এম.শাহীন আল আমীন, জামালপুর প্রতিনিধি :
নয় লাখ টাকা ব্যায়ে ১২৭ ফুট দৈর্ঘ্য বাইচ নৌকা তৈরি করে আলোচিত হয়ে উঠেছে জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ ইউনিয়নের কোয়ালিকান্দি এলাকার বাসিন্দারা। তৈরি শেষে ঐতিহ্যবাহি খাবার মিল্লি ভাতের মেজবান করে নৌকাটি ডুবায় ভাসানো হয়েছে। পানি বৃদ্ধি পেলেই এটি নদীতে ভাসানো হবে।
গ্রামবাসী সূত্রে জানা গেছে, নৌকা বাইচ কোয়ালিকান্দি গ্রামের মানুষের শখের খেলা। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন জেলায় নৌকা বাইচে অংশ গ্রহন করে থাকে এ এলাকার মানুষ। পূর্বেও তাদের বাইচ নৌকা ছিলো। পুরাতন নৌকাটি খেলার অযোগ্য হওয়ায় চলতি বর্ষাকালে বিভিন্ন জেলায় খেলায় অংশ গ্রহন করার জন্য একটি নতুন নৌকা তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। তিন মাস আগে নতুন নৌকা তৈরির কাজ শুরু হয়। নৌকাটি তৈরি করতে প্রতিদিন কাজ করেছে ৬/৭ জন মিস্ত্রি। পায়ে জাতের কাঠ ওজনে পাতলা। পাতলা হওয়ার কারণে পায়ে কাঠের তৈরি নৌকা পানিতে বেশি ভাসে। চলার গতিও বেশি। তাই নৌকাটি পায়ে জাতের কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে এটি সাদা, কালো ও লাল রঙ্গে সাজানো হয়েছে। খেলার সময় রং পরিবর্তন হবে। পানিতে যাতে চলার গতি বাড়ে এ কারণে রংঙ্গের ক্ষেত্রে গোপন টিপস আছে। মোটা বাজেটে নৌকা তৈরির উদ্যোক্তাদের তালিকায় আছেন কোয়ালিকান্দি গ্রামের বাসিন্দা সাবেক মেম্বার ও কৃষক দলের সভাপতি আইয়ুব আলী, সোবহান প্রামানিক, রবিন প্রামানিক ও শহীদুল্লাহ। তবে তারা বলেছেন গ্রামের সবাই এর উদ্যোক্তা। সবার অবদান সমান।
নৌকাটির দৈর্ঘ ১২৭ ফুট। তৈরিতে ব্যায় হয়েছে ৯ লক্ষাধিক টাকা। খেলার সময় ডাঙ্গা পার্টি ছাড়াও বৈঠা হাতে ৬৫ জন বাইচাল থাকবে নৌকায়। খেলায় অংশ গ্রহন করার জন্য অভিজ্ঞ ২ সেট বাইচাল রেডি থাকেন। তাদের পোষাকও আলাদা। বাইচালরা নিজেদের কৌশল ধরে রাখার জন্য সারা বছরই প্র্যাকটিস করে। তাদের বয়স ৩০ বছর থেকে ৪০ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। নৌকা তৈরির মূল মিস্ত্রি ফারুক আহমেদ। তিনি আরও ৫/৬ জন সহযোগি নিয়ে নৌকাটি তৈরি করেছেন। এর নাম করণ করা হয়েছে “ঐক্যতরী” । ঐক্যতরি দক্ষিন কোয়ালিকান্দি গ্রামের নাম বহন করেই নৌপথে সারা দেশ বিচরণ করবে।
ঐক্যতরীর উদ্যোক্তা সাবেক মেম্বার ও কৃষক দলের সভাপতি আইয়ুব আলী বলেন, নৌকা বাইচ আমাদের গ্রামের বাব দাদার ঐতিহ্য। শত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য আমরা ধরে রেখেছি। শখের তোলা ৮০ টাকা। বাইচে অংশ গ্রহন করা আমাদের গ্রামের মানুষের প্রধান শখ। তাই নৌকা তৈরি করার সময় কারও কাছে টাকা চাইতে হয় না। সাধ্য মাফিক স্বেচ্ছায় দান করে থাকেন।
উদ্যোক্তা সোবহান প্রামানিক বলেন, শুধু পুরুষ মানুষ না। এ এলাকার নারীরাও এর অংশিদার। আমাদের নৌকা যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে খেলতে যায় গ্রামের নারী, পুরুষ, শিশু, আবাল, বৃদ্ধ সবাই নামাজ পড়ে দোয়া করে। আল্লাহ তালার কাছে মানত করে। সবার একটাই স্বপ্ন প্রতিটি খেলায় চ্যাম্পিয়ন হওয়া। তিনি বলেন, বিগত সময়ে বিভিন্ন জেলায় নৌকা বাইচে অংশ গ্রহন করে চ্যাম্পিয়ন কাপ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। চ্যাম্পিয়নের খবর পেলেই সবার ঘরে ঘরে নানা উৎসব পালন করে।
রবিন প্রামানিক বলেন, নৌকা বাইচ আমাদের গ্রামের মানুষের রক্তের সাথে মিশে গেছে। ঈদ ও ১লা বৈশাখসহ নানা উৎসবের মতই মনে করে নৌকা বাইচও একটি উৎসব। বাংলার ঐতিহ্যের অংশ। তিনি বলেন, আমাদের গ্রামের ঐতিহ্যের প্রতীক বাইচ নৌকা। নৌকা যে দিন নদীতে ভাসানো হয় সে দিন নদীর পাড়ে প্রচুর নারী, পুরুষ ও কিশোরের সমাগম ঘটে। তখন অন্য রকম পরিবেশ তৈরি হয়।
উদ্যোক্তা সদস্য শহীদুল্লাহ বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় চলতি বছরে আমরা অধিক পরিমান খেলায় অংশ গ্রহন করবো। বাইচে অংশ গ্রহন করার জন্য আমাদের কাছে চিঠি আসা শুরু করেছে। কিন্তু তুলনা মূলক পানি কম থাকায় নৌকাটি ডুবা থেকে নদীতে নিতে পারছিনা। কারণ আমাদের গ্রাম থেকে নদী প্রায় ২ কিলোমিটার দুরে। অতীতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে খেলায় অংশ গ্রহন করেছি। এবারও করবো। নতুন নৌকা হওয়ার কারনে বাইচালদের আগ্রহ বেড়েছে।
চরপাকেরদহ ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বলেন, বিনোদের একটি বিশেষ অংশ হিসেবেই কোয়ালিকান্দি গ্রামের মানুষ বাইচ নৌকা তৈরি ও নৌকা বাইচ খেলায় অংশ গ্রহন করে থাকে। পাশাপাশি মাদারগঞ্জ উপজেলার নাম সারা দেশ জুড়ে তাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। মাদারগঞ্জের ব্র্যান্ডিং হিসেবে কাজ করছে কোয়ালিকান্দি গ্রামের মানুষ। আমি তাদের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।

