বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM
Topic Ads 1
ফেসবুককেন্দ্রীক অনলাইন প্রতারণা: ইলিশ থেকে লোন—ফাঁদের জাল সর্বত্র

ফেসবুককেন্দ্রীক অনলাইন প্রতারণা: ইলিশ থেকে লোন—ফাঁদের জাল সর্বত্র

মো. রাশিদুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধি: পোশাক, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিকস থেকে শুরু করে নিত্যদিনের খাবার কিংবা পুরোনো পণ্য—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজ এখন অনেকের কাছেই প্রচলিত অনলাইন বাজারের বিকল্প। ঘরে বসেই কেনাকাটার এই সুবিধা যেমন জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি সহজে ক্রেতা পাওয়ার সুযোগ এবং অগ্রিম টাকা নেওয়ার প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একশ্রেণির প্রতারক চক্র। কখনো পণ্যের নামে মূল্যহীন জিনিস ধরিয়ে দেওয়া, কখনো ওটিপি (OTP) হাতিয়ে অ্যাকাউন্ট শূন্য করা, আবার কখনো এআই (AI) ও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নামে প্রতারণার জাল বিছানো হচ্ছে।ইলিশের বিজ্ঞাপন আর এক ওটিপিতেই খালি অ্যাকাউন্টফেসবুকে চাঁদপুরের টাটকা ইলিশের চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে লোভ সামলাতে পারেননি ফটোগ্রাফার মঞ্জুরুল আলম। ঘরে বসেই মাছ পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাসে তিনি একটি ফেসবুক পেজে ইলিশের অর্ডার করেন। নির্দিষ্ট দিনে ডেলিভারি কর্মীর ফোন পেয়ে তিনি নিচে নামেন। এরপর মাছের ডেলিভারি নিশ্চিত করার কথা বলে প্রতারকরা তার মোবাইলে আসা একটি ওটিপি (OTP) কোড জেনে নেয়।কোডটি জানানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, তার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) অ্যাকাউন্টে থাকা পুরো টাকাই উধাও হয়ে গেছে! পরে গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ওই চক্রের সদস্যরা গ্রেপ্তার হয় এবং ভুক্তভোগী তার টাকা ফেরত পান। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ইলিশ বিক্রির এই বিজ্ঞাপনটি ছিল মূলত গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট খালি করার একটি সুকৌশল ফাঁদ।চাদরের অর্ডারে কাপড়ের টুকরা ও পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া পেজবগুড়ায় ফেসবুকের মাধ্যমে অর্ডার নেওয়া দুটি অনলাইন শপের বিরুদ্ধে আরেকটি চাঞ্চল্যকর প্রতারণা সামনে এসেছে। একটিতে বিছানার চাদর এবং অন্যটিতে চাদর-বালিশের কাভার অর্ডার করার পর পার্সেল খুলে দেখা যায়, ভেতরে চাদরের পরিবর্তে রয়েছে কেবল দুই টুকরা মূল্যহীন কাপড়। পরে পুলিশি তদন্তে জানা যায়, দুটি অনলাইন শপই একই প্রতারক চক্র পরিচালনা করছিল।শুধু ছোট খাটো পেজ নয়, মানুষের আস্থার প্রতীক পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করেও তৈরি হচ্ছে ভুয়া পেজ। রবিশপের নাম ও ডোমেইনের কাছাকাছি ‘Robi Bangladesh’ নামে ভুয়া পেজ খুলে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করেছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ। এছাড়া ২০২৬ সালের মে মাসে সেনা কল্যাণ সংস্থার নাম ব্যবহার করে ভোগ্যপণ্যে ৫০ শতাংশ ছাড়ের ভুয়া বিজ্ঞাপন প্রচারের বিষয়টিও ধরা পড়েছিল ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানে।এআই, ডিপফেক ও লোন কেলেঙ্কারিপ্রতারণার কৌশল প্রতিনিয়ত আরও আধুনিক ও ভয়ংকর হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে পুলিশ পরিচিত ব্যক্তি ও সেলিব্রেটিদের মুখ ও কণ্ঠ নকল করে এআই (AI) ও ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে ভুয়া বিজ্ঞাপন তৈরির সঙ্গে জড়িত ১০ সদস্যের একটি চক্রকে গ্রেপ্তার করে।পাশাপাশি, কম সুদে দ্রুত ঋণের প্রলোভন দেখিয়ে ফেসবুক ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে চলছে বড় ধরনের প্রতারণা। প্রসেসিং ফি বা জামানতের নামে অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া এবং পরবর্তীতে ঋণ আদায়ের নামে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)—এর পক্ষ থেকে ‘সাথী লোন’, ‘পপক্যাশ’, ‘ফিনক্যাশ’, ‘কুইক লোন’, ‘বংগক্যাশ’, ‘স্মার্ট লোন বিডি’সহ ৩১টি অননুমোদিত মোবাইল অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নিয়ে কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এসব অ্যাপে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যক্তিগত  সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।কেন এত সহজে ফাঁদে পড়ছেন ক্রেতারা?বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেসবুক গ্রুপ বা পেজে অনেক সময় বিক্রেতার আসল পরিচয়, ব্যবসার ঠিকানা, ট্রেড লাইসেন্স বা সুনির্দিষ্ট রিটার্ন পলিসি যাচাই করার সুযোগ থাকে না। পেইজের বড় ফলোয়ার সংখ্যা, পজিটিভ কমেন্ট, পুরোনো পোস্ট কিংবা ‘অরিজিনাল’ বা ‘হোলসেল’ কথার ফুলঝুরি দেখে ক্রেতারা সহজেই বিশ্বাস স্থাপন করেন।জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জানান, চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট না হয়ে বিক্রেতার পরিচয় ও বৈধতা যাচাই করেই অনলাইনে কেনাকাটা করা উচিত। তবে ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট আইনের অনুপস্থিতির কারণে অনেক সময় সরাসরি আইন প্রয়োগে কিছুটা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। অভিযোগ পেলে শুনানির মাধ্যমে তা পর্যালোচনা করে জরিমানা ও ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে।প্রতারণা থেকে বাঁচতে করণীয় ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে এই অপরাধ পুরোপুরি থামানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সর্বাত্মক জনসচেতনতা।অতিরিক্ত লোভ পরিহার: অতি কম দামে ভালো পণ্যের লোভনীয় অফার দেখলে হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।যাচাই-বাছাই: পেজের রিভিউ, পুরনো কার্যক্রম, মালিকের পরিচয় ও ট্রেড লাইসেন্স যাচাই করতে হবে।ওটিপি গোপন রাখা: ডেলিভারি বা অন্য কোনো অজুহাতে মোবাইল বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কোনো ওটিপি (OTP) বা পিন কোড অন্য কাউকে দেওয়া যাবে না।নিরাপদ লেনদেন: সম্ভব হলে পণ্য হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধ (Cash on Delivery) করার পদ্ধতি বেছে নেওয়া উচিত।সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেটর ও সাইবার ক্যানিয়ন আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, "প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে শুধু প্রযুক্তি শেখালে হবে না, প্রতারণার শিকার হলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে এবং আইনি সহায়তা পাওয়ার উপায় কী—তা সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় তুলে ধরতে হবে।"নিয়মিত সচেতনতা, ব্যক্তিগত সতর্কতা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই কেবল ডিজিটাল এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিরাপদ রাখা সম্ভব।

Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream