মধ্যপ্রাচ্যের মরুপ্রান্তরে ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ এখন এক চূড়ান্ত পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। মাঠের লড়াই থেকে পর্দার অন্তরালে চলে যাওয়া এই সংঘাতের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরিস্থিতি অনেকটা ১৯৫০ সালের উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধের মডেল অনুসরণ করছে।
সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার ছায়াযুদ্ধে কোনো পক্ষই জয়ী হতে না পেরে ১৯৫৩ সালে যে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছিল—যা আজও কোনো আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ছাড়াই বলবৎ আছে—ঠিক তেমন এক ‘স্থির সংঘাত’ বা Frozen Conflict-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বর্তমান ইরান-আমেরিকা সংকট।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দুর্ভেদ্য ভৌগোলিক এবং সামরিক মরুভূমিতে আটকে যাওয়ার পর অনির্দিষ্টকালের জন্য যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে, তা মূলত এক প্রকার কৌশলগত পিছুটান। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান এই বিরতি মেনে নিলেও শক্তিসাম্যের সূত্রানুসারে ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের একক আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। পেন্টাগনের মিসাইল ভাণ্ডার ফুরিয়ে আসা এবং ইরানের ‘আউটলাস্ট’ করার ক্ষমতা ওয়াশিংটনকে কার্যত মাঠ ছাড়তে বাধ্য করেছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একক আধিপত্য এখন এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা, যার পেছনে পর্দার আড়ালে শক্তি জোগাচ্ছে রাশিয়া ও চীন।
এই বদলে যাওয়া ভূ-রাজনীতিতে সবচেয়ে চমকপ্রদ মোড় হলো পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। দেশটি একই সাথে চীন ও আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি ইরান ও আরব দেশগুলোর মাঝেও বড় সেতুবন্ধন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সৌদি আরবের পর এখন কাতারের নিরাপত্তার দায়িত্বও পাকিস্তানের কাঁধে। আরব দেশগুলো এখন আর কেবল পশ্চিমা নিরাপত্তার ওপর ভরসা না করে পারমাণবিক শক্তিধর বন্ধুদেশ পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে, যা এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা কাঠামোকে আমূল বদলে দিচ্ছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনটি এসেছে অর্থনৈতিক মানচিত্রে। আমেরিকার ‘সফট টুল’ হিসেবে পরিচিত বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি পাকিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়া থেকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (MENA) অর্থনৈতিক বলয়ে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এটি কেবল কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট এক নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন। পাকিস্তানের অর্থনীতি এখন দক্ষিণ এশিয়ার চেয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাগামী। মূলত ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার এই অমীমাংসিত যুদ্ধই পাকিস্তানের আর্থিক শ্রেণিবিন্যাস পুনর্নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে।
যুদ্ধের মাঠ থেকে সরে গিয়ে সংঘাত এখন পর্দার আড়ালে নতুন রূপ নিয়েছে। সেখানে যারা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, তারাই চূড়ান্ত বিজয়ী হবে। তবে আপাতত দৃশ্যপট বলছে, ইরান ও তার মিত্ররা ‘আপার হ্যান্ডে’ বা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতি ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের মতো আমেরিকান প্রভাবের চূড়ান্ত পতন ঘটায়, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। পৃথিবী এখন এক নতুন বৈশ্বিক মেরুকরণ বা গ্লোবাল অর্ডারের সাক্ষী হতে যাচ্ছে, যেখানে ওয়াশিংটনের একক আধিপত্যের জায়গায় তেহরান, বেইজিং এবং ইসলামাবাদের সম্মিলিত প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আগামী দিনগুলোতে এই নতুন স্থিতাবস্থা বজায় রাখাই হবে বিশ্ব রাজনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ।

