চীনকে মোকাবিলায় নতুন গুপ্তচর কর্মসূচি চালু করছে পেন্টাগন
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগন চীনসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক লড়াই জোরদার করতে নতুন একটি শক্তিশালী গুপ্তচর কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় গোয়েন্দারা গভীর গোপনীয়তা বজায় রেখে কাজ করবেন। পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত অন্তত ছয়জন কর্মকর্তা মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টকে এ তথ্য জানিয়েছেন।নতুন এই কর্মসূচিতে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী কিংবা কর্মকর্তা হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেবেন। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্ক রয়েছে, তা সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে। পেন্টাগনের বৃহত্তর অর্থনৈতিক যুদ্ধকৌশলের অংশ হিসেবেই এই গোপন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।‘নন-অফিশিয়াল কভার অফিসার্স’ (এনওসি) নামে পরিচিত এই কর্মসূচির দায়িত্বে রয়েছেন টম রাকুসান। সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ)-তে ৩৯ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্টিভ ফেইনবার্গের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।২০২১ সালে সিআইএ থেকে অবসর নেন রাকুসান। এর আগে ২০১৭ সালে তিনি সংস্থাটির শীর্ষ পর্যায়ের গোয়েন্দা পরিচালনা-সংক্রান্ত পদ ‘ডেপুটি ডিরেক্টর অব অপারেশনস’-এ উন্নীত হন। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিআইএর নেওয়া কার্যক্রমেও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
সিআইএ ছাড়ার পর রাকুসান ফেইনবার্গের সহ-প্রতিষ্ঠিত প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম সারবেরাস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টে যোগ দেন এবং ২০২৫ সালে ফেইনবার্গের সাথে পেন্টাগনে আসেন। পেন্টাগনের বিভিন্ন সামরিক শাখা, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারির কার্যালয়ের বিশেষজ্ঞ এবং সিআইএ-এর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এই উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে কর্মসূচিটি এখনও পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হয়নি। পেন্টাগনের ঠিক কোথায় এই ইউনিটের অবস্থান হবে তা এখনও অস্পষ্ট। এটি একটি স্বতন্ত্র বা নতুন ‘ডিপ-কভার’ ইউনিট হতে পারে, অথবা পেন্টাগনের বিদ্যমান গোপন মানব-গোয়েন্দা (HUMINT) সংগ্রহ ক্ষমতার সম্প্রসারণ হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন অর্থনৈতিক যুদ্ধকে রাষ্ট্র পরিচালন বা কূটনীতির একটি মূল হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা শুল্ক আরোপ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের মূল উপাদানগুলোকে সুরক্ষিত করতে বেসরকারি মূলধনের সাথে সমন্বয় নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে এক বক্তৃতায় সিআইএ-এর ডেপুটি ডিরেক্টর মাইকেল এলিস জানান, যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বায়োটেকনোলজি এবং উন্নত সেমিকন্ডাক্টরের মতো ক্ষেত্রগুলোতে সক্রিয় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রধান চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর নজরদারি করলেও, সিআইএ-র অগ্রাধিকার পরিবর্তনের কথা এভাবে প্রকাশ্যে তুলে ধরা কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার জন্য বিরল ঘটনা।
এলিসের আগে সিআইএ-এর ডেপুটি পদে থাকা ডেভিড এস কোহেন ফরেন অ্যাফেয়ার্সে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে এক ধাপ এগিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি লেখেন, অর্থনৈতিক গোয়েন্দা তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার দীর্ঘদিনের নিয়ম ভেঙে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব কোম্পানি উন্নত প্রযুক্তিতে কাজ করছে, তাদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখতে এসব তথ্য শেয়ার করা উচিত। এক সাক্ষাৎকারে কোহেন বলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর ধরে অর্থনৈতিক সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করছি। মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে আমাদের দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা উচিত নয়।’ তবে পক্ষপাতিত্ব বা দুর্নীতি রোধে কোন কোম্পানি এই সুবিধা পাবে, তা তদারকির ব্যবস্থা রাখতে হবে বলে জানান তিনি। কোহেন আরও জানান, পেন্টাগনের এই এনওসি উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।
পেন্টাগনের অর্থনৈতিক যুদ্ধ সংক্রান্ত কিছু কার্যক্রম প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। ফেইনবার্গ চলতি বছর একটি ‘ইকোনমিক ডিফেন্স ইউনিট’ (ইডিইউ) গঠনের ঘোষণা দেন। ঊর্ধ্বতন পেন্টাগন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক স্মারকে ফেইনবার্গ উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক উপায়ের মাধ্যমে শত্রুপক্ষকে বাধা দেওয়া, তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ করা ও পরাস্ত করাই এই ইউনিটের লক্ষ্য। ডিফেন্সস্কুপ প্রথম এই স্মারকটির কথা প্রকাশ করে।
ফেইনবার্গ সারবেরাসের প্রাক্তন সহকর্মী ও পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জর্জ কলিটাইডসকে গত ফেব্রুয়ারিতে ইডিইউর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেন। এই দপ্তরটি ইতোমধ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক খনি ও শোধনাগারগুলোতে শত শত মিলিয়ন ডলারের সরকারি বিনিয়োগের কথা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে একটি চুক্তিতে পেন্টাগনের ৭৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যবহার করে ব্রাজিলের বিরল মৃত্তিকা খনিজের একটি বড় আমানত সুরক্ষিত করা হয়েছে।
পেন্টাগনের এই প্রকাশ্য অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি রাকুসান গোপনে এই গোপন গোয়েন্দা শাখা গড়ে তোলার বিষয়টি তদারকি করছেন।
পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত একাধিক ব্যক্তি জানান, একসময় এই ইডিইউ-কে গোপন ইউনিটের সম্ভাব্য ঘাটি হিসেবে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু ইডিইউ এবং এর বিনিয়োগ নিয়ে গণমাধ্যম ও কংগ্রেসের অতিরিক্ত নজরদারি তৈরির কারণে সেই চিন্তা বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে ফিরে এলে এই নজরদারি আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত কয়েক দশকে সিআইএ-এর এনওসি কর্মসূচির উত্থান-পতন ঘটেছে। বিশাল পরিকল্পনা করা হলেও অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা তরুন কর্মকর্তাদের ঠিকমতো পরিচালনা করতে না পারার ব্যর্থতায় এসব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। ২০০০-এর দশকে কংগ্রেসের ইন্টেলিজেন্স কমিটির সমর্থনে ‘গ্লোবাল ডেপ্লয়মেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ নামে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তড়িঘড়ি করে বড় আকারের এনওসি তৈরির চেষ্টা এবং তদারকির অভাবে বিষয়টি চরম ব্যর্থতায় রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত অনেক তরুণ এনওসি সিআইএ-র মূল ভবনে ফিরতে অথবা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন।
গভীর ছদ্মবেশী স্পাই বা গোয়েন্দা পাঠাতে গিয়ে প্রতিরক্ষা দপ্তরকেও দীর্ঘদিন ধরে নানা লড়াই করতে হয়েছে। ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) এবং জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড (জেএসওসি) বাণিজ্যিক ছদ্মবেশে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করলেও ফলাফল মিশ্র ছিল। ৯ / ১১ পরবর্তী সময়ে এমনই এক ঘটনায় আফ্রিকার এক দুর্গম এলাকায় জেএসওসির কয়েকজন এনওসি সদস্য একটি খনি কোম্পানির কর্মী হিসেবে ছদ্মবেশ ধারণ করেন। কিন্তু সেখানে কিছু ভূতত্ত্ববিদ ও প্রকৌশলীর মুখোমুখি হলে তারা ধরা পড়ে যান, কারণ খনি বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা ছিল না।
সেবার তারা কোনোমতে উদ্ধার পেলেও, পরবর্তীতে জেএসওসি তাদের বাণিজ্যিক ছদ্মবেশী অফিসারদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর সংক্ষিপ্ত কোর্স ও প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ স্কুলে পাঠাতে শুরু করে। সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, পেন্টাগনের জন্য ডিপ-কভার স্পাইিং পরিচালনা বেশ চ্যালেঞ্জিং। সামরিক বাহিনীর সার্ভিস রেকর্ড পুরোপুরি মুছে ফেলা কঠিন। তাছাড়া বর্তমান বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ও ডিজিটাল তথ্যের কারণে ছদ্মনামে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি, পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের সামরিক চালচলন ও শারীরিক ভাবভঙ্গি সহজেই তাদের পরিচয় প্রকাশ করে দেয়।
এই প্রচেষ্টাটি ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের ক্ষমতার সমীকরণ বদলের বিষয়টিও প্রকাশ করে, যেখানে পেন্টাগন রেকর্ড ১.৫ ট্রিলিয়ন বা দেড় লাখ কোটি ডলার বাজেট চাইছে। সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ বিদেশে উৎস তৈরি ও প্রতিপক্ষের তথ্য চুরির ক্ষেত্রে আরও আক্রমণাত্মক হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, সিআইএ এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান চালাতে দ্বিধাগ্রস্ত, সেখানে পেন্টাগন বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। সাবেক এক জ্যেষ্ঠ সিআইএ কর্মকর্তা এই বিষয়ে মন্তব্য করেন, পেন্টাগনের কাছে ‘প্রচুর অর্থ, আইনি ক্ষমতা এবং সক্ষমতা রয়েছে। ঈশ্বর তাদের মঙ্গল করুন।’