শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM
Topic Ads 1
নিজেকে গড়ার গল্পে সালমার দুই দশক

নিজেকে গড়ার গল্পে সালমার দুই দশক

সালমা এক-পা দু-পা করে সুরের ভুবনে দুই দশকের পথ অতিক্রম করে ফেলেছেন। রিয়েলিটি শো ‘ক্লোজআপ ওয়ান: তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ’-এর শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে ২০০৬ সালে যে যাত্রা শুরু, তা আজও অব্যাহত রয়েছে। ‘নিজেকে প্রতিদিন একটু একটু করে গড়তে হবে। একদিন তোমার পাশের মানুষটাও যেন চমকে যায়’– এ কথাগুলো সালমা তাঁর উত্তরসূরিদের জন্য বলেছেন এমন নয়। সুরের ভুবনে পা রাখার পর এটাই ছিল তাঁর ব্রত। দুই দশকের পথ পাড়ি দিয়েও এ কথাগুলো নিজেকেই নিজে শোনান। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে হলে প্রতিনিয়ত নিজেকে বদলাতে হয়। কারণ সময়ের সঙ্গে মানুষের চিন্তা-চেতনা, ভালো লাগা, মন্দ লাগা সবকিছুই বদলে যায়। তাই তো সালমা কখনও নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতর নিজেকে আটকে রাখতে চাননি। যদিও তিনি স্বীকার করেন, কণ্ঠ বা গায়কিতে নিজস্ব একটা ছাপ সব সময় থেকে যায়। তা মেনে নিয়েই সৃষ্টিতে নতুন কিছু সংযোজন ঘটাতে হয়। জনপ্রিয়তার দৌড়ে এগিয়ে থাকার লক্ষ্যে নয়, যে প্রত্যাশা শ্রোতাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করার দায় থেকে মেতে উঠতে হয় নতুন ও অভিনব সব আয়োজনে। এভাবেই গানের ভুবনে এতটা পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব হয়েছে।  দুই দশকের সংগীত যাত্রা নিয়ে সালমার কথার সঙ্গে একমত হবেন সংগীতপ্রেমীর অনেকে। কারণ সালমার কথার সত্যতা খুঁজতে খুব একটা পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। সাম্প্রতিক সময়ের প্রকাশিত তাঁর গানগুলোর দিকে নজর দিলেও তা স্পষ্ট হয়ে যায়। চলতি সপ্তাহে প্রকাশ পাওয়া ‘প্রেম লীলা’ গানের সূত্র ধরেই যদি আলোচনা শুরু করা যায় তাহলে আমরা দেখি, বিপ্লব সাহার সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া এই গানে সালমা নিজেকে আরও একবার ভিন্নরূপে উপস্থাপন করেছেন। এর আগে প্রকাশিত ‘এমন ভালোবাসা চাই না’, ‘দিল দিওয়ানা’, ‘ওরে আমার জান’, ‘ভাবের কথা’, ‘দেখলে তারে মন’, ‘সানাই’, ‘একমাত্র ঠিকানা’, ‘মানুষ ক্যান বেইমান’, ‘মনের গহিনে’, ‘বন্ধু মায়ার জাদু জানে’, ‘ভালোবাসার তৃষ্ণা’, ‘পিরিতের ঘর’ থেকে শুরু করে গায়কিতে নিজস্বয়তা ধরে প্রতিটি গানে নতুন কিছু উপকরণ যোগ করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এ প্রচেষ্টা গত দুই দশকের প্রতিটি আয়োজনে ছিল। এও স্পষ্ট হয়েছে, কীভাবে গানের ভুবনে এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন শীর্ষ তারকাদের কাতারে। তাই শুরুতে সালমার কাছে এ প্রশ্নটি এসে যায়– তাহলো পেছন ফিরে তাকালে সংগীতের এই দীর্ঘ সফর কীভাবে মনের পর্দায় ভেসে ওঠে? এর জাবাব দিতে গিয়ে অনেকের মতো সালমাও কিছু সময়ের জন্য ডুবে গিয়েছিলেন স্মৃতি রোমন্থনে। খানিক পর স্মৃতির অতল থেকে উঠে এসে বলেন, ‘ঠিক বিশ্বাস হয় না এতটা সময় কীভাবে পেছন ফেলে এলাম। পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকালে সবই চলচ্চিত্রের মতো মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। কৈশোরের খোলস ছেড়ে বেরুতে না বেরুতে ‘ক্লোজআপ ওয়ান : তোমাকেই খুঁজে বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিলাম। গানে গানে একেকটি ধাপ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে। মাথায় উঠল বিজয়ের মুকুট। এরপর থেকে আর থাকার অবকাশ হয়নি। প্রথম অ্যালবামের রেকর্ডিং অ্যালবাম প্রকাশ আর সেই অ্যালবামের গান নিয়ে শ্রোতা হৃদয়ে কড়া নাড়া; ভালোবাসা কুড়ানো সবই স্বপ্নের মতো। সেই যে শুরু হলো একের পর এক গান গেয়ে যাওয়া, অ্যালবাম, একক ও দ্বৈত গান, প্লেব্যাক, দেশ-বিদেশের মঞ্চে ছুটে যাওয়া আর কত না ব্যস্ততা– এর হিসাব কষাও কঠিন। এভাবে এক সময় গানই হয়ে উঠল নেশা থেকে পেশা। ব্যক্তিজীবনের কতই গল্প রচনা হয়ে গেল এ সময়ে। মাতৃত্বের স্বাদ পেলাম। শুরু হলো জীবনের আরেক অধ্যায়। কত স্মৃতি, কত ঘটনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মিশেলে হয়ে উঠল সালাম নামের এক শিল্পীর জীবনের গল্প।  সালমার এ কথাগুলো শুনতে গিয়ে আমাদের চোখে নানা দৃশ্য ভেসে উঠল। দেখা হলো পেছনের অধ্যায়গুলোর দৃশ্যপট। তবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মৌসুমী আক্তার সালমার অবয়বটা রয়ে গেল কেবলই একজন শিল্পীর। যার কাছে সংগীত ধ্যান ও জ্ঞান। এখন প্রশ্ন হলো, যিনি সবকিছুর আগে গানকে প্রাধান্য দিয়ে আসছেন, সেই সালমা গানের ভুবন থেকে কী পেলেন, তার কখনও হিসাব-নিকাশ করেছেন? প্রশ্ন সামনে রাখতেই সালমা বলেন, ‘আমি সব সময় শ্রোতাদের প্রত্যাশা পূরণের জন্যই গান করে যাওয়ার কথা ভেবেছি। গান প্রকাশ করে কত আয় হবে, না হবে তার হিশাব-নিকাশ কষতে বসিনি। তাছাড়া এ দেশে কেউ সঠিক উপায়ে রয়্যালিটি পেয়েছেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সে কারণেই বছরের পর বছর রয়্যালিটি নিয়ে আন্দোলন, শিল্পী-প্রকাশকদের তর্ক-বিতর্ক চলছে তো চলছেই। তাই এত কিছু নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে প্রকাশকদের কাছে যা পাই, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার কথা না হয় বাদ দিন, অন্যদের দিকে তাকান, দেখবেন গানের রয়্যালিটির ওপর নির্ভর করে চলার মতো শিল্পী এ দেশে হাতেগোনা কয়েকজন। দেশের পেশাদার শিল্পীর ৯০ শতাংশই স্টেজনির্ভর। তাদের জীবনযাপন হুমকির মুখে তখনই পড়ে যখন স্টেজ শো বন্ধ থাকে; অনেকটা এ সময়ের মতো।’ সালমার এ কথা থেকে বোঝা যায়, গান গেয়ে অঢেল অর্থ-বিত্তের মালকিন বনে যাওয়ার স্বপ্ন না দেখলেও জীবিকার প্রয়োজনে যতটুকু দরকার, সেটি পাওয়ার বিষয়ে কোনো ব্যাঘাত যাতে না ঘটে– সেটি তাঁর চাওয়া। হয়তো এ কারণে তিনি তারকা শিল্পী হয়েও নতুনদের সঙ্গে কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করেন না। এ অনুমান সঠিক কিনা– তা জানতে চাইলে সালমা বলেন, নতুনদের জন্য কাউকে না কাউকে সুযোগ দিতে হবে। আমিও একসময় নতুন ছিলাম। গুণী শিল্পীদের সহযোগিতায় পেয়েছি বলেই আজকের এ অবস্থানে আসতে পেরেছি। তাই শিল্পীর দায়বদ্ধতা থেকেই নতুনদের পাশে থাকি। নতুনদের কেউ যখন আমার সঙ্গে কাজ করতে চায়, তখন কোনোভাবেই তাকে নিরাশ করতে চাই না। বিশেষ করে যারা নিয়মিত সংগীতচর্চা করে যাচ্ছে কিন্তু গানের জন্য প্রতিষ্ঠিত কাউকে সহশিল্পী হিসেবে পাশে পাচ্ছে না। ভালো লাগা এখানেই যে এখন পর্যন্ত যাদের সঙ্গে দ্বৈত গান করেছি, সেই নতুনদের অনেকে গানের ভুবনে সম্ভাবনার ছাপ রাখতে পেরেছেন। একসঙ্গে গান গাওয়া ছাড়া হয়তো তাদের জন্য বেশি কিছু করতে পারিনি। তারপরও যখন তারা জানায়, আমার সঙ্গে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা অন্যরকম আনন্দের ছিল, তখন নিজের মনটাও এক ধরনের ভালো লাগায় সিক্ত হয়।’ সালমার মুখে এমন কথা শুনে বোঝা যায়, তিনি এককভাবে সুদূরের যাত্রী হতে চান না, সঙ্গী করে নিতে চান তাদেরও, যারা সত্যিকার অর্থে তাঁর মতো গানকে হৃদয়ে ধারণ করেন।

Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream