বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পুরোনো মিত্রতাগুলো ভেঙে পড়ছে এবং জন্ম নিচ্ছে এক নতুন মেরুকরণ। একদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঝটিকা সফর, অন্যদিকে ন্যাটোর অভ্যন্তরে আমেরিকা বনাম ইউরোপের স্নায়ুযুদ্ধ—সব মিলিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার সংকেত পাওয়া যাচ্ছে।
১. আরাগচির সফর: কৌশলগত ঢাল নাকি ঝড়ের পূর্বাভাস?
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যখন পাকিস্তান, ওমান ও রাশিয়ায় সফরের ঘোষণা দিয়েছেন, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—হামলার আশঙ্কার মুখেও কেন এই সফর?
আঞ্চলিক জোট গঠন: এটি মূলত সম্ভাব্য হামলার আগে প্রতিবেশী ও মিত্রদের সাথে নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত করার একটি দ্বিপাক্ষিক প্রয়াস।
যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুরতা: ইসরায়েলি গণমাধ্যম এবং সাবেক মার্কিন কর্নেল ম্যাকগ্রেগরের তথ্যমতে, এই সপ্তাহান্তেই বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা রয়েছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের। আরাগচির এই সফর মূলত যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে মধ্যস্থতাকারীদের সতর্ক করা এবং আমেরিকার সাথে সরাসরি আলোচনার পথ বন্ধ করে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা।
২. ন্যাটোর অন্দরে কম্পন: স্পেন ও যুক্তরাজ্যের ওপর ক্ষুব্ধ আমেরিকা
বিবিসির ফাঁস হওয়া পেন্টাগনের ই-মেইলগুলো বিশ্ব রাজনীতির এক নগ্ন রূপ উন্মোচন করেছে। আমেরিকা এখন আর কেবল শত্রুদের ওপর নয়, বরং অবাধ্য মিত্রদের ওপরও খড়গহস্ত হচ্ছে।
স্পেন ও ন্যাটোর ভবিষ্যৎ: ট্রাম্পের সমালোচনা করায় স্পেনকে ন্যাটো থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি আটলান্টিক জোটের ঐতিহাসিকভাবে গভীর ফাটলকেই নির্দেশ করে।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ও যুক্তরাজ্যের সার্বভৌমত্ব: ইরান যুদ্ধে সরাসরি শরিক না হওয়ায় বন্ধু দেশ যুক্তরাজ্যকেও ছাড়ছে না আমেরিকা। দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনার দাবিকে উসকে দিয়ে ব্রিটেনকে চাপে ফেলার মার্কিন নীতি প্রমাণ করে—স্বার্থের প্রশ্নে ওয়াশিংটন কাউকেই পরোয়া করে না। প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমারের “সার্বভৌমত্বে আপোষ নয়” বক্তব্যটি কার্যত ওয়াশিংটনের প্রতি লন্ডনের এক কঠিন জবাব।
৩. ইউরোপের মোহভঙ্গ ও জ্বালানি কূটনীতি
রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন আমেরিকার ওপর নির্ভর না করে নিজেরাই ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করছে। এটি এক বিশাল গুণগত পরিবর্তন।
হরমুজ প্রণালির চাবিকাঠি: যদি ইরান ও ইউরোপের মধ্যে সমঝোতা হয়, তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হবে। বিনিময়ে ইউরোপ ইরানের ওপর থেকে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে আমেরিকার ‘সর্বোচ্চ চাপ’ (Maximum Pressure) নীতি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে।
মার্কিন বলয় থেকে বিচ্যুতি: ইউরোপ বুঝে গেছে, ট্রাম্পের শুল্ক নীতি এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের মতো সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষার যুগে আমেরিকার ওপর ভরসা করা আত্মঘাতী।
৪. ডলার সাম্রাজ্যের পতন ও নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার
সবচাইতে বড় আঘাতটি আসছে অর্থনৈতিক ফ্রন্ট থেকে। ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, রাশিয়া ও চীন এখন ডলার ছাড়াই তাদের শতভাগ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য রুবল ও ইউয়ানে সারছে।
CIPS ও SPFS: চীনের এবং রাশিয়ার পেমেন্ট ব্যবস্থার সমন্বয় ডলারের বিকল্প এক শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করেছে।
পেট্রো-ডলারের অন্তিম সময়: যদি ইরান যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালিতে লেনদেনের ক্ষেত্রে নিজেদের কারেন্সি ব্যবহারের শর্ত জুড়ে দেয়, তবে মার্কিন ডলারের যে বিশ্বব্যাপী আধিপত্য (Petrodollar Hegemony), তার চিরস্থায়ী অবসান ঘটবে।
ইরান যুদ্ধ এখন আর কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। এটি রূপ নিয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত যুদ্ধে। আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্ররা যখন পাশ কাটিয়ে নতুন পথ খুঁজছে, তখন বোঝা যাচ্ছে যে মার্কিন একক আধিপত্যের যুগ বা ‘ইউনিপোলার ওয়ার্ল্ড’ দ্রুত বিলীন হচ্ছে। ফকল্যান্ড থেকে পারস্য উপসাগর—সবখানেই আজ নতুন মেরুকরণের পদধ্বনি। এই যুদ্ধের ফলাফল হয়তো কোনো দেশের বিজয় নয়, বরং এক নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার (New World Order) জন্ম দেবে, যেখানে ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র নির্দেশ আর খাটবে না।

