বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শুক্রবার পদত্যাগ করতে পারেন। সংস্থাটির দাবি, চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে অবস্থানরত জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ দেশে ফিরলেই তার কাছে স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র জমা দেবেন রাষ্ট্রপতি।
রয়টার্সের বৃহস্পতিবার রাতের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব সারওয়ার আলমও রয়টার্সকে জানিয়েছেন, স্পিকার দেশে ফেরার পর রাষ্ট্রপতি তার পদত্যাগপত্র জমা দেবেন।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কার্যকর হয় স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরিত পত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে। এ কারণে স্পিকারের দেশে ফেরাকে ঘিরে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে জল্পনা আরও বেড়েছে।
সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসার জন্য ১৯ জুলাই ব্যাংককে যাওয়া স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের ২৬ জুলাই দেশে ফেরার কথা থাকলেও তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই শুক্রবার দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরতে পারেন।
রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের বিষয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত রয়েছেন। তাদের একজনের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার বঙ্গভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বিদায়ের প্রস্তুতির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির ওপর পদ ছাড়ার চাপ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র দাবি করেছে। সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথাও বলেছিলেন। যদিও রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব পদত্যাগের সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি।
এরই মধ্যে বুধবার সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের সঙ্গে ওই বৈঠকের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অন্যদিকে সরকার-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে, বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকেও রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি চাইলে পদত্যাগ করতে পারেন, তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিধান রয়েছে। এছাড়া ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। আর ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।
রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের খবর সামনে আসার পর নতুন রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্রে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও আবদুল মঈন খানের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছে। এছাড়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন জ্যেষ্ঠ সচিব এবং একজন সাবেক সচিবের নামও ঘুরছে। তবে এসব বিষয়ে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত থাকার কথা। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই তাকে ঘিরে নানা ধরনের রাজনৈতিক আলোচনা চলছিল।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান দমনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হওয়ার তথ্য জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ এবং দলটির অনেক নেতা-কর্মী কারাগারে অথবা আত্মগোপনে রয়েছেন।
এদিকে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জামালপুরে এক অনুষ্ঠানে পদত্যাগ নয়, রাষ্ট্রপতির গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো জানা যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত সাংবিধানিক হলেও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এর গুরুত্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফলে স্পিকার দেশে ফেরার পর যদি রাষ্ট্রপতি সত্যিই পদত্যাগপত্র জমা দেন, তাহলে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হবে।

