বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM
Topic Ads 1
স্যরি বললে বড়রা ছোট হয়ে যায় না

স্যরি বললে বড়রা ছোট হয়ে যায় না

শুধু ‘ইগো’ বা অহংয়ের কারণে আমরা নিজেদের ভুল আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে বিব্রত বোধ করি। ‘স্যরি’ বললে আমি ছোট হয়ে যাব, এই দ্বিধা আমাদেরকে মনের কথাটি মুখে উচ্চারণ করতে বাধা দেয়। অথচ পিঠে একবার হাত রেখে আন্তরিকভাবে উচ্চারণ করুন, ‘স্যরি, আমাকে ক্ষমা করো।’ মুহূর্তে প্রিয়জন, সহকর্মী বন্ধু বা আত্মীয় আপনাকে বুকে টেনে নেবেন। স্যরি’র শক্তি নিয়ে লিখেছেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী রাতে খেতে বসে গজগজ করছিলেন আকরাম। নিজে নিজেই বিড়বিড় করছিলেন, ‘লোকটা কী মনে করে আমাদের, আমরা সবাই গরু–ছাগল?’ স্বামীর এই স্বভাব জানেন নাসরিন, ভেতরে–ভেতরে কোনো বিষয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়লে এ রকম আপন মনে কথা বলেন। নিচু স্বরে জানতে চাইলেন, ‘কার কথা বলছ?’ ‘কার কথা আবার, দ্য গ্রেট মোস্তাফিজুর রহমান, আমাদের মহামান্য বস। কাল থেকে আর চাকরিতে যাব না নাসরিন, এই চাকরি আর সম্ভব না। পড়াশোনা করেছি, ডাল-ভাত যাহোক, জোগাড় হয়ে যাবে...।’ নাসরিনের চেহারায় শঙ্কার ছায়া পড়ে। আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নিঃশব্দে সে উঠে পড়েন খাবার টেবিল থেকে। এর কিছুক্ষণ পরই একটা ফোন এল। স্ক্রিনে নামটি দেখে প্রথম দিকে ফোন ধরবেন কি না, গড়িমসি করছিলেন আকরাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফোনে কথা হলো বেশ কিছুক্ষণ ধরে। নাসরিনের মনে হলো, আপাতত কেটে গেল শঙ্কার মেঘ। পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করার সময় আকরামকে আগের রাতের সিদ্ধান্তের কথা মনে করিয়ে দিলেন নাসরিন, ‘আজ থেকে অফিসে যাবে না বলেছিলে...?’ হেসে তাঁর স্বামী বললেন, ‘ওটা তো রাগের কথা। আফটার অল মোস্তাফিজ সাহেব আমার বাবার মতো মানুষ। নিজের হাত ধরে কাজ শিখিয়েছেন, দুটো কথা বলার অধিকার তো তাঁর আছেই।’ দিব্যি ফুরফুরে মেজাজে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে অফিসে ছুটলেন আকরাম। আর নাসরিন ভাবছেন, কাল রাতে ফোনে কী এমন কথা হলো যে এত জমাট বরফ গলে জল হয়ে গেল! মোস্তাফিজুর রহমান ‘স্যরি’ বলেছিলেন আকরামকে। দুর্ব্যবহারের জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন তিনি একজন অধঃস্তন কর্মীর কাছে। আন্তরিকভাবে উচ্চারিত সেই শব্দ স্পর্শ করেছিল আকরামকে। হৃদয় আদ্র৴ হয়েছিল, চোখও সিক্ত হয়ে পড়েছিল। যেটুকু ক্ষত তৈরি হয়েছিল মনে, মুহূর্তেই যেন নিরাময় হয়ে গেল তাঁর। আসলে এই ক্ষমাপ্রার্থনার ভাষা, ‘দুঃখিত’ বা ‘স্যরি’র মতো একটি শব্দ পাল্টে দিতে পারে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অনেক কিছুই। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও তাঁর অধস্তন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর ক্ষেত্রে শুধু নয়, শিক্ষক-ছাত্র, পিতা-মাতা-সন্তান, বন্ধু-প্রিয়জন, স্বামী-স্ত্রী—সব ক্ষেত্রেই মন্ত্রের মতো কাজ করতে পারে। পৃথিবীখ্যাত কানাডীয় কার্টুনিস্ট লিন জনস্টোন মজার ছলে এক অসাধারণ আপ্তবাক্য উচ্চারণ করেছিলেন, ক্ষমাপ্রার্থনা (পড়ুন, স্যরি বলা) হচ্ছে সুপার গ্লুর মতো একটা বিষয়, এটা জীবনের যেকোনো বিষয়কে মেরামত করে দিতে পারে। এরিখ সেগালের বহুল জনপ্রিয় উপন্যাস লভ স্টোরির কথা অনেকের মনে থাকতে পারে। এ উপন্যাসের একটি সংলাপ সত্তরের দশকে তরুণ পাঠকদের আবেগাপ্লুত করে তুলেছিল, ‘লাভ মিনস নেভার হ্যাভিং সে ইউ আর স্যরি।’ বাংলা অর্থ করলে মোটামুটি দাঁড়ায়, ‘ভালোবাসা মানে তুমি কখনোই স্যরি বলবে না।’ অথচ দুঃখিত পিতার ক্ষমাপ্রার্থনার উত্তরে এই সংলাপ উচ্চারণ করেছিল সন্তান। তার মানে, ‘স্যরি’ বলেছিল বলেই পিতার প্রতি সমস্ত ক্ষোভ ভুলে এই কথা বলতে পেরেছিল ছেলেটি। সত্যি বলতে কি, স্যরি বা ‘দুঃখিত’, এই সামান্য কথা বলার মতো মনের জোর সবার থাকে না। কাউকে আঘাত দিয়ে ভুল বুঝতে পারলেও অনুতপ্ত বোধ করে দুঃখ প্রকাশ করার মতো চারিত্রিক দৃঢ়তা সবার থাকে না। সাধারণত স্যরি বলার জন্য তিনটি বাধার সম্মুখীন হতে হয়— ১. যাকে আঘাত দেওয়া হয়েছে তার সম্পর্কে একটা অবজ্ঞা-উপেক্ষার ভাব থাকা বা তাকে তত গুরুত্বপূর্ণ মনে না করা। ২. ক্ষমা প্রার্থনা করলে নিজের ভাবমূর্তির ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করা। ৩. ক্ষমা প্রার্থনা করেও কোনো কাজ হবে না বলে ধারণা করা। কিন্তু এই দ্বিধা ঝেড়ে ফেলতে হবে। যদি আমি মনে করি আমার আচরণ কারও মনঃকষ্টের কারণ হয়েছে, যদি আমি সম্পর্কটা মেরামত করতে চাই এবং যদি সত্যিই মনে করি যে একটা ভুল করে ফেলেছি, তাহলে অকপটে ক্ষমাপ্রার্থনা বা স্যরি বলার মতো কার্যকর আর কিছুই হতে পারে না। তবে মনে রাখতে হবে, দুঃখ প্রকাশটা যেন কথার কথা না হয়, এর আন্তরিকতা সম্পর্কে যেন উদ্দিষ্ট ব্যক্তির মনে কোনো সন্দেহ না জাগে। তবে কোনো একটি কারণ দেখিয়ে, অন্য কাউকে দোষারোপ করে স্যরি বললে পুরো ব্যাপারটি জোলো হয়ে পড়বে। মার্কিন বিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদ বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন, ‘কোনো একটি অজুহাত দেখাতে গিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনার ব্যাপারটিকে বরবাদ করে দিয়ো না।’ শুধু ইগো বা ‘অহং’–এর কারণে আমরা নিজেদের ভুল আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে বিব্রত বোধ করি। ‘স্যরি’ বললে আমি ছোট হয়ে যাব, এই দ্বিধা আমাদেরকে মনের কথাটি মুখে উচ্চারণ করতে বাধা দেয়। অথচ পিঠে একবার হাত রেখে আন্তরিকভাবে উচ্চারণ করুন, ‘স্যরি, আমাকে ক্ষমা করো।’ মুহূর্তে প্রিয়জন, সহকর্মী বন্ধু বা আত্মীয় আপনাকে বুকে টেনে নেবেন। তখনই বুঝবেন এই একটি শব্দের কত শক্তি! আর কিছু নয়, শুধু দরকার কথাটি উচ্চারণ করার মতো মনের জোর। লেখাটি ২০২০ সালের ২৮ অক্টোবর প্রথম আলোর সাপ্তাহিক ফিচার পাতা ‘অধুনা’য় ছাপা হয়েছিল

Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream