সবচেয়ে অন্ধকার রাতও নতুন সকালের আগমনকে রুখতে পারে না—গাযার ফিলিস্তিনিরা আজ যেন এই সত্যেরই জীবন্ত প্রমাণ। চারিদিকে ইসরায়েলি বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব, বোমাবর্ষণ আর গণহত্যার মধ্যেও এক অদম্য মানবিক মিরাকল বা অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে ফিলিস্তিনের মানুষ। সম্প্রতি মিডল ইস্ট আইয়ের সাথে এক পডকাস্টে এই বিস্ময়কর ও চোখ খুলে দেওয়ার মতো তথ্য শেয়ার করেছেন বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ এবং প্যালেস্টিনিয়ান মেডিক্যাল রিলিফ সোসাইটির প্রধান ডাঃ মোস্তফা বারগুথি।
ডাঃ বারগুথি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনিদের দুটি বৈশিষ্ট্য কোনোদিনই বুঝতে পারে না। প্রথমটি হলো—দশকের পর দশক সব ধরনের অমানবিক অবরোধ ও প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও কীভাবে ফিলিস্তিনিরা শিক্ষা-দীক্ষায় এতটা উন্নত। আর দ্বিতীয়টি হলো—এত মৃত্যু, এত রক্তপাত আর ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যার পরেও কীভাবে তারা মানসিকভাবে এত দৃঢ় ও অবিচল!
তিনি গাযায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিনগুলোর এক অভূতপূর্ব লড়াইয়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “গাযায় গণহত্যা শুরু হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় আমরা কী করেছি, আপনি জানেন? ইসরায়েল যখন হসপিটালগুলোতে বম্বিং শুরু করে, তখন আমাদের অন্যতম প্রধান প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় গাযার গর্ভবতী মায়েদের এবং তাদের অনাগত শিশুদের রক্ষা করা। সেই চরম সংকটের মাঝেই আমরা গাযায় ৯০ জন ধাত্রী (মিডওয়াইফ) নিয়োগ করি।”
এরপর তিনি যে পরিসংখ্যানটি তুলে ধরেন, তা একাধারে বেদনাদায়ক এবং অবিশ্বাস্য রকমের অনুপ্রেরণাদায়ী। ডাঃ বারগুথি বলেন, “ইসরায়েল গত দুই বছরে গাযায় ২২ হাজার নিষ্পাপ শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, এটি চরম সত্য। কিন্তু তারা আমাদের থামাতে পারেনি। কারণ, এই একই সময়ে আমাদের সেই বীর ধাত্রীদের হাত ধরে গাযার মায়েরা ৮২ হাজার নতুন শিশুর জন্ম দিয়েছেন! মৃত্যুর উপত্যকায় দাঁড়িয়েও আমরা জীবনের জয়গান গেয়েছি।”
ইসরায়েলি বাহিনী গাযার চিকিৎসা ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে কোনো কমতি রাখেনি। তারা ফিলিস্তিনিদের প্রায় সবগুলো হসপিটালে বম্বিং করেছে। একেকটি হসপিটাল তারা দুইবার, তিনবার করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। কিন্তু অদম্য ফিলিস্তিনি চিকিৎসাকর্মীরা প্রতিবারই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে হসপিটালগুলো আবার চালু করেছেন। ভবন ধ্বংস হয়েছে, চিকিৎসার আধুনিক ইকুইপমেন্টের চরম ঘাটতি তৈরি হয়েছে, কিন্তু তাদের সেবার মানসিকতা এক চুলও দমাতে পারেনি দখলদার বাহিনী।
ডাঃ মোস্তফা বারগুথি মনে করিয়ে দেন, গাযাবাসীর এই যে অদম্য জীবনস্পৃহা, অসীম ধৈর্য্য আর অবিচল দৃঢ়তা—এটা কোনো সাধারণ বিষয় নয়, এটি একটি জীবন্ত মিরাকল। আর ফিলিস্তিনিদের এই আত্মিক শক্তি ও জীবনের প্রতি ভালোবাসা ইসরায়েলিরা কোনোদিনও অনুধাবন করতে পারবে না।

