ওভারপাসের দেয়ালে রঙে রঙে ফুটছে বগুড়ার ঐতিহ্য
একসময় দেয়ালজুড়ে ছিল পোস্টার, ব্যানার আর অননুমোদিত দেয়ালিকার দখল। সেই বিবর্ণ দেয়ালেই এখন রঙের তুলিতে জীবন্ত হয়ে উঠছে বগুড়ার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি। কংক্রিটের দেয়াল যেন পরিণত হচ্ছে উন্মুক্ত শিল্প গ্যালারিতে।
মহাস্থানগড়, বেহুলার বাসরঘর, বৈরাগির ভিটা, জিয়ত কুণ্ডু থেকে শুরু করে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত বগুড়ার দই, আলু ও ঐতিহ্যবাহী লাল মরিচ, লাঙলের হালচাষ, সভ্যতার পুন্ড্রনগর সবই ফুটে উঠছে রঙিন ম্যুরালে।
বগুড়া সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চারলেন জাতীয় মহাসড়কের বগুড়া মহানগর অংশে একটি রেল ওভারপাস ও দুটি ওভারপাস রয়েছে। এর মধ্যে বারোপুর ওভারপাসের উত্তর-পূর্ব দিকের দেয়ালে অ্যাক্রেলিক রঙে আঁকা হচ্ছে একের পর এক দৃষ্টিনন্দন চিত্রকর্ম। চিত্রকর্মগুলোতে তুলে ধরা হচ্ছে বগুড়ার গৌরবময় অতীত, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোককথা, কৃষি ও খাদ্য সংস্কৃতি।
প্রতিটি ছবিতে যেন ফুটে উঠছে এই জনপদের স্বতন্ত্র পরিচয়। ইতিহাসের সঙ্গে ঐতিহ্যকে মিলিয়ে দেয়ালজুড়ে তৈরি হচ্ছে এক ব্যতিক্রমী শিল্পভুবন। এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল ও কলেজের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক ও ডিজিটাল আর্টিস্ট মো. আবু লায়েছ নিক্সন।
তিনি জানান, বগুড়া মহানগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি চিত্রকর্মের মাধ্যমে এ অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প ও সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।
জানা গেছে, বগুড়া মহানগরীর চার লেন জাতীয় মহাসড়কের বারোপুর ওভারপাসের দেয়ালে চলছে ব্যতিক্রমী এই শিল্পকর্মের আয়োজন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বড় পরিসরে চলছে মুরাল পেইন্টিংয়ের কাজ। নগরের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের সামনে বগুড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরতেই নেওয়া হয়েছে এই উদ্যোগ।
বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ‘সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন’ (সাসেক-২) প্রকল্পের আওতায় ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেনের সংস্থানসহ মহাসড়কটি উন্নীত করা হয়। ২০২৪ সালে শাজাহানপুর উপজেলার বি-ব্লক ক্যান্টনমেন্ট ওভারপাস, ফুলতলা ওভারপাস, ফটকি সেতু এবং বগুড়া সদরের তিনমাথা মোড়ের রেল ওভারপাস এবং বারোপুর ওভারপাস যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
নির্মিত এসব অবকাঠামো চালুর পর থেকেই দেয়ালগুলোতে শুরু হয় পোস্টার, ব্যানার, বিজ্ঞাপন ও অননুমোদিত দেয়ালিকা লাগানোর প্রতিযোগিতা। এতে অবকাঠামোর সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের আগস্টে আন্দোলনের উত্তাল সময়ে এসব দেয়ালে জুলাইয়ের দাবি ও শহীদদের প্রতিকৃতি নিয়ে বিভিন্ন গ্রাফিতি আঁকা হলেও পরবর্তী সময়ে সেগুলোও পোস্টার ও দেয়ালিকার আড়ালে হারিয়ে যায়।
বগুড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদুল হক জানান, ফ্লাইওভারের দেয়ালে অনিয়ন্ত্রিত পোস্টার, ব্যানার ও বিজ্ঞাপন লাগানোর কারণে নগরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছিল। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করা এবং শহরের নান্দনিক পরিবেশ বজায় রাখতেই বগুড়ার স্থানীয় পরিচয় তুলে ধরে দৃষ্টিনন্দন ওয়াল আর্ট ও মুরাল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, উদ্যোগটির বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং বগুড়া সদর আসনের সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা অবগত রয়েছেন।
প্রকৌশলী রাশেদুল হক বলেন, ফ্লাইওভারের দেয়ালগুলো যেন কেবল কংক্রিটের অবকাঠামো হয়ে না থাকে, বরং বগুড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি উন্মুক্ত শিল্পগ্যালারিতে পরিণত হয়। সেই লক্ষ্যেই সওজের এই সরকারি উদ্যোগ।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বারোপুর ওভারপাসের দেয়ালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কাজটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের অভিজ্ঞতা, ব্যয় ও সাফল্য বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে বগুড়ার অন্যান্য ওভারপাস, রেল ওভারপাস এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও এ ধরনের নান্দনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।