২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে ইসরায়েল ও আমেরিকার যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সাক্ষী হয়েছিল, তা বর্তমানে এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা চললেও মাঠের উত্তেজনা কমেনি। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই ত্রিমুখী সংঘাতের গভীরে তাকালে মূলত চারটি দীর্ঘমেয়াদী কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা এই অঞ্চলকে বারবার ধ্বংসের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে।
প্রথমত, পারমাণবিক আধিপত্যের লড়াই (The Nuclear Race)। এটি এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ‘রেড লাইন’। ইরান তার জাতীয় নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে পারমাণবিক সক্ষমতাকে অপরিহার্য মনে করে। অন্যদিকে ইসরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরান মানেই তার অস্তিত্বের বিনাশ। এই শঙ্কা থেকেই ২০২৬-এর শুরুতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় বড় হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র চায় না মধ্যপ্রাচ্যে এমন কোনো শক্তির জন্ম হোক যা তাদের একক নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করবে।
দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার বা ‘প্রক্সি ওয়ার’ (Proxy Warfare)। ইরান সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং সিরিয়া-ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের মাধ্যমে ইসরায়েলের সীমানার চারপাশে নিজের শক্তি মোতায়েন করে রেখেছে। একে ইরান বলছে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ (Axis of Resistance)। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মনে করে, এই প্রক্সি গ্রুপগুলো মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা স্বার্থের প্রধান অন্তরায়।
তৃতীয়ত, আদর্শিক ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই (Ideological Conflict)। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকেই ইরান নিজেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং ইসরায়েলের ঘোর বিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইরানের ভয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র আসলে সেখানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তন চায়। ২০২৬-এর যুদ্ধে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চালানো ড্রোন হামলাগুলো তেহরানের এই অস্তিত্ব রক্ষার জেদকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চতুর্থত, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক ভূ-রাজনীতি (The Energy Game)। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহকারী পথ হরমুজ প্রণালি এখন ইরানের প্রধান অস্ত্র। ইরান যখনই বিপদে পড়ে, তারা এই পথ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে পশ্চিমাদের অর্থনীতিতে ধস নামাতে সক্ষম। আমেরিকা সমুদ্রপথে অবাধ বাণিজ্য ও তেলের নিয়ন্ত্রণ রাখতে এই অঞ্চলে বিশাল সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে চায়, যা ইরান সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখে।
তবে এই সংকটের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো পশ্চিমা বিশ্বের ‘একচক্ষু নীতি’ বা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু অস্ত্রের কথা স্বীকার না করার (Policy of Ambiguity) সুযোগ নিয়ে পশ্চিমারা তাদের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করে না। ইসরায়েল এনপিটি (NPT) চুক্তিতে স্বাক্ষর না করায় আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, অথচ একই অভিযোগে ইরানের ওপর পাহাড়সম নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইরানের কাছে এটি নিছক ‘রাজনৈতিক ভণ্ডামি’। তেহরান মনে করে, লিবিয়ার গাদ্দাফি বা ইরাকের সাদ্দাম হোসেন পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করে যে ভুল করেছিলেন, তারা সেই পথে হাঁটবেন না।
বর্তমানে ইরান আর আগের মতো একা নয়। রাশিয়া এবং বিশেষ করে চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন ইরানকে পশ্চিমাদের নীতি পাত্তা না দেওয়ার শক্তি জোগাচ্ছে। ইসলামাবাদ আলোচনায় ইরান এই অবস্থান থেকেই কথা বলছে—যেখানে নীতি নয়, বরং নিজের সামরিক শক্তিই তাদের নিরাপত্তার একমাত্র রক্ষাকবচ। মূলত পশ্চিমাদের এই দ্বিমুখী আচরণই মধ্যপ্রাচ্যকে এক অন্তহীন অবিশ্বাসের আবর্তে আটকে রেখেছে।

