মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে সংশয়, নতুন প্রতিরক্ষা জোটে সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন এক সমীকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘিরে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের পর নিজেদের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে নতুন কৌশলগত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত এই চুক্তি শুক্রবার সৌদি আরবের মক্কায় স্বাক্ষরিত হয়। বৈঠক শেষে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিন দেশের যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করাই এই চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।চুক্তিটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও বহুমুখী করার চেষ্টা করছে। রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসির মিডল ইস্ট ফেলো ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিচসেন বলেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন নিরাপত্তা অংশীদারত্বের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সংশয় বাড়ছে।তার মতে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি সামলানোর পদ্ধতি এবং সংকট মোকাবিলায় বারবার অবস্থান পরিবর্তনের কারণে এসব উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তবে নতুন চুক্তির লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং নিজেদের জন্য অতিরিক্ত কৌশলগত ও নীতিগত বিকল্প তৈরি করা।তোসি ব্যাখ্যা করে বলেন, মূলত ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর না করে সৌদি আরব তার নিরাপত্তা অংশীদারত্বের পরিধি বৃদ্ধি করছে এবং অঞ্চলভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করছে বলে মনে হচ্ছে। এটিই শর্তসাপেক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।সংবাদমাধ্যমের খবরে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্ররা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। কারণ, কোনো আঞ্চলিক সহযোগীদের ওপর এর প্রভাব কেমন পড়বে, তা না ভেবেই গত ফেব্রুয়ারিতে তারা ইরানে আগ্রাসন চালিয়েছিল।ইরানি বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার ফলে বেসামরিক নাগরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ইরান জ্বালানি ও পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টসহ বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে।অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানির মূল পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করার তেহরানের সিদ্ধান্ত স্থানীয় অর্থনীতিতেও ভারী মূল্য চাপিয়ে দিয়েছে।যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক হামলা সত্ত্বেও ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অনেকটাই বজায় রেখেছে। বিপরীতে ওয়াশিংটন তার মিত্রদের পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা গোলাবারুদ জোগাতে হিমশিম খেয়েছে। কারণ, এই আকাশ প্রতিরক্ষার সিংহভাগই ইসরায়েলে পাঠানো হয়েছিল।যুদ্ধের লাগিয়ে দেওয়ার পর সৃষ্টি পরিস্থিতির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় দীর্ঘদিনের ওয়াশিংটন-নির্ভরতা আরও বেশি চাপের মুখে পড়েছে।সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অধীনে মধ্যপ্রাচ্য নীতির অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ব্রেট ম্যাকগার্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘এটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি পরিবর্তনশীল ও সম্পূর্ণ নতুন শুরুর অধ্যায়।’তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, শুক্রবারের এই নিরাপত্তা চুক্তিকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা এবং ইরানকে ঠেকানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ইয়াসমিন ফারুক আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এসব দেশ সবই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। তারা জানে, এমন কোনো কাঠামো নেই, যা যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে।’ফারুক আরও যোগ করেন, এই চুক্তিকে ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতের দিকে পা বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা ভুল হবে।বিশ্লেষক ফারুক উল্লেখ করেন, ফেব্রুয়ারির শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম যখন ইরানে আগ্রাসন চালায়, তার পর থেকেই এই তিন দেশই সাধারণত মধ্যস্থতা ও উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়ে এসেছে।ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক বলেন, এসব দেশের মধ্যে মিল হলো, তারা কেউ-ই আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে চায় না। এতে চুক্তিটির গুরুত্ব ‘আদর্শগত প্রতিরোধ’-এর কাছাকাছি বলে মনে করেন তিনি।ফারুক ব্যাখ্যা করেন, যুদ্ধ শেষে ইরান আরও কঠোর এবং তার লক্ষ্য অর্জনে শক্তি প্রয়োগে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।ফারুক বলেন, এখানে শুধুই প্রতিরোধের বিষয় নয়, বরং কৌশলগত সহযোগিতার ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে।