এম.শাহীন আল আমীন,জামালপুর জেলা প্রতিনিধি :
গ্রামের নাম বাশঁকান্দা। শত বছরের প্রাচীন নাম। পূর্ব নাম ছিলো জানকিপুর। জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার নীলাক্ষিয়া ইউনিয়নে গ্রামটি অবস্থিত। উপজেলা শহর থেকে দুই কিলো মিটার দুরে। এই গ্রামের মানচিত্র দিয়েই জামালপুর-বকশীগঞ্জ মহাসড়ক।
প্রবীনদের ধারনা নীলাক্ষিয়া ইউনিয়নের অন্যান্য গ্রামের চেয়ে ভৌগরিকভাবে উচু ও সমতল ভুমি। গ্রামীণ ভাষায় যাকে বলে কান্দা। উচুঁ বা কান্দা এলাকায় বাশঁ চাষের জন্য উপযুক্ত। বাশঁকান্দায় দোআশঁ ও বেলে দোআশঁ মাটির প্রভার বেশি। এ রকম মাটিতে উন্নত জাতের বাশেঁর জন্ম হয়। তার কারনেই গ্রামের নাম রাখা হয় বাশঁকান্দা। এর বাসিন্দাদের জীবন যাত্রার মান স্বাভাবিক। নি¤œ আয়ের মানুষের সংখ্যা বেশি।
গ্রামবাসী সূত্রে জানা গেছে, বাশঁকান্দা গ্রামে ভোটার সংখ্যা ২ হাজারের কাছাকাছি। লোক সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। এ গ্রামে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। তাই শিক্ষার হার কম। বাশঁকান্দা গ্রামের মাটি বাশেঁর জন্য উপযোগী। এখানে উন্নত জাতের বাঁশ জন্মে থাকে। বাশেঁর বৃদ্ধিও হয় তাড়াতাড়ি। গ্রামের সিংহভাগ পরিবারের সদস্যদের প্রধান পেশা বাশঁ নির্ভর জিনিসপত্র তৈরি করা। বংশানুক্রমেই তারা বাশঁ শিল্পের নিপুন কারিগর। নারী,পুরুষ, কিশোর, কিশোরী সবাই বাশঁ দিয়ে কুলা, চালুন, ঝাটা, খাচা, ডুল, কাঠা, মুনকা, মাচাঁর দমরা, সিলিং, ধারাই, মাছ ধরার বরচিনা, পলো, খালই, ফুলের টপ ইত্যাদি জিনিসপত্র তৈরির কাজে ব্যাস্ত থাকে। প্রথমে বাঁশ থেকে বিশেষ কায়দায় তেওয়াল এবং তেওয়াল থেকেই সব কিছু তৈরি করা সম্ভব হয়।
ধানের মওসুমে বাশেঁর তৈরি কুলা, চালুন, ডুল, বের, বিছন ও ধারাইসহ নানা জিনিসপত্রের চাহিদা বাড়ে। এ সময় ওই সকল জিনিসপত্র বেশি বিক্রি হয়। চাহিদা বাড়ে। দামও পায় ভালো। তাই আগে থেকেই তৈরি করে মজুদ রাখে কারিগররা। বর্ষাকালে মাছ ধরার বরচিনা, পলো, খালুই, বানা, বুরুংগাসহ বাশেঁর তৈরি মাছ ধরার নানা পন্যের চাহিদা বাড়ে। তাই সময় বুঝেই কারিগররা ওই সকল জিনিসপত্র তৈরিতে ঝুঁকে পড়ে। বাশঁ এবং বাঁশ নির্ভর পন্যই নামের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
এছাড়াও গবাদী পশু পালন, কুষি কাজ ও ক্ষুদ্র ব্যবসা করেও জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। হলুদ ও কাঠালের জন্যও সুপরিচিত বাঁশকান্দার নাম। বাশঁকান্দা গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়ে জামালপুর-বকশীগঞ্জ মহা সড়ক। কিন্তু এ গ্রামের অভ্যন্তরিন সকল রাস্তা কাঁচা।
বাঁশকান্দা গ্রামের বাসিন্দা মনিরুজ্জামান লিমন বলেন, আগের চাইতে বাশেঁর তৈরির জিনিসপত্রের চাহিদা কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। কারণ প্লাস্টিক কোম্পানি গুলো কুলা, চালুন, ঝাটা ও পাখাসহ সব কিছু তৈরি করে বাজারজাত করছে। এর যথেষ্ট প্রভাব পড়ছে বাঁশ শিল্পে। পরিবেশ বান্ধব বাঁশ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারিভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।
নীলাক্ষিয়া ইউনিয়নের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বাশঁকান্দার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম লিচু বলেন, বাশেঁর কারণেই গ্রামের নাম করণ করা হয় বাশঁকান্দা। এ গ্রামের ৯০ ভাগ মানুষ বাশঁ নির্ভর জিনিসপত্রের কারিগর। প্রশিক্ষন পেলে তারা আরও দক্ষ হয়ে উঠবে। বাশেঁর উৎপাদনও বাড়বে। বানিজ্যিকভাবে বাশঁ চাষ করার সুযোগ পাবে। মানসম্মত বাশঁ হওয়ার কারণে বিভিন্ন জেলার মানুষ বাশঁ কেনার জন্য এ গ্রামে আসে। প্রশিক্ষন ও আর্থিক সহায়তা পেলে এ গ্রামে বাশঁ শিল্পের প্রসার ঘটার উজ্জল সম্ভাবনা রয়েছে।
নীলাক্ষিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রবীন ব্যাক্তিত্ব হাবিবুর রহমান হবি বলেন, আগে এ গ্রামে অনেক বড় বড় ও মোটা মোটা বাশঁ প্রাকৃতিক ভাবেই জন্ম নিতো। বাশঁকে কেন্দ্র করেই গ্রামের নাম রাখা হয় বাশঁকান্দা। বাশঁকান্দা শত বছরের প্রাচীন নাম। তিনি এই গ্রামে বাশঁ নির্ভর একটি প্রশিক্ষন কেন্দ্র
স্থাপনের দাবি জানান।

