যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতার পরও ইরান তাদের কয়েকটি বিতর্কিত সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় মেরামত ও পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে এমন দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি (আইএসআইএস)। এই অভিযোগ নতুন করে ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্ক এবং যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের পথে না হাঁটার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু চুক্তির অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নির্মাণ ও মেরামতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকদের নজরে এসেছে পারচিন এলাকার একটি সংবেদনশীল স্থাপনা। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, অতীতে এই স্থাপনাটি পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত বিস্ফোরক পরীক্ষার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, হামলায় সৃষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো প্রথমে অস্থায়ীভাবে ঢেকে রাখা হয়। পরে সেখানে আরও স্থায়ী ধরনের সুরক্ষামূলক আবরণ ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এটি মেরামত কার্যক্রমের অগ্রগতির ইঙ্গিত হতে পারে।
আরেকটি আলোচিত স্থান পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন। সমঝোতা স্বাক্ষরের কয়েক দিনের মধ্যেই ধারণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে ওই এলাকার টানেলগুলোর আশপাশে একাধিক যানবাহনের চলাচল দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই তৎপরতা চুক্তির শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
শুধু পারমাণবিক স্থাপনাই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগারেও পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইসফাহান, ফোরদো এবং নাতাঞ্জ—ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো মেরামত কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গত জুনে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা কমানো। এর আওতায় ইরান পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর তত্ত্বাবধানে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি কাঠামো তৈরির বিষয়েও নীতিগতভাবে সম্মত হয়। বিনিময়ে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত কিছু সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টি আলোচনায় ছিল।
তবে চুক্তির পরপরই প্রকাশিত এই স্যাটেলাইট চিত্র নতুন করে অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা কর্মকাণ্ডের সত্যতা নিশ্চিত হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ককে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে এবং ভবিষ্যতের কূটনৈতিক আলোচনাকেও কঠিন করে তুলবে। অন্যদিকে, তেহরানের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর স্বাধীন যাচাইয়ের ওপরই শেষ পর্যন্ত এসব অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে।

