এম.শাহীন আল আমীন, জামালপুর :
নির্মাণ সামগ্রীর গেরান্টিও নেই। ওয়ারেন্টিও নেই। কালবৈশাখি ঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে অনেক শক্ত স্থাপনা তছনছের নজীর আছে। কিন্তু ৭০ বছর ধরে দাড়িঁয়ে থাকা ছবির স্থাপনা একচুলও নড়েনি। তবে বয়সের ভাড়ে নুয়ে পড়েছে। জরাজীর্ণতার দুর্বলতার সুযোগে কীট পতঙ্গ ভাগ বসিয়েছে।
বলছি জামালপুরের বকশীগঞ্জ পৌর শহরের মিয়াপাড়ার বাসিন্দা কবির উদ্দিন ভুষির বসত ঘরের কথা। এনআইডি ছাড়া তার কিছুই নেই। সেটি নিয়েই বুকে ধারণ করছে ভালো কিছুর প্রত্যাশায়। তার সবুরের ভরসা “যার কেউ নেই, তার আল্লাহ আছে”।
এলাকাবাসী সুত্রে জানা গেছে, কবির উদ্দিন ভূসির বর্তমান বয়স ৯৫ বছর। তার স্ত্রীর বয়স ৭০ বছর। জন্ম থেকেই ভ’মিহীন। বকশীগঞ্জ মিয়াপাড়ার মিয়াবাড়ীর একটি ডুবার কোনায় ময়লার বাগারের পাশে ঝুপড়ি ঘরে ৭০ বছর যাবৎ বসবাস করে আসছে। জমির মালিক তারা না। ঝুপড়ির একপাশে দুর্গন্ধযুক্ত পানি। অন্যপাশে ময়লা আবর্জনায় ভরা। জরাজীর্ণ ঝুপড়িতে কীটপতঙ্গও ভাগ বসিয়েছে। তবে বৈরিতা নেই। বাধ্য হয়েই কীটপতঙ্গের সাথে নোংরা পরিবেশে বসবাস করছে। বিদ্যুৎ, টয়লেট ও খাবার পানিরও কোন সুযোগ সুবিধা নেই।
কবির উদ্দিন ভুষি দম্পতির একটি কন্যা সন্তান আছে। বিয়ের পর সেই সন্তান স্বামীর সংসারে চলে গেছে। বর্তমানে বয়োবৃদ্ধ এই দম্পতি কর্মে অক্ষম। আয় করার সক্ষমতা নেই। নেই বসত ভিটা। নেই বসত ঘর। একজনের নামে বয়স্ক ভাতার কার্ড আছে। আরেক জনের ভাগ্যে জুটেনি। অতি কষ্টে অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটছে। খাদ্যের অভাবে একজন কংকালসারে পরিনত হয়েছে। অন্যজনও অচল।
কবির উদ্দিন ভুষি চোখে দেখেনা। কানে শোনে না। অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরাও করতে পারেনা। স্ত্রী নূর জাহানও তাই। একমাত্র কন্যা সন্তানেরও সহায়তা করার সামর্থ নাই। তাই দিন চলা কঠিন। শহরের প্রান কেন্দ্রে বসবাস করলেও দেখার কেউ নেই। মানে প্রদীপের নিচেই অন্ধকার।

কবির উদ্দিন ভুষি বলেন, এনআইডি কার্ড ছাড়া আমার কিছু নেই। মরার আগে একটা ঘর আর তিন বেলা খাবার ব্যবস্থা হলে মরেও শান্তি পাইতাম। কাফনের কাপড় কেনারও সামর্থ নেই। তিনি বলেন, সবুরে মেওয়া ফলে। “যার কেউ নেই তার আল্লাহ আছে”।
কবির উদ্দিন ভুষি স¤্রাট শাজাহান না। কিন্তু স¤্রাট শাহজাহানের স্ত্রীর নামেই কবির উদ্দিন ভুষির স্ত্রীর নাম নূর জাহান। নূর জাহানের জন্য স¤্রাট শাজাহান তাজঁমহল গড়েছেন। কিন্তু কবির ঝুপড়িতেই বসবাস করছে নূর জাহান। নূর জাহান বলেন, ৭০ বছর ধরে অন্যের বাড়ীতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছি। এখনও কাজ কর্ম করতে পারিনা। ভিক্ষাবৃত্তি করার মত শক্তি শরীরে নেই। তাই জীবন চলা কঠিন। নিজের জন্য যত কষ্ট না পাই বৃদ্ধ স্বামী যখন ক্ষুধার জ¦ালায় ছটপট করে তখন থাকতে পারিনা। অনেক কষ্ট হয়। তিনি বলেন, সরকারের অনেক সুযোগ সুবিধা আসে। কিন্তু আমাদের ভাগ্যে জুটেনা। গত ঈদেও একটা স্লিপও কেউ দেয় নাই।

মিয়াপাড়ার বাসিন্দা লিটন সিদ্দিকী বলেন, কবির উদ্দিন দম্পত্তির কিছুই নেই। ৫টি ভাঙ্গা টিনের একটি ছাপড়া ছাড়া তার কোন সম্পদ নেই। আমাদের জমিতে বসবাস করার সুযোগ দিয়েছি। ৭০ বছর যাবৎ বসবাস করে আসছে। সরকারিভাবে একটু জমি, একটি বসত ঘর ও খাবার ব্যবস্থা করলে তাদের অনেক উপকার হবে। আমি মনে করি তাদের দায়িত্ব নেওয়া সরকারের কর্তব্যের অংশ।
সাবেক প্রধান শিক্ষক ও মিয়াপাড়ার বাসিন্দা মাসুমুল হক সিদ্দিকী মাসুম বলেন, আমাদের পারিবারিক জমিতেই তারা বসবাস করছে। কিন্তু তাদের জীবন অনেক কষ্টময়। ভাঙ্গা একটি ছাপড়া। বৃষ্টি এলেইে পানি পড়ে। পুরাতন টিন জরাজীর্ণ হয়ে ফুটু হয়ে গেছে। ঝুপড়ির চারপাশে ময়লা আবর্জনা থাকায় পোকামাকড়ও সেই ঝুপড়িতে বাসা বেধেছে। মাঝে মধ্যে বিষাক্ত সাপও সেখানে আশ্রয় নেই। জীবনের ঝুকিঁ নিয়ে বয়োবৃদ্ধ ও অচল দম্পত্তি বসবাস করে আসছে।
সহকারী কমিশনার(ভূমি) ও বকশীগঞ্জ পৌর প্রশাসক আসমা উল হুসনা বলেন, বিষয়টি কোন জন প্রতিনিধি বা ব্যাক্তি অফিসিয়াল ভাবে জানায়নি। আগে জানলে সরকারি সুযোগ সুবিধা নিয়ে পাশা দাডাঁনো যেতো। এখন অপেক্ষা করতে হবে। পৌর সভা থেকে কোন কিছুর সুযোগ থাকলে করা হবে।

