সত্যজিৎ দাস (মৌলভীবাজার):
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রশাসনিক তদারকি ও নজরদারির অভাবে চরম অব্যবস্থাপনা দেখা দিয়েছে। হাসপাতালের ভেতরে কুকুর-বিড়ালের অবাধ বিচরণে যেমন রোগী ও স্বজনদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে,তেমনি হাসপাতাল ডায়েট কমিটির নিয়মিত নজরদারি না থাকায় রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়,হাসপাতালটির বহির্বিভাগের প্রধান ফটক এবং ফার্মেসির সামনে বেশ কয়েকটি কুকুর শুয়ে থাকায় রোগীরা নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারছেন না। এমনকি প্রসূতি (ডেলিভারি) বিভাগের দ্বিতীয় তলার সিঁড়িতেও কুকুর ঘুরতে দেখা গেছে। এদিকে অন্তর্বিভাগের বারান্দার একটি খালি শয্যায় বিড়ালের বিষ্ঠা পড়ে থাকতে দেখা গেছে, যা থেকে চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও নিরাপত্তা প্রহরী থাকার পরও তদারকির অভাবে এমন নোংরা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
চিকিৎসা সেবা নিতে আসা শামিম ইসলাম জানান,তাঁর ৪ বছরের শিশুকে চিকিৎসক দেখাতে এসে প্রধান ফটকের সামনে কুকুরের দল দেখে শিশুটি ভয়ে কান্না শুরু করে। চিকিৎসালয়ের মতো একটি নিরাপদ জায়গায় এমন পরিবেশ কোনোভাবেই কাম্য নয়। এছাড়া বহির্বিভাগের টয়লেটগুলোতে পানি ও প্রয়োজনীয় উপকরণের তীব্র সংকট রয়েছে বলে অভিযোগ করেন সাজু নামের আরেক রোগী।
পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি হাসপাতালের খাবার সরবরাহ নিয়েও উঠেছে চরম অনিয়মের অভিযোগ। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী,রোগীদের রোগের ধরন বিবেচনা করে হাসপাতাল ডায়েট কমিটি খাবারের মেনু ও পুষ্টির মান (ডায়েট চার্ট) নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু ডায়েট কমিটির নিয়মিত তদারকি না থাকার সুযোগে চুক্তি অনুযায়ী মানসম্মত খাবার দিচ্ছে না সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তুলি এন্টারপ্রাইজ।
অভিযোগ রয়েছে,বৃহস্পতিবার (০২ জুলাই) সকালে শিশু ওয়ার্ডের একাধিক রোগীর ভাগ্যে জুটেনি বরাদ্দকৃত কলা। এছাড়া সরবরাহকৃত পাউরুটিও ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। এর আগেও গত ৩১ মে নিম্নমানের খাবার সরবরাহের অভিযোগে এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নজরদারি না থাকায় কারণ দর্শানোর পরও খাবারের মানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
খাবারের অভিযোগের বিষয়ে মেসার্স তুলী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী পাকিজ মিয়া বলেন,গরমের কারণে কলার মানে সমস্যা দেখা দেওয়ায় প্রথম দফায় কলা পরিবর্তন করা হয়। পরে আবার কিছু কলায় দাগ বা ত্রুটি দেখা গেলে সেগুলোও পরিবর্তন করে নতুন কলা সরবরাহ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন,ফেসবুক পোস্টে পলিথিনে মোড়ানো যে ব্রেডের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি তাদের প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা ব্রেড নয়। তাদের প্রতিষ্ঠান মেয়াদ উল্লেখ থাকা কুইক বাইট স্যান্ডউইচ ব্রেড সরবরাহ করে থাকে। তাই অভিযোগের বিষয়টি যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা।”
হাসপাতালের জরুরি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকা আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) আকাশ নুনিয়া বলেন,”হাসপাতালের বিভিন্ন বিষয় নিয়মিত তদারকি করে সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজারদের জানানো হয়। তবে পরিচ্ছন্নতাসহ হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়। বৃহস্পতিবারের অভিযোগগুলোর বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।”
হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার মিস: বশিরুন্নেছাকে বারবার ফোনকল দেয়ার পরেও রিসিভ করেন নাই।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন, “খাবারের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। অন্যান্য অভিযোগগুলোও তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
এ প্রসঙ্গে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন,”আমি বিষয়টি জানার পর পরই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি। হাসপাতালের নিরাপত্তা,পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং ডায়েট চার্ট অনুযায়ী খাবারের মান বজায় রাখতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিনের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান,”তিনি কাজে বাইরে রয়েছেন। কলা সরবরাহে সমস্যার কারণে বৃহস্পতিবার সেই সময়ে রোগীদের কলা দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান।”
স্বল্প জনবলের কথা উল্লেখ করে বলেন,পুরো হাসপাতালের জন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মী একজন, নৈশ্যপ্রহরী একজন। আজ বৃহস্পতিবার আনসার সদস্যরা অন্যান্য উপজেলার মতোই শ্রীমঙ্গল হাসপাতালেও যোগদান করেছেন। সেবা নিতে আগত রোগীদের সেবা দেয়ার পর্যাপ্ত জনবল নেই,তারওপর কুকুর-বিড়াল। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোথায়,কি কারণে সমন্বিত হয়ে কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে,তাও দেখবো। কারণ এরকম একটি হাসপাতাল সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা সম্ভব নয়।”
হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা,”খাদ্যের মান এবং অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নার্সিং সুপারভাইজারসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কারও গাফিলতি প্রমাণিত হলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।”

