সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM
Topic Ads 1
চেনা চিত্র বদলে ভারত থেকে আসছে ইলিশ

চেনা চিত্র বদলে ভারত থেকে আসছে ইলিশ

এবার উল্টে গেছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ইলিশ বাণিজ্যের চেনা চিত্র। দীর্ঘদিন ধরে ভারত বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের সবচেয়ে বড় বিদেশি বাজার ছিল। বিশেষ করে দুর্গাপূজার মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে ভারতে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইলিশ রপ্তানি করা হতো। কিন্তু এবার বাংলাদেশে ইলিশ পাঠানো হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে উল্টো ভারত থেকেই। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে—দেশটির মৎস্য ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানি হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও ১৫০ থেকে ২০০ টন ইলিশ পাঠানোর প্রস্তুতি রয়েছে। বাংলাদেশে চলতি বছর ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বর্তমানে ১ কেজি বা তার বেশি ওজনের পদ্মার ইলিশ বাংলাদেশে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই সংকটের কারণে কিছু বাংলাদেশি ব্যবসায়ী প্রচলিত বাণিজ্যপথের বাইরে গিয়ে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি করছেন। ভারত থেকে আসা ইলিশের বড় অংশ গুজরাট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ভরুচ বন্দর দিয়ে পাঠানো হয়েছে। কিছু চালান পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া পাইকারি মাছবাজার হয়েও গেছে। হাওড়া হোলসেল ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ বলেন, বাংলাদেশ এবার প্রথমবারের মতো ভারত থেকে ইলিশ আমদানি করছে। সাধারণত পশ্চিমবঙ্গ থেকে বোয়াল, রুই, পারসে ও ট্যাংরা মাছ বাংলাদেশে পাঠানো হয়। গুজরাটের ইলিশে প্রচুর ডিম বা রো থাকায় ভারতের বাজারে এর চাহিদা তুলনামূলক কম। কিন্তু বাংলাদেশে বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেটে ডিমভরা ইলিশের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফলে গুজরাটের ইলিশ বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। মাকসুদ বলেন, এসব ইলিশের ডিম আলাদাভাবেও বিক্রি করা হচ্ছে। পরে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে অন্য দেশেও পুনরায় রপ্তানি করা হচ্ছে। তবে শুধু গুজরাট নয়, পশ্চিমবঙ্গের ডায়মন্ড হারবার ও কোলাঘাট থেকেও মাঝারি আকারের ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। কিছু চালান এসেছে গুজরাট ও মুম্বাই থেকে। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে গত দুই মাসে অন্তত ৪৫০ টন ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। রোববারও প্রায় ১০ টন ইলিশ নিয়ে দুটি চালান এই স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা শুরুতে এসব চালানের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ পাঠানোর খবর প্রকাশ হলে বাংলাদেশে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রপ্তানির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিছু রপ্তানিকারক প্রথমে দাবি করেছিলেন, ইলিশ রপ্তানির কোডের অধীনে পাঠানো চালানে সামুদ্রিক মাছ থাকতে পারে। পরে পেট্রাপোলের ল্যান্ড পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়ার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও কাস্টমসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, ভারত থেকে বাংলাদেশে সত্যিই ইলিশ রপ্তানি হয়েছে। মৎস্য আমদানিকারক সমিতির সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। মৎস্য ব্যবসায়ীদের মতে, সীমান্তের দুই পাশেই ইলিশের সংকট এই অস্বাভাবিক বাণিজ্যের অন্যতম কারণ। অনিয়মিত বাতাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে মাছ ধরায় ব্যাঘাত ঘটেছে। এতে ইলিশের আহরণ কমার পাশাপাশি জেলেদের লোকসানও হয়েছে। এক ভারতীয় রপ্তানিকারক বলেন, বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা আরব সাগর ও নর্মদা নদীর মোহনা থেকে পাওয়া ইলিশ সংগ্রহ করছেন। এসব মাছ দেখতে ভালো হলেও মিঠাপানির ইলিশের মতো সুস্বাদু নয়। তবে পদ্মার ইলিশের তুলনায় দাম কম হওয়ায় এবং বাজারে ব্যাপক সংকট থাকায় ব্যবসায়ীরা এগুলো আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ রপ্তানির এই পরিবর্তন এবার দুর্গাপূজাকে ঘিরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রপ্তানি হবে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে। গত বছর বাংলাদেশ ভারতকে ১ হাজার ২০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতে পৌঁছায় মাত্র ১৪৩ দশমিক ৮০ টন। এর আগের দুই বছরেও ভারতে ইলিশ আমদানি ৬০০ টনের নিচে ছিল। মূলত বেশি দামের কারণে আমদানিকারকেরা অনেক চালান নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। এবার কলকাতার মাছ আমদানিকারকেরা বাংলাদেশকে আবার ইলিশ রপ্তানি শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। শহরভিত্তিক একটি সংগঠন বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছে। বাংলাদেশি মাছ ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের অনুরোধ করেছেন বলে জানা গেছে। তবে তারেক রহমানের সরকার এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ইলিশ উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশ। সেই দেশের বাজারে ইলিশের ঘাটতি মেটাতে এবার প্রতিবেশী ভারত থেকেই ইলিশ আসছে। বিষয়টিকে তাই শুধু বাণিজ্যের উল্টো স্রোত নয়, দুই দেশের দীর্ঘদিনের ইলিশ-সম্পর্কেরও এক অস্বাভাবিক অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং এজেন্টস স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, ‘ভারত এখন বাংলাদেশে ইলিশ রপ্তানি করছে, এটি অবশ্যই গর্বের বিষয়। তবে আমার ইচ্ছা, ইলিশ যেন চিরকাল দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বের প্রতীক হয়ে থাকে।’

Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream