শ্যামনগর( সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি :
সকাল হলেই বের হতে হয় গ্রাম গঞ্জে। মেঠো পথ, নয়তো আধা পাকা, নয়তো পিচ ঢালা রাস্তা পায়ে হেঁটে অলিতে গলিতে ঘুরে ঘুরে সবাইকে জানান দেওয়া হয় পুকুর বা জলাশয়ে হারিয়ে যাওয়া গহনা সোনা, রুপা খুঁজে দেওয়া তার কাজ।
নাম তার নাজিম মাহমুদ। বয়স ৪০ বছর। মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার গোয়ালিমান্দ্রা গ্রামের মর্তুজা আলীর ছেলে তিনি। বর্তমানে সাতক্ষীরার শ্যামনগর -কালিগঞ্জ উপজেলার সংযোগ মৌতলা এলাকায় ছোট ঘর তৈরী করে বাস করছেন। সাধারণত তাদেরকে বেদে সম্প্রদায়ের একজন মানুষ হিসাবে দাবী করেন।
বাপদাদার চৌদ্দ পুরুষের পেশাকে তিনি নিজেও পেশা হিসাবে বেঁছে নিয়েছেন। তবে নিজের ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া শিখে কোন একটি কাজ করে আয় করা। সে হিসাবে এসএসসি পাশ করে কলেজে ভর্তি হলেও অর্থাভাবে লেখাপড়া করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে পিতার নির্দেশে বাপদাদার পেশাকে নিজে পেশা হিসাবে বেছে নিয়ে ২০০৬ সাল থেকে হারিয়ে যাওয়া গহনা সোনা, রুপা খুঁজে দেওয়ার কাজটি শুরু করেন।
নাজিম মাহমুদ বলেন কাজটি শুরুর আগে তার প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। একাজের গুরু হিসাবে প্রথম ছিলেন তার বোন জামাই মোঃ রাহিন। এর পর থেকে একা একা নিজ এলাকা বাদে বাংলাদেশের অন্যান্য জেলায় পথে প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে হারিয়ে যাওয়া গহনা সোনা, রুপা খুঁজে দেন। এক এক সময় এক একটি জেলায় থেকে কাজটি করেন। তিনি বলেন খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, রায়েন্দা, মংলা, বরগুনা, আমতলী, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা সহ অন্যান্য এলাকায় এই কাজটি করার জন্য ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি বলেন বেদে সম্প্রদায় যারা এই কাজটি করেন তারা সাধারণত এলাকা ভাগ করে নেন কাজের মাধ্যমে আয়ের সুবিধার্তে।
একটি সোনার কানের দুল পুকুর বা জলাশয়ে হারিয়ে গেলে সেটি যদি তিনি খুঁজে পেয়ে যান মজুরী হিসাবে সোনার দুলের ওজনের উপর নির্ভর করে মজুরী ধার্য করেন। সাধারণত ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার কম মজুরী হয়না। হারানো রৌপ্য পাওয়া গেলে একই ভাবে মজুরী ধার্য করেন। হারানো জিনিষের মূল্যের শতকরা হিসাবে মজুরী নির্ধারণের চেষ্টা করেন। অনেক সময় পছন্দের জিনিসটি পাওয়া গেলে খুশি হয়ে আবার বেশি টাকাও দেন অনেকে। এভাবে দিন চলে নাজিম মাহমুদের। কোন মাসে ১০ হাজার, কোন মাসে ১৫ হাজার বা তার চেয়ে বেশি টাকাও আয় করেন বলে জানান। পূর্বে এ পেশায় আয় বেশি হত।
সোনা,রুপা খোঁজার কাজে যে উপকরণ ব্যবহার করেন সেটি হল শক্ত লাঠির মাথায় একটি চিরুনির মত লোহার আঁচড় ও একটি টিনের হুঁচা। খোঁজা খুঁজির প্রথম পর্যায়ে যে ব্যক্তির সোনা বা রুপার গহনা হারিয়ে তার কথার উপর ভিত্তি করে পুকুরের সেস্থানে নেমে পড়েন। এর পর আঁচড়া দিয়ে সেস্থানের চারপাশ থেকে নরম কাদা-মাটি থেকে শুরু করে যত আবর্জনা আছে সব গুলি তুলে এনে হুঁচায় ফেলে পরিস্কার করে খুঁজতে থাকেন। এভাবে খুঁজতে খুঁজতে পাওয়া যায় সেই কাঙ্খিত সোনা বা রুপার গহনা। একবার এক স্থানে একটি হারানো গহনা পাওয়া গেলে তার প্রতি মানুষের এরকম আস্থা এসে যায় এভাবে ঐ এলাকায় তার পরিচিতিও বেড়ে যায়। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে তিনি নিজে তার ০১৯৭৬৯১২৩৯৯ মোবাইল নম্বরটি লিখে রেখে আসেন বিভিন্ন দেওয়ালে বা দর্শনীয় স্থানে।
নাজিম মাহমুদ বলেন দিনে দিনে পুকুর ভরাট হওয়া, বাড়ির ভিতর বা ওয়াশরুমের মধ্যে গোসল করার প্রবনতা বেড়ে যাওয়ায় এই পেশা থেকে আয় কমে গেছে। পুকুর কমে যাওয়ায় আগের মত সোনা, রুপা হারায় না। এছাড়া স্বর্নের দামও বেড়ে যাওয়ায় স্বর্নের ব্যবহারও কমে গেছে বা যাচ্ছে। এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষের হারানো সোনা, রুপা খুঁজে পেয়েছেন বলে জানান।
কাজটিতে ঝুঁকিও রয়েছে বলে জানান। ঝুঁকি হিসাবে তিনি বলেন পানিতে জোঁক থাকে অনেক স্থানে, পুরানো ভাঙ্গা পাকা বা কাঠের পুকুর ঘাটে সোনা, রুপা খুঁজতে যেয়ে হাত,পা আঘাত সহ কেটে যেতে পারে। পুকুরে পানি বেশি হলে বার বার ডুব দিতে যেয়ে চোখের কানের ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা থাকে। গ্রামে গ্রামে পায়ে হেঁটে পথ চলতে হয় ক্লান্তি অনুভূব হয়।
এ পেশায় বর্তমানে টিকে থাকা সম্ভব নয় বলে জানান। এখন আয় কমে গেছে আগের তুলনায় অনেক কম। ফলে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নাজিম মাহমুদ যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন বেদে সম্প্রদায় সহ এ পেশাকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি বেসরকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরী।

