বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩
Bangla FM
Topic Ads 1
অর্লেনের ভেনেজুয়েলা তেল কাণ্ডে ‘বিশ্বের সামনে লজ্জিত’ পোল্যান্ড

অর্লেনের ভেনেজুয়েলা তেল কাণ্ডে ‘বিশ্বের সামনে লজ্জিত’ পোল্যান্ড

পোল্যান্ডের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি সংস্থা ‘অর্লেন’ (Orlen)-এর ভেনেজুয়েলা থেকে জ্বালানি তেল কেনার চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ২৩ কোটি ডলার (প্রায় ২৫০ কোটি টাকা) লোকসান হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক এই খবর প্রকাশ্যে আসার পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি)-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের সূত্র ধরে তিনি মন্তব্য করেছেন, এই ঘটনা পোল্যান্ডকে ‘সারা বিশ্বের সামনে লজ্জিত’ করেছে। অনিরাপদ প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেন, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ব্যবহার এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেনের ফলে রাষ্ট্রীয় এ বিপুল অর্থের ক্ষতি হয়েছে বলে দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ঘটনাটিকে দেশের ইতিহাসের ‘অন্যতম বড় কেলেঙ্কারি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর জন্য পূর্ববর্তী ‘ল অ্যান্ড জাস্টিস’ (পিআইএস) সরকার ও তাদের নীতিকে দায়ী করেছেন। ঘটনার সময় অর্লেনের প্রধান নির্বাহী পদে ছিলেন দানিয়েল ওবায়েতেক। তিনি বর্তমানে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বিরোধী দল পিআইএসের সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করছেন। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলে অর্লেন প্রথম প্রকাশ করে যে তাদের সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সাবসিডিয়ারি ‘অর্লেন ট্রেডিং সুইজারল্যান্ড’ (ওটিএস) ভেনেজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম সামগ্রী আমদানির জন্য অগ্রিম হিসেবে প্রায় ৪০ কোটি ডলার দিয়েছিল। কিন্তু পুরো টাকাটাই জলে গেছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ওই তেল কখনোই সরবরাহ করা হয়নি। পোল্যান্ডের তৎকালীন পিআইএস সরকারের পতনের পর টাস্ক সরকার অর্লেনের প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে ওবায়েতেক বরখাস্ত করে নতুন ব্যবস্থাপনা নির্দেশক নিয়োগ দেয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, হারানো অর্থের মধ্যে প্রায় ২৪ কোটি ডলার দুবাইভিত্তিক এক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছিল, যা পরিচালনা করতেন হংকংয়ের ২৫ বছর বয়সী এক তরুণ। পরবর্তীতে পোলিশ প্রসিকিউটররা এই লেনদেনের বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেন। তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে ওটিএস-এর তৎকালীন প্রধান সামের এ. (আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে যার পুরো নাম প্রকাশ করা হয়নি) মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানির উদ্যোগ নেন। কোনো ধরনের জামানত বা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়াই এসব মধ্যস্থতাকারীদের ২৩ কোটি ডলার অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলেও দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘পিডিভিএসএ’ আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ফলে এই লেনদেন সম্পন্ন করতে ক্রিপ্টোকারেন্সির আশ্রয় নেওয়া হয়। অর্লেনের ভাড়া করা জ্বালানিবাহী জাহাজ মাসের পর মাস সাগরে অলস বসে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তেল পৌঁছায়নি, আর অগ্রিম অর্থও গায়েব হয়ে যায়। পোল্যান্ডের মন্ত্রিসভার বৈঠকের আগে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে যা প্রকাশ পেয়েছে তা সারা বিশ্বের সামনে আমাদের লজ্জিত করেছে। এটি আমাদের দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় কেলেঙ্কারি।’ টাস্ক সরাসরি বিরোধী দল পিআইএসকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘এই ঘটনায় পিআইএস সরকারের আমলের সব অপকর্মের রূপ ফুটে উঠেছে—যার মধ্যে নোংরা লেনদেন থেকে শুরু করে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত।’ প্রধানমন্ত্রী টাস্ক আরও অভিযোগ করেন, সরকারের প্রতি বিরূপ ভাবাপন্ন বর্তমান প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোকি সম্প্রতি ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজার নিয়ন্ত্রণ ও জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কর আরোপ সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিলে বাধা দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা সম্ভবত একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও নোংরা লেনদেন চক্রের মুখোমুখি হয়েছি।’ এদিকে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় অর্লেনের সাবেক সিইও দানিয়েল ওবায়েতেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘প্রতিবেদনে ওটিএস মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরা হয়েছে। আমি চাই বিষয়টি পোল্যান্ডের আদালতে পুরোপুরি স্পষ্ট হোক।’ তিনি উল্টো বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সমালোচনা করে দাবি করেন, নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ খুব তাড়াহুড়ো করে চুক্তিটি বাতিল করেছে, নতুবা তেল পোল্যান্ডে পৌঁছাত। ওবায়েতেকের দাবি, দেশের বর্তমান জ্বালানির রেকর্ড মূল্য বৃদ্ধি থেকে জনগণের মনোযোগ সরাতে টাস্ক সরকার এই পুরোনো মামলাটিকে আবার সামনে আনছে। ওবায়েতেকের এই বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছে অর্লেনের বর্তমান প্রেস অফিস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওবায়েতেকের পোস্টের নিচে তাদের পক্ষ থেকে লেখা হয়, ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের মূল খবরটি ছিল কীভাবে আপনার সময়ে দুবাইয়ের এক ২৫ বছরের তরুণের সংস্থায় পোল্যান্ডের কোটি কোটি ডলার স্থানান্তর করা হয়েছিল। সে ওই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে ইউএসবি ড্রাইভে নেয় এবং রেস্তোরাঁয় বসে তেল ব্যবসায়ী সেজে থাকা ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেয়...এই নাটকে কেবল অর্লেনের খোয়া যাওয়া টাকাটাই সত্যি।’ ওয়ারশর আঞ্চলিক প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে, ওটিএসের তৎকালীন প্রধান সামের এ.-কে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে পোল্যান্ডে প্রত্যর্পণের আইনি চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। যদিও গত বছর ইউএই পোল্যান্ডের প্রত্যর্পণ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল। প্রসিকিউটররা আরও জানান, পোল্যান্ড ও ওটিএসের সম্পত্তি সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়ে কোম্পানির ৩৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি করায় গত মাসে অর্লেনের সাবেক তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গঠন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গ্রামাঞ্চলের একজন সাধারণ মেয়র থেকে মাত্র তিন বছরের মধ্যে পোল্যান্ডের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সিইও হয়ে ওঠা দানিয়েল ওবায়েতেকের বিরুদ্ধে আগেই ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। গত বছর ইউরোপীয় পার্লামেন্ট তাঁর আইনি সুরক্ষার অধিকার (ইমিউনিটি) বাতিল করে, যার ফলে তাঁর বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়ার পথ উন্মুক্ত হয়।

Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream