২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে নবনির্মিত ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ আগামী ৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হচ্ছে। উদ্বোধনের দিন থেকেই জাদুঘরটি দেশের সর্বস্তরের সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়ার জোরালো পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।
গতকাল বুধবার (১ জুলাই ২০২৬) সচিবালয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উদযাপন এবং ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বিশেষ প্রস্তুতি সভায় এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
সভাশেষে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব সাংবাদিকদের জানান, ৫ আগস্টের মহাসমাবেশ ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো দিনরাত কাজ করে শেষ পর্যায়ের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করে এনেছে।
জাদুঘরের বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, মূল প্রদর্শনীর জন্য ঐতিহাসিক উপকরণ সংযোজন, সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারকরণ, দর্শনার্থী প্রবেশ-বাহির ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক ডিজিটাল কনটেন্ট স্থাপনের কাজ এখন একদম শেষ প্রান্তে রয়েছে।
ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও স্বৈরাচার পতনের অম্লান স্মৃতিবিজড়িত এই জাদুঘরে নিপুণভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে আন্দোলনের নানা ঐতিহাসিক দলিল:
আলোকচিত্র ও ভিডিওচিত্র: আন্দোলন চলাকালীন গণমাধ্যমের ক্যামেরায় এবং সাধারণ মানুষের মোবাইলে ধারণ করা অভূতপূর্ব আলোকচিত্র, ভিডিও ফুটেজ ও দুর্লভ ভিডিওচিত্র।
সংবাদপত্র ও দলিল: বিপ্লবের দিনগুলোতে দেশি-বিদেশি সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদন, সম্পাদকীয় এবং আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র।
শহীদদের স্মারক: আন্দোলনের সম্মুখসমরে শহীদ ও গুরুতর আহত বীরদের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত স্মারক, রক্তভেজা পোশাক, ডায়েরি এবং তাঁদের স্মৃতিবিজড়িত জিনিসপত্র।
ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড: রাজপথে শিক্ষার্থীদের বুক টান টান করে দাঁড়িয়ে থাকার সময় হাতের স্লোগান সংবলিত বিভিন্ন ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন এবং গ্রাফিতির ডিজিটাল রেপ্লিকা।
ডিজিটাল ডিসপ্লে ও আর্কাইভ: মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্দোলনের প্রতিটি দিনের ঘটনাপ্রবাহ, টার্নিং পয়েন্ট এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার অডিও-ভিডিও শো। এছাড়া গবেষকদের জন্য রাখা হয়েছে একটি তথ্যসমৃদ্ধ সমৃদ্ধ ডিজিটাল আর্কাইভ।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী—এই জাদুঘরটি কেবল অতীতের কোনো করুণ ঘটনার স্মৃতিচারণের স্থান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং জুলাই আন্দোলনের অবিনাশী ইতিহাস, ছাত্র-জনতার চরম আত্মত্যাগ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে বর্তমান ও আগামী নতুন প্রজন্মের কাছে প্রেরণা হিসেবে জীবন্ত ও অক্ষুণ্ণ রাখার একটি অন্যতম জাতীয় কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এই জাদুঘরটি উদ্বোধনের একাধিক সাময়িক তারিখ ঘোষণা করা হলেও নানাবিধ কারিগরি, তথ্য যাচাই ও প্রশাসনিক কারণে তা চূড়ান্ত রূপ পায়নি। অবশেষে সব জটিলতা কাটিয়ে আগামী ৫ আগস্ট (বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির ঐতিহাসিক দিনে) এই জাতীয় স্মৃতি জাদুঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।

