আজ (২১ জুলাই) উত্তরার দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের মর্মান্তিক ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো। ২০২৫ সালের এই দুর্ঘটনায় পাইলট, এক শিক্ষিকা ও ২৮ শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৬ জন প্রাণ হারান। আহত হন বহু শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারী। তবে সেই ভয়াবহ দিনে সাহসিকতা ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরী।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি বিদ্যালয়ের ফটকে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছিলেন। ঠিক সেই সময় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফ-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমান বিদ্যালয় ভবনে বিধ্বস্ত হয়। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে আগুন ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে।
জীবন বাঁচানোর সুযোগ থাকলেও মাহেরীন চৌধুরী নিরাপদে সরে যাননি। বরং আগুনে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের উদ্ধারে এগিয়ে যান। আতঙ্কিত শিশুদের সাহস জুগিয়ে তিনি তাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যেতে উৎসাহিত করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তিনি আগুনের ভেতর থেকে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীকে বের করে আনতে সক্ষম হন। উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, একের পর এক শিক্ষার্থীকে নিরাপদে পাঠানোর সময় তিনি নিজেই আগুনে মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন এবং আর বের হতে পারেননি।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, তার শরীরের প্রায় শতভাগ অংশ দগ্ধ হয়েছিল। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিজের শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও তিনি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন।
তার স্বামী মনসুর হেলাল পরে জানান, লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার আগে তিনি মাহেরীনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, নিজের দুই সন্তান থাকার পরও কেন এত বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন। জবাবে মাহেরীন বলেছিলেন, “আমার বাচ্চারা আমার সামনে পুড়ে মারা যাচ্ছে, আমি সেটা কীভাবে সহ্য করি?”
সেদিন রাতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন মাহেরীন চৌধুরী। পরে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
মাহেরীন চৌধুরী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাতিজি এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের চাচাতো বোন ছিলেন। তবে শিক্ষকতা জীবনে তিনি কখনও রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে আনেননি; শিক্ষার্থীদের কল্যাণকেই নিজের দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন।
শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষায় অসাধারণ সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তার পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন তার স্বামী মনসুর হেলাল।

