকে, ওবামা বলেন, কারও নাম ও ধর্মকে ব্যবহার করে তাঁকে কম দেশপ্রেমিক বা কম আমেরিকান হিসেবে তুলে ধরার কৌশল নতুন নয়। তাঁর বক্তব্যে নির্বাচনী প্রচারে পরিচয় ও ধর্মকে কেন্দ্র করে বিভাজন তৈরির রাজনীতির সমালোচনা উঠে আসে।
নিজের অভিজ্ঞতার দিকে ইঙ্গিত করে ওবামা বললেন, ‘এই সিনেমা আমরা আগেও দেখেছি। আমিও তাতে অভিনয় করেছি।’ তাঁর বক্তব্যের মর্মার্থ স্পষ্ট: একসময় তাঁর জন্মপরিচয় নিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল; এখন আল-সাইয়েদের নাম ও মুসলিম পরিচয়কে একইভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পোর্ট হুরনের সভায় ট্রাম্প সরাসরি আল-সাইয়েদের ধর্মীয় পরিচয়কে আক্রমণের লক্ষ্য করেন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাঁকে জিহাদি ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য হিসেবে অভিহিত করেন। আল-সাইয়েদ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। মিশিগানেই জন্ম নেওয়া এই প্রার্থীর তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলারও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যে ভয়ের আরেকটি উপাদান ছিল ক্রিসমাস। তিনি দাবি করেন, আল-সাইয়েদ ও ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রে জিহাদিদের ঢল নামবে এবং সহিংসতা ও সন্ত্রাসের ফলে পরিস্থিতি এমন হবে যে মানুষ ক্রিসমাসও উদ্যাপন করতে পারবে না। তাঁর কথায় ধর্মীয় পরিচয়কে নির্বাচনী আতঙ্কে পরিণত করার চেষ্টা কোনো রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ পেয়েছে।
অন্যদিকে ডেট্রয়েটে ওবামা সামনে আনলেন ভিন্ন এক ছবি। মিশিগানের বর্তমান সিনেটর এলিসা স্লটকিন ইহুদি। তাঁর পাশে আল-সাইয়েদের মতো একজন মুসলিম সিনেটর থাকলে অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধিত্বে একটি শক্তিশালী জুটি তৈরি হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একজন মুসলিম পুরুষ ও একজন ইহুদি নারী একই অঙ্গরাজ্যের মানুষের স্বার্থে কাজ করবেন—বিভক্তির রাজনীতির বিপরীতে এই সম্ভাবনাই তুলে ধরলেন ওবামা।
অর্থনীতি নিয়েও দুই নেতার বক্তব্য বিপরীতমুখী। ট্রাম্প তাঁর শুল্কনীতি ও প্রশাসনের সাফল্যের পক্ষে সাফাই গাইলেন। ওবামা সামনে আনলেন কীভাবে জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং আমদানি শুল্কের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্পের শাসনকালকে তিনি বর্ণনা করেন বিশৃঙ্খলা, নিষ্ঠুরতা ও দুর্নীতির সময় হিসেবে। তাঁর আহ্বান, এই নির্বাচনে ভোট দিয়ে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তনের দাবি জানাতে হবে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে হলে ডেমোক্র্যাটদের মিশিগানের আসনটি ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্স পুনর্নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। ফলে তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের এই প্রতিযোগিতায় দুই দলই সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে।
তবে ওবামার সমর্থন পেলেই আল-সাইয়েদের জয় নিশ্চিত হয়ে যায় না। ম্যারিস্টের ১৫-১৮ অক্টোবরের জরিপে সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে তাঁর সমর্থন ৫০ শতাংশ, রজার্সের ৪৮ শতাংশ। ২ শতাংশ পয়েন্টের এই ব্যবধান জরিপের ত্রুটিসীমার বা মার্জিন অব এররসের মধ্যে। অর্থাৎ লড়াই এখনো অনিশ্চিত; শেষ পর্যন্ত কার সমর্থকেরা বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে আসেন, সেটিই বড় প্রশ্ন।
এই লড়াইয়ের আরেকটি বড় উপাদান অর্থ। আল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে রিপাবলিকানপন্থী বাইরের সংগঠনগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। ইসরায়েলপন্থী লবিং সংগঠন আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি বা আইপ্যাকও আল-সাইয়েদের বিপক্ষে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। এর আগে বাছাই পর্বে তাঁকে ঠেকাতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৭ কোটি ডলার। তবে এই অর্থের লড়াইকে শুধু ‘ইহুদি লবি’র তৎপরতা বলা যথাযথ হবে না। ট্রাম্পের ‘মাগা’ আন্দোলনের অনেক বড় খেলোয়াড়ই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হাত খুলে অর্থ খরচ করছেন। এক ইলন মাস্কের পকেট থেকেই প্রায় ৪০ কোটি ডলার আসছে বলে নানা সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, যার একটা বড় অংশ ব্যয় হবে মিশিগান ও টেক্সাসে।
আল-সাইয়েদের পাশে আর্থিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়িয়েছেন প্রগতিশীল নেতারাও। কংগ্রেস সদস্য আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেস তাঁর সমর্থনে একটি যৌথ তহবিলে ১০ লাখ ডলার দিয়েছেন। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও নিজের নির্বাচনী তহবিল থেকে তাঁর সমর্থনে ১০ লাখ ডলার সহায়তা দিয়েছেন। এটি সভায় হাতে তুলে দেওয়া নগদ উপহার নয়; নির্বাচনী লড়াইয়ে সহায়তার জন্য তহবিলের অর্থ। আল-সাইয়েদ নিজেও তাঁর সমর্থকদের মাত্র এক ডলার করে চাঁদা দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
মিশিগানে ওবামার উপস্থিতির সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুফল অবশ্য অর্থ নয়, ভোটারদের উৎসাহ। দলের পরিচিত মুখ হিসেবে তিনি অনাগ্রহী সমর্থকদের, বিশেষত আফ্রিকান-আমেরিকানদের ভোটকেন্দ্রে টানতে এবং দলের ভেতরের দূরত্ব কমাতে সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু জনসভার উচ্ছ্বাস আর ব্যালট বাক্সের ভোট এক নয়। ওবামা মঞ্চে আলো ফেলেছেন; সেই আলো কত মানুষকে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে দেয়, উত্তর মিলবে ৩ নভেম্বর।