কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস মিলছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দাবি করছে, অনেক কাজ ভবিষ্যতে পুরোপুরি এআইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে, আবার কিছু ক্ষেত্রে এটি মানুষের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। তবে একই সঙ্গে কর্মীসংখ্যা কমিয়ে পরিচালন ব্যয় হ্রাস করাও অনেক প্রতিষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
করপোরেট দুনিয়ায় এখন নতুন একটি ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে—অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে ‘এআই এজেন্ট’ ব্যবহার। এসব ভার্চুয়াল সহকারী নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করতে পারে, এমনকি কিছু জটিল ও দক্ষতানির্ভর কাজও সম্পন্ন করার সক্ষমতা অর্জন করছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন জনবল নেওয়ার পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের দিকে ঝুঁকছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর এই পূর্বাভাসের অর্ধেকও যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে প্রায় সব পেশা ও শিল্পখাতেই এর প্রভাব পড়বে। নোবেলজয়ী কয়েকজন অর্থনীতিবিদ ইতোমধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, এআই যেন মানুষের জীবনমান উন্নত করার পাশাপাশি ব্যাপক বেকারত্ব সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে এখনই বৈশ্বিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব সফটওয়্যার খাতে
এআইয়ের সক্ষমতা যাচাইয়ের বিভিন্ন সূচক বলছে, কয়েক বছর আগেও বড় ভাষাভিত্তিক মডেলগুলো (এলএলএম) মানুষের কয়েক মিনিটের কাজ সম্পন্ন করতে পারত। কিন্তু বর্তমানে এসব প্রযুক্তি ঘণ্টাব্যাপী জটিল কাজও দক্ষতার সঙ্গে করতে পারছে।
বর্তমানে উন্নত এআই মডেলগুলো সফটওয়্যার কোড বিশ্লেষণ, ত্রুটি শনাক্তকরণ, আর্থিক বিশ্লেষণ, প্রাথমিক আইনি কাজ এবং কিছু সৃজনশীল পেশার কাজও সম্পাদন করতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী প্রজন্মের এআই মডেলগুলো নিজেদের উন্নয়নেও আরও বেশি স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠবে।
নতুনদের চাকরিতে সবচেয়ে বেশি চাপ
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এআই প্রযুক্তির বিস্তারের পর কর্মজীবনে নতুন প্রবেশকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে সফটওয়্যার, অর্থনীতি ও সৃজনশীল শিল্পের মতো এআই-ঝুঁকিপূর্ণ খাতে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট।
তবে সব অর্থনীতিবিদ এ পরিবর্তনের জন্য কেবল এআইকে দায়ী করছেন না। তাদের মতে, সুদের হার, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ার মতো বিষয়ও চাকরির বাজারে প্রভাব ফেলেছে।
কমছে চাকরির বিজ্ঞাপন
চ্যাটজিপিটি ও অন্যান্য বড় ভাষাভিত্তিক এআই চালুর পর বিভিন্ন খাতে চাকরির বিজ্ঞাপনের সংখ্যাতেও পরিবর্তন এসেছে। ওইসিডির এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, টেলিমার্কেটিং ও আইনি সেবার মতো এআই-প্রভাবিত খাতে নতুন নিয়োগের হার কমেছে। বিপরীতে নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্য প্রস্তুতের মতো খাতে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে এআইয়ের প্রভাব আরও দৃশ্যমান। দেশটিতে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে চাকরির সুযোগ কমে এসেছে, যদিও একই সময়ে সুদের হার স্থিতিশীল ছিল বা হ্রাস পাচ্ছিল।
এআই ব্যবহারও ব্যয়বহুল
এআই পরিচালনায় ব্যবহৃত হয় ‘টোকেন’ নামের একটি পরিমাপ পদ্ধতি, যার মাধ্যমে প্রযুক্তিটি ভাষা বিশ্লেষণ ও তৈরি করে। ২০২৬ সালে এআই ব্যবহারের পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের উন্নত এআই ব্যবহারে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন কর্মসূচিও চালু করেছে।
তবে এআই পরিচালনার ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন টোকেন ব্যবহারের ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান উন্নত মডেলের ব্যবহার সীমিত করছে এবং তুলনামূলক কম খরচের চীনা এআই মডেলের দিকে ঝুঁকছে।
সামনে কী?
বিশ্লেষকদের মতে, সব ধরনের কাজ এআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হবে না। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের তুলনায় ভার্চুয়াল কর্মী পরিচালনার খরচ বেশি হতে পারে। তবুও প্রযুক্তির এই অগ্রগতির কারণে বিশ্বজুড়ে চাকরির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়েছে—এ বিষয়ে এখন আর তেমন কোনো দ্বিমত নেই। ভবিষ্যতে টিকে থাকতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ওপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

