ভালো ফলনেও লাউয়ের দাম নেই, উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম কৃষকদের
ভোর থেকে খেত থেকে লাউ সংগ্রহ করছেন কৃষকেরা। এরপর অটোতে করে সেগুলো নেওয়া হচ্ছে স্থানীয় বাজারে। সেখান থেকে ট্রাকে বোঝাই করে পাঠানো হচ্ছে রাজধানী ঢাকায়। ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকার লাউ এভাবেই পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকার বাজারে। খেত থেকে বাজার—সবখানেই লাউয়ের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে হতাশ কৃষকেরা।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ঢোলোরহাট ইউনিয়নের কৃষক শতাব্দি রায় ১৬ কাঠা জমিতে লাউ চাষ করেছেন। শুরুতে ভালো ফলন ও দাম পেয়ে আশাবাদী হলেও এখন হতাশ তিনি। আগে প্রতিটি লাউ ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি করলেও বর্তমানে খেত থেকেই বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৩ থেকে ৪ টাকায়। এতে উৎপাদন খরচ তুলে লাভের মুখ দেখা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
একই উপজেলার নারগুন ইউনিয়নের কৃষক শরিফুল ইসলাম প্রায় ৩০ কাঠা জমিতে লাউ আবাদ করেছেন। ফলন ভালো হওয়ায় প্রতিদিন খেত থেকে প্রচুর লাউ সংগ্রহ করা হচ্ছে। অটোতে করে স্থানীয় বাজারে আনার পর সেগুলো ট্রাকে তুলে পাঠানো হচ্ছে ঢাকায়। তবে পরিবহন ও শ্রমিকের খরচসহ বিভিন্ন ব্যয় মেটানোর পর লাউ বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত আয় হচ্ছে না তাঁর।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর লাউয়ের ফলন ভালো হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। স্থানীয় বাজারে লাউয়ের স্তূপ জমছে, পাইকারেরা ট্রাকে করে সেগুলো নিয়ে যাচ্ছেন রাজধানীতে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও খেত পর্যায়ে দাম কম থাকায় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকেরা। দূরের বাজারে লাউ পাঠাতে পরিবহন খরচের পাশাপাশি পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
কৃষক সলিম রহমান বলেন, লাউ চাষে বীজ, সার, কীটনাশক, মাচা তৈরি ও শ্রমিকের পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। ফলন ভালো হওয়ায় লাভের আশা করেছিলেন। কিন্তু দাম কমে যাওয়ায় এখন উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
কৃষক হামিদুর ইসলাম বলেন, কয়েক দিন আগেও লাউয়ের দাম তুলনামূলক ভালো ছিল। এখন পাইকারেরা খেতেই কম দাম বলছেন। অন্যদিকে, দূরের বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে গেলে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামেই লাউ বিক্রি করতে হচ্ছে।
রাজাগাঁও ইউনিয়নের কৃষক খাদিজা বেগম বলেন, সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি আয়ের আশায় লাউ চাষ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে লাভ তো দূরের কথা, বিনিয়োগের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়েই শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম জানান, এ বছর জেলায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হেক্টর জমিতে লাউয়ের আবাদ হয়েছে। ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমে থাকতে পারে। কৃষকদের উৎপাদন পরিকল্পনা ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষকদের প্রত্যাশা, উৎপাদিত লাউয়ের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁদের মতে, কৃষক সমবায়ের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, সংরক্ষণাগার স্থাপন এবং পাইকারি ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমবে।
খেত থেকে অটো, অটো থেকে ট্রাক—এভাবেই ঠাকুরগাঁওয়ের লাউ পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকার বাজারে। কৃষকের উৎপাদিত সবজি যাচ্ছে দূরের ক্রেতাদের কাছে, কিন্তু সেই বিক্রির সুফল কতটা পাচ্ছেন উৎপাদকেরা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ভালো ফলন সত্ত্বেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। বরং উৎপাদন খরচ তুলতে না পারার শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।