বাংলা সাহিত্যের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও জনপ্রিয়তম কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি। ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এই সাহিত্য-জাদুকর তাঁর অসামান্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আজও কোটি পাঠকের হৃদয়ে সমানভাবে জীবন্ত।
হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণদিবস উপলক্ষে আজ তাঁর প্রিয় সৃষ্টি নুহাশপল্লীসহ দেশজুড়ে ভক্ত, শুভানুধ্যায়ী ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে নানা স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে।
শৈশবে হুমায়ূন আহমেদের ডাকনাম ছিল ‘কাজল’। জন্মের পর তাঁর বাবা নাম রেখেছিলেন শামসুর রহমান, যা পরবর্তী সময়ে তিনি নিজে পরিবর্তন করে ‘হুমায়ূন আহমেদ’ রাখেন।
একটি সৃজনশীল ও সাহিত্যমনা পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি: শহীদ ফয়জুর রহমান আহমদ ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা ও সাহিত্য অনুরাগী। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পিরোজপুর মহকুমার এসডিপিও হিসেবে কর্মরত অবস্থায় তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে শহীদ হন।
মা আয়েশা ফয়েজ নিয়মিত সাহিত্যচর্চা না করলেও ‘জীবন যে রকম’ শিরোনামে একটি সমাদৃত আত্মজীবনী রচনা করেছিলেন।
তাঁর অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের প্রখ্যাত বিজ্ঞান শিক্ষক ও জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক এবং কনিষ্ঠ ভাই আহসান হাবীব সুপরিচিত রম্যলেখক ও কার্টুনিস্ট।
শিক্ষাজীবন শেষে হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে লেখালেখি এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে সম্পূর্ণ সময় দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি পরবর্তী সময়ে অধ্যাপনা পেশা ছেড়ে দেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি ও নির্যাতনের শিকার হন; এমনকি অলৌকিকভাবে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসেন।
১৯৭২ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশিত হওয়ার পর পরই তা সমকালীন সাহিত্যজগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপর একে একে শঙ্খনীল কারাগার, মধ্যাহ্ন, জোছনা ও জননীর গল্প, দেয়াল, মাতাল হাওয়া এবং গৌরীপুর জংশনের মতো কালজয়ী উপন্যাস উপহার দেন তিনি।
চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্য। তাঁর পরিচালিত আগুনের পরশমণি, শ্যামল ছায়া, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী এবং ঘেঁটুপুত্র কমলা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। আশির দশকে তাঁর রচিত ধারাবাহিক নাটক এইসব দিনরাত্রি তৎকালীন টেলিভিশন দর্শক মহলে তুমুল সাড়া ফেলে। তাঁর সৃষ্ট কালজয়ী কাল্পনিক চরিত্র ‘হিমু’, ‘মিসির আলী’ ও ‘শুভ্র’ আজও তরুণ প্রজন্মের পাঠকদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ হুমায়ূন আহমেদ ১৯৯৪ সালে রাষ্ট্রের অন্যতম বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত হন। এছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮১), লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩ ও ১৯৯৪) এবং বাচসাস পুরস্কারসহ (১৯৮৮) বহু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার লাভ করেন। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে না থাকলেও, তাঁর সৃষ্টিসম্ভার বাংলা সাহিত্যের আকাশে ধ্রুবতারার মতো দীপ্তি ছড়াচ্ছে।

