আবু সাঈদ :
কুষ্টিয়ার মাটিতে এখনও অনেকে তাকে ‘স্বর্ণময়ী’ বলে ডাকেন। চোখে চোখ রাখলেই মনে হয়, যেন সেই অমর নারীটি আবার ফিরে এসেছেন, যিনি কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের সহধর্মিণী হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে দুঃখ-দারিদ্র্যের স্রোতে ভাসিয়েও স্বপ্ন দেখেছিলেন।
বাংলাদেশের নন্দিত নাট্যকার ও নির্দেশক মাসুম রেজার নির্দেশনায় কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া বাংলার বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের আত্মজীবনী নিয়ে রচিত নাটকে প্রকৃত স্বর্ণময়ী হয়ে ওঠা মেয়েটির নাম নৌশিন নাওয়ার মাসুদ পৃথিবী।
ছোটবেলা থেকেই পৃথিবীর বাড়িতে গানের আসর বসতো। সুরের ঢেউয়ের মাঝে বড় হয়েছে সে। কিন্তু তখন তার কাছে তবলা, হারমোনিয়াম, এসরাজ সবই ছিল শিশুটির খেলনা। মা-বাবা দেখলেন মেয়ের মধ্যে গানের প্রতি দারুণ আগ্রহ। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাকে গানের শিক্ষকের কাছে পাঠালেন বাবা-মা। পরবর্তীতে সেই ছোট্ট পৃথিবী ঢাকায় পড়াশোনার জন্য চলে এলো। কিন্তু এক সময় নৃত্য তাকে টেনে নিয়ে গেল নতুন এক জগতে। ২০১২ সালে কুষ্টিয়া চলে গেলে সালে প্রথমে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি কুষ্টিয়া তে নৃত্য শাখায় ভর্তি হন। এবং ২০১৬ পুনরায় কুষ্টিয়া জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে নৃত্য বিভাগ ভর্তি হয়ে ৪ বছরের কোর্স সম্পূর্ণ করেন।
২০১৭ সালে বোধন থিয়েটার কুষ্টিয়া’র প্রযোজিত নাটক “চন্দ্রাবতীর কথা” নাটকের রিহার্সাল দেখে মুগ্ধ হয়ে নাটিকের প্রতি তার প্রেম জন্মায়। নাটক নিয়ে তার আগ্রহ আর কৌতূহলের থেকেই ডাক পরে থিয়েটারে অভিনয়ের। ২০১৮ সালে বোধন থিয়েটার কুষ্টিয়া’তে যোগদান করেন। বর্তমানেও তিনি বোধন থিয়েটার কুষ্টিয়া’তে একজন সক্রিয় নাট্যকর্মী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। শামীম সাগরের পরিচালনায় ‘রক্ত নদী গড়াই’ নাটক দিয়ে থিয়েটারে পা রাখলেন পৃথিবী। তারপর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘আমার সাধ না মিটিলো’, ‘সংঘাত’ , ‘সিস্টেম’ এর মতো মঞ্চ নাটকে একের পর এক চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরেছেন।
কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এলো ২০২৩ সালে। মাসুম রেজার নির্দেশনায় ‘এডিটর মহাশয়’ নাটকে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের স্ত্রী স্বর্ণময়ীর চরিত্র। স্ক্রিপ্ট প্রথম দেখে পৃথিবী ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। এত গভীর, এত কষ্টের, এত আবেগের একটি চরিত্র। কিন্তু নির্দেশকের নির্দেশনায় ধীরে ধীরে তিনি স্বর্ণময়ী হয়ে উঠলেন। টানা তিন মাস স্বর্ণমায়ী হয়েছে ব্যাক্তি জীবনে; তারপর আর সেই নাটকের সংলাপ মুখস্থ করতে হয়নি। একদম হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন চরিত্রটি। মঞ্চে যখন তিনি কথা বলতেন, দর্শকদের চোখে জল চলে আসতো। নাটকটি দুবার মঞ্চস্থ হয়েছে, চ্যানেল আইয়ের ওটিটি প্লাটফর্ম আই স্ক্রিনেও ধারণ করা হয়েছে নাটকটি। আজও কুষ্টিয়ার অনেকে তাকে দেখলে বলে ওঠেন, “স্বর্ণময়ী ”
২০২২ সালে পৃথিবী যুক্ত হলেন ‘ভোর হলো’ গ্রাম থিয়েটারের শিশু শাখায়। সেখানে তিনি নাচের শিক্ষিকা এবং নাটক পরিচালনা করেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচিত “পুতুলের বিয়ে” নাটক ছিলো তার প্রথম নির্দেশিত নাটক। নাটকের মাধ্যমে ছোট ছোট মুখগুলো যখন তার নির্দেশনায় মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করে, পৃথিবীর চোখে তখন ভবিষ্যতের স্বপ্ন ভাসে।
শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি যুক্ত থাকা বা কিছু করতে পারার পেছনে কারো অবদান আছে কি না জানতে চাইলে তিনি জানান- কর্মসূত্রে প্রবাসী থাকার পরেও মানসিকভাবে আমার বাবা আমাকে সব বিষয়ে সাহসী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। সকল সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা সৃজনশীল কাজে আমাকে সমর্থন ও উৎসাহী করেছেন। আর আমার মা সবসময় আমার সাথে ছায়ার মতো লেগে থেকে আমাকে সব বিষয়ে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। এই দুইটা মানুষের কারণেই হয়তো আজকে আমি এতো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হতে পারছি।
তিনি বলেন, “শিল্প-সংস্কৃতি পৃথিবীর প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকুক।” এই একটি বাক্যেই লুকিয়ে আছে তার সারা জীবনের দর্শন। শুধু অভিনয় বা নাচ নয়, তিনি চান সকল শিল্প যেন হয় সমাজের আয়না, হয় মানুষের হৃদয়ের ভাষা।
২০২৪ সালে নৌশিন নাওয়ার মাসুদ পৃথিবী পিপলস থিয়েটার এসোসিয়েশন কর্তৃক মঞ্চমুকুল পদক অর্জন করেছিলেন।
পৃথিবী শুধু একজন অভিনেত্রী নন। তিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। যার স্বপ্নে রয়েছে শিল্প-সংস্কৃতিকে ভালোবাসার নিরেট আকুতি।

