এক ম্যাচে ইতিহাস, পরের ম্যাচেই হতাশা
ঢাকার হলগুলোতে আংশিক রঙিন সিনেমার প্রচলন হওয়ার পর প্রথম অংশে সাদা-কালো, পরের অংশে রঙিন সিনেমা দেখে মুগ্ধ ছিলেন দর্শক। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সদ্য শেষ হওয়া দুই টেস্টের সিরিজটিও ছিল অনেকটা সে রকম। তবে এখানে রঙিন অংশ আগে, সাদা-কালো অংশ পরে। ডারউইনে দাপুটে ক্রিকেট খেলে ঐতিহাসিক জয় পান শান্তরা। সেই রোমাঞ্চ বিশ্বজুড়েই সমাদৃত ছিল। দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে না পারায় এমন সাফল্যের স্মৃতিই আজ ঝাপসা দেখাচ্ছে। দুই দিনে টেস্ট হারের বাজে অভিজ্ঞতা সিরিজের রঙিন অংশকে আড়াল করে দিয়েছে। সিরিজ শেষের সংবাদ সম্মেলনে নাজমুল হোসেন শান্তকে তাই কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। কিছু বিষয় মেনেও নেন অধিনায়ক। তিনি স্বীকার করেন, দ্বিতীয় টেস্টে মোটেও ভালো করতে পারেননি। দুই দিনে টেস্ট হারায় কিছুটা খারাপও লেগেছে তাঁর। যদিও তিনি মনে করিয়ে দেন, এক ম্যাচ আগেই বিশ্বসেরা দলকে হারিয়ে আলোড়ন তুলেছিলেন ক্রিকেটবিশ্বে।
বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, ‘কেউ ক্যাজুয়াল ছিল না। সবার ইচ্ছা ছিল ভালো করা। হতাশাজনক হলো আমরা ভালো ব্যাটিং করতে পারিনি। একটা জিনিস বুঝতে হবে ২৩ বছর পর এ রকম কন্ডিশনে খেলতে এসে বিশ্বসেরা বোলিংয়ের বিপক্ষে টেস্ট খেলা কঠিন। আমি অজুহাত দিচ্ছি না। যারা নিয়মিত খেলে, তারাও কলাপস করে। আমরা খারাপ খেলেছি, কারণ কন্ডিশন অনেক কঠিন ছিল। খেলোয়াড়রা চেষ্টা করেছে। শেষে যেটা বলব, অবশ্যই আমরা আরেকটু ভালো খেলতে পারতাম।’
ম্যাকাইয়ে পেস ও বাউন্সি উইকেটে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল স্বাগতিকরা। সিরিজ বাঁচাতে বিধ্বংসী হয়ে ওঠে। মিচেল স্টার্ক একা ১০ উইকেট নিয়েছেন সিরিজে! পেট কামিন্সও ছিলেন ধারাবাহিক। কঠিন উইকেটে এই বোলিং মোকাবিলা করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা কঠিন ছিল। শান্তর মতে, ‘আমি যখন ফিল্ডিং করছিলাম, স্লিপে তখন ভাবছিলাম আসলেই অনেক বড় দলকে হারিয়েছি আমরা। প্রথম ম্যাচ জেতার পর খুব উত্তেজনা কাজ করেনি। গত দুই দিনে আমার অনেক উপলব্ধি হয়েছে, অনেক ভালো ম্যাচ জিতেছি। অবশ্যই এটা গর্ব করার মতো। এ ধরনের অভিজ্ঞতা আমাদের অনেক কাজে দেবে। নিউজিল্যান্ডে এ রকম একটা অভিজ্ঞতা ছিল। আশা করি, দক্ষিণ আফ্রিকায় জিততে পারব। ইতিবাচক দিকগুলোই নিতে চাই। পাশাপাশি যে ভুলগুলো হয়েছে, সেখানে উন্নতি করতে চাই।’
এই ভালো দিকগুলোর মধ্যে বোলারদের প্রাপ্তি বেশি। হাসান মাহমুদ, মেহেদী হাসান মিরাজ প্রথম টেস্টে দারুণ করেছেন। অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিতীয় টেস্টে ২১০ রানে বেঁধে ফেলার কারিগর ছিলেন বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম। ব্যাটিংটা একটু ভালো হলে অসিদের চাপে ফেলার সুযোগ ছিল। দ্বিতীয় ইনিংসেও সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। এ ব্যাপারে অধিনায়ক শান্তর মত, ‘আমার মনে হয়, দ্বিতীয় ইনিংসে আরেকটু ভালো ব্যাটিং করতে পারতাম। তবে ওরাও ব্যাটিংয়ে অনেক সংগ্রাম করেছে। উইকেটটা অনেক কঠিন ছিল। হ্যাঁ, কিছু বাজে শট খেলেছি আমরা। আমি কারও ওপর আঙুল তুলতে চাই না। কারণ দল হিসেবে ভালো করতে পারিনি। আমি সেট হয়ে যে সময় আউট হয়েছি, তা গ্রহণযোগ্য নয়। আমার উচিত ছিল ইনিংস আরেকটু লম্বা করা। একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে, এ রকম কন্ডিশন, এ রকম বোলিংয়ের বিপক্ষে আমরা কখনও খেলিনি। কোনো ব্যাটারকে পয়েন্ট আউট করা আমার মনে হয় না ভালো হবে। এই অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতে কীভাবে ভালো করা যায়, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।’
পেস ও বাউন্সের নামে মানহীন উইকেটে খেলা হয়েছে বলে অভিযোগ। এক দিনে ১৮ উইকেট হারানোর ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি শান্তর দৃষ্টিতে আনা হলে তিনি বলেন, ‘যখন উপমহাদেশে খেলি, এক দিনে ১৮-১৯ উইকেট পড়লে অনেক কথা হয়। অথচ এখানে প্রথম দিন ১৮ উইকেট পড়ে। উইকেট খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল বলে ১৮ উইকেটে পড়েছে। আমাদের একার না, দুই দলের উইকেট পড়েছে। ওদেরও ব্যাটিং করতে সমস্যা হয়েছে।’
দুই দিনে টেস্ট ম্যাচ শেষ হওয়া নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে টাইগার অধিনায়ক রেকর্ড মনে করিয়ে দেন, ‘সত্যি বলতে, দুই দিনে খেলা শেষ হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এ রকম কন্ডিশনে দুই বা তিন দিনে ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনা অনেকবারই ঘটেছে। এমনটা হতেই পারে।’
ম্যাকাইয়ে দুই দিনে ইনিংস ও ৫১ রানে দ্বিতীয় টেস্ট হারলেও সিরিজ ড্র হয়েছে ১-১ ব্যবধানে। সে কথাই মনে করিয়ে দেন শান্ত, ‘আপনারা কি ভুলে গেছেন প্রথম টেস্ট। আমার মনে হয়, দেশের মানুষ ভোলেনি, কেউ ভোলেনি। এই ম্যাচে আমরা ভালো ক্রিকেট খেলিনি। একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে, আমরা কোন দলকে হারিয়েছি, এই টেস্টের ফল দেখলে বোঝা যাবে। ব্যাটিংয়ে দুইশতে অলআউট করে দিয়েছি। সব মিলিয়ে আমি বলব, সিরিজ উদযাপন করা উচিত এবং এই টেস্ট ম্যাচ থেকে শেখা উচিত কীভাবে কী করতে পারি।’