লেবাননে সম্প্রতি কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতিকে কেবল একটি সাময়িক বিরতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ ঘটনা মনে হলেও, গভীরে তাকালে দেখা যায় এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যের (Balance of Power) এক আমূল পরিবর্তন। এই যুদ্ধবিরতি প্রমাণ করেছে যে, ইজরাইল বা আমেরিকা নয়, বরং এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে কার কথা ‘শেষ কথা’ হবে, সেই রশি টানাটানিতে ইরান নিজের পাল্লা ভারী করতে সক্ষম হয়েছে।
ইজরাইল সরকার এবং তাদের কট্টরপন্থী সমর্থকরা শুরু থেকেই দাবি করে আসছিল যে, লেবানন বা হিজবুল্লাহ কোনোভাবেই যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হবে না। এমনকি আমেরিকার পরবর্তী প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এবং খোদ ট্রাম্পও একে ভিন্ন এক সংঘাত হিসেবে চিত্রায়িত করেছিলেন। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা সব সমীকরণ উল্টে দিয়েছে। ইজরাইল ও আমেরিকার সম্মিলিত ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইরান নিজের শর্তগুলো চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এটি অনেকটা এমন যে, উত্তর কোরিয়ার স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে আমেরিকা তার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের বিপক্ষে অবস্থান নিতে বাধ্য হলো।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো আরব রাষ্ট্র বা জোট আমেরিকার কাছ থেকে দর কষাকষি করে কিছু আদায় করতে পারেনি। ১৯৭৩ সালের তেল অবরোধ ছিল একটি বিচ্ছিন্ন চেষ্টা, যা পরবর্তীতে ওপেকের মাধ্যমে চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে আরবরা মূলত আমেরিকার ‘দাসানুদাস’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কার চেয়ে কে বেশি বিনিয়োগ করতে পারে কিংবা কে কত বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র উপহার দিতে পারে—এই প্রতিযোগিতাই ছিল আরব দেশগুলোর মূল লক্ষ্য।
কিন্তু এবারের লেবানন ইস্যু সম্ভবত ইজরাইল প্রতিষ্ঠার পর প্রথম ঘটনা, যেখানে সরাসরি সামরিক ‘শক্তি’ প্রয়োগের মাধ্যমে আমেরিকা ও ইজরাইলকে সম্মিলিতভাবে মাথা নোয়াতে বাধ্য করা গেছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পেপ-এর মতে, ইরান এখন বিশ্বের চতুর্থ প্রধান শক্তিকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই যুদ্ধবিরতি তারই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো সর্বদা শক্তির উপাসনা করে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইজরাইল যখন আরব শক্তির বিরুদ্ধে একক আধিপত্য দেখিয়েছিল, তখন থেকেই আমেরিকান ফরেন পলিসি ইজরাইলঘেঁষা হয়ে ওঠে। আজ ঠিক একই কারণে ইরান আমেরিকার কাছে গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে।
পরিশেষে, এই যুদ্ধবিরতি যদি স্থায়ী রূপ নেয়, তবে ইরানের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও উষ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ আমেরিকান তাত্ত্বিক ও রাজনীতিবিদরা বুঝতে শুরু করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে উপেক্ষা করে কোনো স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। আমরা সম্ভবত এমন এক সময়ের সাক্ষী হচ্ছি, যেখানে বিনিয়োগ বা তেল নয়, বরং ‘প্রতিরোধের ভাষা’ দিয়ে বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণ নির্ধারিত হচ্ছে।

