রুশ জ্বালানি নিয়ে আবারও অবস্থান বদল, নতুন ঘোষণা ট্রাম্পের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি খাত নিয়ে আবারও অবস্থান বদলেছেন। তিনি বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানো ও দেশে দাম নিয়ন্ত্রণের চাপে রুশ জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কয়েক দিন পরই রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে অবিলম্বে ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছেন।
রবিবার ট্রাম্প জানান, দুই দেশ একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, এ ধরনের সমঝোতার বিষয়ে তিনি আগে থেকে জানতেন না। ফলে যুদ্ধবিরতির শর্ত ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সোমবারও জেলেনস্কি দাবি করেছেন, বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলায় তেল ও ডিজেলের বাজারে চাপ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও। আগামী ৩ নভেম্বর দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন। তার আগে জ্বালানির দাম কমাতে না পারলে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
কী এই ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’
রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন অবিলম্বে একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। তবে সমঝোতার বিস্তারিত শর্ত জানাননি তিনি।
সোমবার ওয়ারশতে এক নিরাপত্তা সম্মেলনে ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে কী শর্তে সমঝোতা হয়েছে, তা জানতে তারা অপেক্ষা করছেন। রাশিয়ার ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনা, এমনকি খারকিভের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জেলেনস্কির মতে, যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে উদ্যোগ নিয়ে রাশিয়াকে সমঝোতা মানতে বাধ্য করলে এটি যুদ্ধ অবসানের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
তবে অস্ট্রেলিয়ার এডিথ কোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত অধ্যয়নের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যালেক্সি মুরাভিয়েভ সমঝোতার আওতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তার মতে, চুক্তিটি যদি শুধু তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা অসম পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কারণ, রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের তেল শোধনাগারের সক্ষমতা আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দামের চাপ
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৩ ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম প্রায় ৯১ ডলারে নেমে আসে।
তবে বাজারে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এ পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর সঙ্গে ইয়েমেনের হুতিদের হামলা এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালিকে ঘিরে সংঘাতও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলায় ডিজেল সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে। পরিবহন, কৃষি ও পণ্য উৎপাদনে ডিজেল অপরিহার্য হওয়ায় এর দাম বাড়লে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়ে যায়।
এ পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে জি-৭ জোট জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও ডিজেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে একমত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসান্না স্ট্রিটার বলেন, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা সরবরাহ কমিয়ে পরিবহন, কৃষি ও ব্যবসার ব্যয় বাড়াচ্ছে। প্রকৃত যুদ্ধবিরতি সরবরাহ সুরক্ষিত করতে এবং দাম কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে জেলেনস্কির অজ্ঞাতসারে ঘোষিত সমঝোতাকে এখনই বড় কূটনৈতিক সাফল্য বলার সুযোগ নেই।
নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড়: কেন বদলাচ্ছেন ট্রাম্প
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর রুশ জ্বালানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি কয়েকবার বদলেছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ওই বছরের মার্চে রুশ জ্বালানি আমদানি নিষিদ্ধ করে এবং জি-৭-এর সঙ্গে রুশ তেলের ওপর মূল্যসীমা আরোপে সমর্থন দেয়। লক্ষ্য ছিল, বিশ্ববাজারে সরবরাহ বজায় রেখেও মস্কোর আয় কমানো।
ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্প ২০২৫ সালের আগস্টে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেন। পরে রুশ জ্বালানি খাতের দুই বড় প্রতিষ্ঠান রসনেফট ও লুকঅয়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
কিন্তু ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের পর চলতি বছরের মার্চে নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়া হয়, যাতে ভারত সমুদ্রে থাকা রুশ তেল কিনতে পারে। পরে ট্যাংকারে তোলা নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত রুশ তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য কেনার সুযোগও বাড়ানো হয়। সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প ইউক্রেনকে রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধের আহ্বান জানান। সর্বশেষ ৯ অক্টোবর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সমঝোতার কথা জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া অবিলম্বে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে; পরে আরও ১৫ লাখ টন দেওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখা এবং দেশে জ্বালানির দাম কমানো- দুটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জনের চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি ৬ দশমিক ৫২ ডলারে পৌঁছায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানো তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য।
মুরাভিয়েভের ধারণা, রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহের আলোচনা ট্রাম্পের ঘোষণার অনেক আগেই এগিয়ে থাকতে পারে। নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোর উদ্যোগ তুলে ধরে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকতে পারে।
পুতিনেরও স্বার্থ রয়েছে
রাশিয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা শুধু অর্থনৈতিক লাভের বিষয় নয়। ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সমালোচনা করেছেন এবং যুদ্ধ বন্ধে ব্যর্থতার জন্য তাকে দায়ী করেছেন। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতা বজায় রেখে মস্কো দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে।
ব্যবসা ও বিনিয়োগে প্রভাব
রুশ ডিজেলের সরবরাহ বাড়লে পরিবহন প্রতিষ্ঠান, কৃষক ও উৎপাদনকারীরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহসংকট অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব সীমিত হবে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন জ্বালানি সংগ্রহ, সরবরাহব্যবস্থার পরিকল্পনা এবং আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করছে দুটি বিষয়ের ওপর- রুশ জ্বালানির সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কতটা কমানো যায় এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সত্যিই জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করে কি না। সমঝোতা বাস্তবায়িত না হলে তার ঘোষণার কূটনৈতিক সাফল্য নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে। সূত্র: আল-জাজিরা