দেশের প্রখ্যাত লেখক, গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বাংলা একাডেমির বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই । আজ রবিবার (৫ জুলাই ২০২৬) দুপুরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।
তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম। তিনি জানান, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে একটি রেস্টুরেন্টে খেতে বের হয়েছিলেন। সেখানে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে দ্রুত মিরপুরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে তিনি মারা যান। তাঁর দাফন ও সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের বিষয়ে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন দেশের প্রথম সারির একজন বুদ্ধিজীবী ও রাষ্ট্রচিন্তক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় অধ্যাপনা করা এই মনীষী বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল রাজনীতি বিষয়ে বহু কালজয়ী প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণ উপহার দিয়েছেন। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার আন্দোলনেও তিনি আজীবন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
সম্পাদনা: তিনি দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে এগিয়ে নিতে ‘সুন্দরম’ ও ‘লোকায়েত’ নামে দুটি উচ্চমানের সাময়িকপত্র সম্পাদনা করতেন।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: তাঁর রচিত ও সমাদৃত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন, রাজনীতি দর্শন, সাহিত্য চিন্তা এবং সংস্কৃতির সহজ কথা। এছাড়া তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও স্বদেশচিন্তা-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।
সাহিত্য ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালেই তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ সম্মাননা ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন। আবুল কাসেম ফজলুল হকের জন্ম ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার পাকুন্দিয়া গ্রামে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন দুই সন্তানের জনক। তাঁর কন্যা ড. শুচিতা শরমিন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) সাবেক উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আর তাঁর একমাত্র পুত্র ছিলেন প্রগতিশীল জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর দীপনকে রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে জঙ্গিরা, যা দেশজুড়ে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। পুত্রশোকে কাতর হলেও আমৃত্যু আলোর পথ দেখানো ছাড়েননি এই চিন্তাবিদ।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়, ২০২৪ সালের অক্টোবরে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে তিন বছরের জন্য বাংলা একাডেমির সভাপতির সম্মানজনক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণে দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষা অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, লেখক ও শিক্ষাবিদেরা।

