ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি এখন এক ভয়াবহ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, যেখানে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ তাঁকে খাদের কিনারে নিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে তাঁর একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে খোদ আমেরিকানরাই যেভাবে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন, তা ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তার ধসকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
মার্কিন নৌবাহিনীকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ছোট নৌকা বা স্পিড বোটগুলো ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়ে করা পোস্টটি শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে এডিট করতে হয়েছে। আমেরিকানরা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে—যে ইরানের নৌবাহিনী যুদ্ধ শুরুর দ্বিতীয় দিনেই ধ্বংস হয়ে গেছে বলে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, সেই ইরানের ছোট নৌকার কাছে আজ কেন মার্কিন বাহিনীকে নাকাল হতে হচ্ছে? জনগণের এই বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য আর চাপের মুখে ট্রাম্প এখন নিজ দেশেই প্রতিনিয়ত প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন।
শিকাগো ইউনিভার্সিটির প্রখ্যাত অধ্যাপক ও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক রবার্ট পেপ নিউইয়র্ক টাইমসের কলামে বর্তমান পরিস্থিতিকে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি ভেঙে পড়ার মতো এক সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ইরান ও আমেরিকার এই দ্বন্দ্ব এখন একটি ‘জিরো-সাম গেমে’ পরিণত হয়েছে, যেখানে মাঝামাঝি কোনো সমাধান বা দুই পক্ষের একসাথে জয়ী হওয়ার সুযোগ নেই।
ইরান হয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে, না হয় হারাবে। ট্রাম্প মরিয়া হয়ে একটি মাঝপথ খুঁজছেন—যেখানে তিনি অন্তত নিজেকে বিজয়ী হিসেবে দাবি করে নিজ দেশের মানুষকে শান্ত করতে পারেন। তিনি কার্যত ইরানের কাছে একটি ‘চুক্তি ভিক্ষা’ চাইছেন যাতে তাঁর প্রেসিডেন্সি রক্ষা পায়। কিন্তু তেহরান খুব কৌশলে ট্রাম্পের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছে। অধ্যাপক পেপ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ইরানের বর্তমান লক্ষ্য হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকে দুর্বল করা এবং তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পথে ঠেলে দেওয়া।
ইরান সম্ভবত বুঝতে পেরেছে যে, আগামী দুই থেকে তিন মাস যদি তারা হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এবং এর মধ্যে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, তবে আগামী আট থেকে নয় মাসের মধ্যেই ট্রাম্পের শাসনাবসান ঘটবে। নভেম্বরের নির্বাচনের পর কংগ্রেস ও সিনেটে ট্রাম্পের দল আধিপত্য হারালে তাঁকে অভিশংসনের মুখোমুখি হওয়াটা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।
অধ্যাপক পেপের এই পূর্বাভাস যদি সত্য হয়, তবে ইতিহাস ইরানকে এমন একটি দেশ হিসেবে মনে রাখবে যারা আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্টকে পরোক্ষভাবে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছে—যেটি আমেরিকার বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটরাও করতে পারেনি। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন আনবে। সৌদি আরব বা কাতারের মতো দেশগুলো তখন অনুধাবন করবে যে, ইরান যদি আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে, তবে তাদের নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের চেয়ে তেহরানের কথাই বেশি গুরুত্বের সাথে শুনতে হবে।
ট্রাম্প এখন একটি আহত বাঘের মতো অবস্থায় আছেন, যাঁর সামনে পথ মাত্র দুটি—হয় ইরানে বড় ধরনের হামলা করা, নতুবা লেজ গুটিয়ে ইরান থেকে বিদায় নেওয়া। কিন্তু ইতিহাসের সাম্রাজ্যবাদী নেতাদের পতন যেমন তাঁদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই হয়েছে, ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও পরাজয় এখন ধ্রুব সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো নিয়মিত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ট্রাম্প ইরানকে ধ্বংস করতে গিয়ে এখন নিজেই রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস হওয়ার পথে।
ট্রাম্পের প্রতিটি পদক্ষেপই এখন তাঁর পরাজয়ের বার্তাকে আরও জোরালো করে তুলছে, আর ইরান উদীয়মান বিশ্বশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পথে পা বাড়াচ্ছে। অধ্যাপক পেপের ভাষায় বলতে গেলে, এই সংকটের শেষ প্রান্তে ট্রাম্পের জন্য কেবল ‘নিশ্চিত পরাজয়ই’ লেখা আছে।

