লিখেছেনঃ যুবরাজ বকসী জয়

পহেলা বৈশাখ এলেই বাতাসে এক ধরনের বদল টের পাওয়া যায়। সকালটা যেন অন্যরকম লাগে। খুব বড় কিছু নয় তবু গভীর। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় হঠাৎ করে লাল সাদা রঙের ছোঁয়া বাড়ে। গ্রামের হাটে-মাঠে মেলা মেলা রব ভেসে আসে। মানুষের মুখেও সহজ এক হাসি ফুটে ওঠে। এই হাসির ভেতরে কোনো জটিলতা নেই। মনে হয় এই দিনটি শুধু ক্যালেন্ডারের একটা তারিখ নয়। এর ভেতরে জমে আছে বহু বছরের স্মৃতি, অভ্যাস, অনুভূতি। তখন প্রশ্নটা আবার সামনে আসে। পহেলা বৈশাখ কি শুধু উৎসব নাকি এর ভেতরে বাঙালির নিজের পরিচয় লুকিয়ে আছে?
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় এই দিনের শুরু খুব সাধারণ ছিল। সম্রাট আকবর বাংলা সন চালু করেছিলেন খাজনা আদায় সহজ করার জন্য। কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায় সহজ করতে একটি নতুন হিসাব পদ্ধতি দরকার ছিল। সেই প্রয়োজন থেকেই বাংলা বছরের জন্ম। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই দিন মানুষের জীবনে অন্য অর্থ পায়। এটি আর শুধু হিসাবের দিন থাকে না। এটি হয়ে ওঠে নতুন করে শুরু করার দিন। পুরোনো ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার দিন। নতুনভাবে ভাবার দিন, নতুনভাবে বাঁচার দিন।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈশাখকে শুধু একটি ঋতু হিসেবে দেখেননি। তিনি এটিকে এক ধরনের জাগরণের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। তাঁর রচিত “এসো হে বৈশাখ এসো এসো“ শুধু একটি গান কিংবা সুরব্যঞ্জনা নয়। বরং এটি যেন জাগরণের এক ডাক। এই ডাকে আছে পুরোনো সব গ্লানি মুছে ফেলার আহ্বান। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন নতুন বছর মানে শুধু সমইয়ের বদল নয়। এটি নিজের ভেতরের মানুষটিকে নতুন করে তৈরি করার সুযোগ।
“আমি ধূর্জটী,
আমি এলোকেশে ঝড় অকাল- বৈশাখীর।“
উচ্চারণের মাধ্যমে বিদ্রোহী নজরুল বৈশাখের ভেতরে আবিষ্কার করেছেন দৃঢ় শক্তির। তাঁর কাছে বৈশাখ মানে ঝড়ের মধ্যেও দাঁড়িয়ে থাকার তীব্র সাহস, এগিয়ে যাওয়ার অদম্য শক্তি। এই যে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি এটিই বৈশাখের আসল সৌন্দর্য।
শরৎচন্দ্র সাহিত্যে গ্রামবাংলার জীবনের যে সহজ ছবি তুলে ধরেছেন সেখানে বৈশাখের আলাদা একটি জায়গা আছে। হালখাতা খোলা,গ্রাম্য মেলা, ছোট ছোট খেলনা আর নাগরদোলা। এসবের ভেতরে কোনো বড় আয়োজন নেই। তবু প্রকাশ পায় অপার আনন্দের । মানুষের সাথে মানুষের সহজ সংযোগ , এই সারল্যই বাঙালির শক্তি। শরৎ বাবুর ‘পল্লী সমাজ”উপন্যাসেও আমরা গ্রামবাংলার সরল জীবন আর উৎসবের আবহ স্পষ্টভাবে দেখতে পাই।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মানুষের সমাজ আর সংস্কৃতির ভেতরে যে বন্ধন কাজ করে তা নিয়ে লিখতে গিয়ে দেখিয়েছেন উৎসব মানুষকে এক জায়গায় নিয়ে আসে। পহেলা বৈশাখও ঠিক তেমন। এই দিনে মানুষ আলাদা আলাদা পরিচয় ভুলে এক হয়ে যায়। ধনী গরিব শহর গ্রাম সব ভেদাভেদ যেন কিছুটা হলেও কমে যায়।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় গ্রামবাংলার প্রকৃতি আর মানুষের সহজ জীবনকে যেভাবে তুলে ধরেছেন তা বৈশাখের আবহের সাথে গভীরভাবে মিলে যায়। তার পথের পাঁচালীতে আমরা দেখি মাটির গন্ধ, প্রকৃতির সৌন্দর্য আর মানুষের ছোট ছোট আনন্দের গল্প। বৈশাখও ঠিক সেই রকম এক অনুভূতি যেখানে সরলতার মধ্যেই আনন্দ লুকিয়ে থাকে।
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বৈশাখের প্রকৃতি এক অন্যরকম ছবি হয়ে ধরা দেয় । রোদে পুড়ে যাওয়া মাঠ, গাছের নতুন পাতা, ধুলার গন্ধ। তাঁর কাব্যে প্রকাশ পায় বৈশাখ শুধু মানুষের নয়, এটি প্রকৃতিরও নতুন শুরু। পুরোনো পাতা ঝরে পড়ে। নতুন জীবন জন্ম নেয়। এই পরিবর্তনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সৌন্দর্য। তাঁর “রূপসী বাংলা” কাব্যে আমরা বাংলার প্রকৃতির এই গভীর সৌন্দর্য আর মাটির টান অনুভব করতে পারি।
হুমায়ূন আহমেদ খুব সহজভাবে দেখিয়েছেন বাঙালির আনন্দ কোথায় লুকিয়ে থাকে। তিনি বুঝিয়েছেন মানুষ খুব বড় কিছু চায় না। ছোট ছোট জিনিসেই সে খুশি হয়। একটি নতুন জামা। একটি মেলা। কিছু গান। বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো। বৈশাখ এই ছোট ছোট আনন্দগুলোকে একসাথে নিয়ে আসে। তাই এই দিনটি আলাদা হয়ে ওঠে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় উৎসবকে শুধু আনন্দ হিসেবে দেখেননি। তিনি দেখেছেন স্মৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক হিসেবে। তাঁর লেখায় বোঝা যায় উৎসব মানে মানুষের ভেতরের জমে থাকা অনুভূতির প্রকাশ। পহেলা বৈশাখ সেই অনুভূতিগুলোকে জাগিয়ে তোলে।
একটি গ্রামের গল্প ধরা যাক। প্রতি বছর বৈশাখের সকালে মেলা বসে। এক ছোট ছেলে তার বাবার হাত ধরে সেখানে যায়। তার কাছে বৈশাখ মানে একটি লাল বেলুন। একটি বাঁশি। কিছু মিষ্টি। সেই ছোট ছোট জিনিসেই তার আনন্দ। বছর যায়। সে বড় হয়। পড়াশোনার জন্য শহরে যায়। তারপর কাজের জন্য বিদেশে চলে যায়। জীবনের গতি বদলে যায়। কিন্তু এক সময় সে আবার বৈশাখে গ্রামে ফিরে আসে। মেলা আগের মতোই বসে। নতুন কিছু যোগ হয়েছে। অনেক কিছু বদলেছে। তবু যখন সে বাঁশির সেই পরিচিত শব্দ শোনে তখন তার মনে হয় সে আবার ছোট হয়ে গেছে। তখন সে বুঝতে পারে বৈশাখ শুধু একটি দিন নয়। এটির সাথে তার শিকড়ের সম্পর্ক।
কেবল কী গ্রাম? শহরেও এমন কতশত গল্প আছে। কয়েকজন বন্ধু প্রতি বছর বৈশাখে একসাথে বের হতো। তারা সকালে ঘুরতে যেত। গান শুনত। ছবি তুলত। সারাদিন একসাথে কাটাত। সময়ের সাথে সাথে সবাই ব্যস্ত হয়ে যায়। কেউ অন্য শহরে চলে যায়। আবার কেউ কাজে ডুবে যায়। তবু তারা একটি জিনিস ছাড়ে না। বৈশাখের দিনে তারা একে অপরকে মনে করে। একটি ছোট বার্তা পাঠায়,
“শুভ নববর্ষ…”
এই গল্পগুলো আমাদের একটি বড় কথা মনে করিয়ে দেয়। বৈশাখ শুধু আনন্দের নয়। এটি মানুষের মনে জমে থাকা সম্পর্কগুলোকেও জাগিয়ে তোলে। মানুষকে তাঁর অতীতের সাথে যুক্ত করে। পহেলা বৈশাখ তাই শুধু একটি উৎসব নয়। এটি অনুভূতি, পরিচয়। যা মানুষকে পুরনো খাতার পাতার মতো নিজের সাথে নিজের পরিচয়ের সুযোগ ।
শেষ পর্যন্ত হয়তো বলা যায় পহেলা বৈশাখ কোনো এক দিনের আনন্দ নয়। এটি একটি চলমান যাত্রা। প্রতি বছর এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কোথা থেকে এসেছি, আমাদের সংস্কৃতি কী, আমাদের ভাষা কী, আমাদের শিকড় কোথায়।
“শুভ নববর্ষ” শুধু একটি শুভেচ্ছা বার্তা নয়। বরং এটি নিজের কাছে নতুন করে বাঁচার প্রতিশ্রুতি।

