মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর এখন শুরু হয়েছে কূটনীতির স্নায়ুযুদ্ধ। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের আগে আলোচনার টেবিলে এখন ঘুরপাক খাচ্ছে শত শত বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব আর পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ। তবে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, মৌখিক আশ্বাসে নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট ‘সমঝোতার রূপরেখা’ চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা নতুন করে আলোচনার পিঁড়িতে বসছে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধে ইরানকে সামরিকভাবে কাবু করতে ব্যর্থ হয়ে এখন প্রলোভনের পথে হাঁটছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছে, তা কার্যত আকাশচুম্বী। ইরান যদি তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়, তবে জব্দকৃত ২২ বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আরও ১৩২ বিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশ পুনর্গঠন কাজের জন্য ইরানকে আরও ২৩৪ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাবগুলো অনেকটা হলিউডি সিনেমার চিত্রনাট্যের মতো, যেখানে অর্থের ঝনঝনানি দেখিয়ে মূল লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হয়। এখানে ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ইরানের ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার খালি করা, যাতে ইসরায়েলের একক আধিপত্য নিরাপদ থাকে।
চুক্তির আলোচনা চলাকালেও ইরান তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী তাসটি হাতে রেখেছে। ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ-অবরোধ না তুলছে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত হবে না। যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বাণিজ্যিক চলাচলের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, কিন্তু ট্রাম্পের ‘অতিরিক্ত দাবির’ মুখে আইআরজিসি এখন প্রণালি পার হওয়া যেকোনো নৌযানকে ‘শত্রুর সহযোগী’ হিসেবে দেখার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। আইএইএ (IAEA)-এর তথ্যমতে, ইরানের কাছে বর্তমানে ২ হাজার কেজি ইউরেনিয়াম আছে, যার মধ্যে ৪৫০ কেজি অত্যন্ত উচ্চ ঘনত্বের। এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দ্রুতই পারমাণবিক বোমায় রূপান্তর করা সম্ভব। কার্যত এই সামরিক সক্ষমতাই ওয়াশিংটনকে বাধ্য করেছে পাকিস্তানের মাধ্যমে তেহরানের দরজায় বিশাল অংকের প্রস্তাব পাঠাতে। ইরান জানে, এই ইউরেনিয়ামই তাদের নিরাপত্তার ঢাল; এটি হাতছাড়া করা মানেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি আধিপত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করা।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহর বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তারা মার্কিন প্রস্তাবগুলো মূল্যায়ন করছে ঠিকই, কিন্তু ‘অতিরিক্ত দাবি’ বা সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয় এমন কিছুতে সায় দেবে না। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী নৌ-অবরোধ বহাল রেখে ইরানকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা সফল হবে কিনা, তা নির্ভর করছে দ্বিতীয় দফার বৈঠকের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর এই বিশাল অংকের অনুদানের প্রস্তাবকে বিশ্লেষকরা ‘গরু মেরে জুতো দান’ হিসেবে দেখছেন। ইরান কি শত বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে তাদের পরমাণু স্বপ্ন বিসর্জন দেবে, নাকি হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে নিজেদের শর্তে বিশ্বকে চলতে বাধ্য করবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে তেহরানের অনড় অবস্থান বলছে, তারা কোনো হলিউডি চিত্রনাট্যের ফাঁদে পা দিতে রাজি নয়। শেষ পর্যন্ত এই অসম লড়াইয়ের টার্মগুলো ইরানই নির্ধারণ করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

