মীর ইমরান, মাদারীপুর প্রতিনিধি:
মাদারীপুরের শিবচর পৌরসভাকে পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক নগরীতে রূপ দিতে প্রায় ১২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে একটি সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিট। প্রকল্পটি চালু হলে পৌরসভার দৈনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদন করা হবে জৈব সার ও বায়োগ্যাস।
এতে একদিকে যেমন বর্জ্যজনিত পরিবেশ দূষণ কমবে, অন্যদিকে কৃষকরা স্বল্পমূল্যে উন্নতমানের জৈব সার পেয়ে উপকৃত হবেন। পাশাপাশি সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।তবে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও এখনো উদ্বোধন হয়নি। তাই দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক ও সচেতন মহল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায় উপজেলা পর্যায়ে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় শিবচর পৌরসভার চরশাম্যাইল ও শ্যামাইল মৌজায় ২ দশমিক ৬৮ একর জমির ওপর ২০২৩ সালে এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় ১২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টার্ন।
প্রকল্পের মোট জমির মধ্যে ১ দশমিক ৫৪ একর ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং ১ দশমিক ১৪ একর খাস জমি রয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি প্রকল্প শুরুর আগেই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর অধিগ্রহণ করলেও তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত অনেক জমির মালিক এখনো ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পৌর এলাকার বাসাবাড়ি, বাজার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন সংগৃহীত ময়লা-আবর্জনা এই ইউনিটে এনে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করা হবে। বর্জ্য থেকে উৎপাদিত হবে উন্নতমানের জৈব সার এবং বায়োগ্যাস। এতে উন্মুক্ত স্থানে ময়লা ফেলার প্রবণতা কমবে, দুর্গন্ধ ও পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং পৌরবাসী পাবে একটি স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্প চালুর পর প্রথম দুই বছর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জৈব সার উৎপাদন করবে। পরবর্তীতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।স্থানীয় বাসিন্দা ছোরহাব মিয়া জানান,দীর্ঘদিন ধরে শিবচরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বড় সমস্যা হয়ে আছে। প্রকল্পটি চালু হলে শহর পরিচ্ছন্ন হবে, দুর্গন্ধ কমবে এবং স্থানীয় অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কৃষক হামেদ শিকদার বলেন,রাসায়নিক সারের দাম ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রকল্প থেকে যদি স্বল্পমূল্যে জৈব সার পাওয়া যায়, তাহলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমবে। মাটির উর্বরতা বাড়বে এবং ফলনও ভালো হবে। তাই আমরা দ্রুত প্রকল্পটি চালুর দাবি জানাই।উপশহরের বাসিন্দা জয় চৌধুরী বলেন,দীর্ঘদিন ধরে উপশহরের শেষ প্রান্তে ময়লা ফেলার কারণে ভয়াবহ দুর্গন্ধে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিশুরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি দুর্গন্ধের কারণে মসজিদে নামাজ আদায় করতেও সমস্যা হয়। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু হলে আমরা এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জৈব সার ব্যবহারের ফলে মাটির জৈব উপাদান বৃদ্ধি পায়, জমির উর্বরতা দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকে এবং রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীলতা কমে। এছাড়া বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বায়োগ্যাস বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগও তৈরি হবে, যা পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শিবচর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী শামীমা নাসরিন বলেন, প্রকল্পটি চালু হলে শিবচর পৌরসভার চেহারা বদলে যাবে। বাসাবাড়ি থেকে সংগ্রহ করা বর্জ্য এখানে এনে প্রক্রিয়াজাত করা হবে। উৎপাদিত জৈব সার সাধারণ কৃষকরা কম দামে কিনতে পারবেন। এতে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের জীবনমানেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
তিনি আরও জানান,প্রকল্পটির নির্মাণকাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট কাজ শেষ করে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত প্রকল্পটি উদ্বোধন করে কার্যক্রম শুরু করা হলে একদিকে যেমন শিবচর পৌরসভার দীর্ঘদিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধান হবে, অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষা, কৃষির উন্নয়ন, জৈব সার উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এ প্রকল্পটি শিবচরের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দ্রুত পরিশোধেরও দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

