বিধান মন্ডল (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:
ফরিদপুরের প্রধান অর্ধকড়ি ফসলই হচ্ছে পেঁয়াজ। এই জেলার মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ আবাদ হয়ে থাকে সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নে। যুগযুগ ধরে এখানকার কৃষকরা পেঁয়াজ চাষের মাধ্যমে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন করে আসছেন। তবে প্রতিবছরের মতো এবারও বিপুলপরিমাণে পেঁয়াজ আবাদ করে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
একদিকে বাজারে পেঁয়াজের দাম এবারেই নেই। অন্যদিকে সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও বিদ্যুতের ভেলকিবাজির কারণে পেঁয়াজ ঘরেও রাখা যাচ্ছে না, পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় পেঁয়াজ এখন কৃষকের গলার কাটা। তাই কোনো দিক না পেয়ে অনেক কৃষককে দেখা গেছে, তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পেঁয়াজ বস্তা ভরে এনে ডোবার পানিতে ফেলে দিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার একাধিক কৃষকরা জানিয়েছেন, এবার নানা জাতের বিপুলপরিমাণে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। তবে এর মধ্যে বেশিরভাগ হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ আবাদ করা হয়েছে। এই হাইব্রিড পেঁয়াজ কোনোভাবে ঘরে রাখা যাচ্ছে না। এমনকি সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে যে ঘরগুলো তৈরি করে দেওয়া হয়েছে, সঠিকভাবে বিদ্যুত সরবরাহ না থাকায় সেখানেও পেঁয়াজ রাখা যাচ্ছে না। অতিরিক্ত গরম আর সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে। আর বাজারে পেঁয়াজের যে দাম, তাতে উৎপাদন খরচও ঘরে নিতে পারছে না কৃষকরা।
সালথার কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, সরকারি এয়ারফ্লো মেশিন ব্যবহারের পর পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না হওয়ায় প্রায় ৩৫০ মন পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে সেগুলো পুকুরে ফেলতে হয়। দাউদ মাতুব্বর নামে আরেক বলেন, বর্তমানে প্রতিমণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ উৎপাদন খরচই ১৬০০ থেকে ১৭০০ টাকা। সংরক্ষণ ব্যয় যোগ হলে পুরোপুরি লোকসান গুনতে হচ্ছে। আর কৃষক আবুল মাতুব্বর বলেন, কৃষকের এ দুর্দশার কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না। আগামীতে ন্যায্যমূল্য না পেলে পেঁয়াজ চাষ থেকে সরে যেতে বাধ্য হবেন অনেক কৃষক।
কৃষকদের অভিযোগ- সরকারিভাবে দেওয়া এয়ারফ্লো মেশিন অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও কারিগরি সমস্যার কারণে সংরক্ষিত পেঁয়াজ দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে পচনের ঘটনা বাড়ছে বলেও তারা জানান।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকদের সহায়তায় ২০২-৪২৫ অর্থবছরে জেলায় ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছর ইতোমধ্যে ৭০০টি বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও প্রায় আড়াই হাজার মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকরা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না।
তবে কৃষকরা বলছেন, রাত-দিন ২৪ ঘন্টার মধ্যে বিদ্যুত থাকে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘন্টা। এই বিদ্যুত দিয়ে কোনোভাবেই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব না।

